Sumaia Siddiqa

September 18, 2021 12 By JAR BOOK

কবি ও লেখক পরিচিতি

Sumaia Siddiqa

Teacher

Uttara,Dhaka

ঝরা পাতা


সুমাইয়্যা সিদ্দিকা


ভোরের দিকে বৃষ্টিটা একটু ধরে এলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টিও বেড়ে চলেছে।  ক’দিন ধরে অঝোরে কেঁদে চলেছে আকাশটা। 


‘নাহ!  বৃষ্টিটা মনে হয় আজ আর থামবে না।’  পড়ার টেবিল ছেড়ে জানালার গ্রিলে এসে বাহিরে চোখ রাখে আদিবা।  বাতাসের ঝাপটার সাথে বৃষ্টির ছিটা এসে চোখে মুখে ঠান্ডা পরশ বুলিয়ে দিয়ে যায়।  ঝুম বৃষ্টি।  বাইরে কেমন ধোঁয়াশা হয়ে আছে সব।  রাস্তায় কোন লোক নেই।  মাঝে মধ্যে দু‘একটা গাড়ী হুস হুস করে পানি ছিটিয়ে বৃষ্টির মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে। 


‘‘নীলনব ঘনে আষাঢ় গগনে 

তিল ঠাঁই আর নাহিরে

ওরে আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে”  


রবীঠাকুর থেকে উচ্চস্বরে আবৃত্তি করতে করতে বোনের রুমে আসে আবির।  ওর লম্বা বেনীর আগা ধরে টান দিয়ে বলল, ‘কিরে,  মুখটা অমন প্যাঁচার মত করে রেখেছিস কেন?’ 


‘হতচ্ছাড়া বৃষ্টির অবস্থা দেখেছো? বন্ধ হওয়ার নামই নেই।’ ইষৎ বিরক্তির সুরে বলে ও। 


‘তো বৃষ্টির উপর হঠাৎ এত বিরাগভাজন হওয়ার কারণটা কি বল্তো শুনি?  তুই তো বৃষ্টি দেখলেই ধেই ধেই করে নাচতে আরম্ভ করিস।  আজ হঠাৎ কি হলো রে ?’  হালকা স্বরে বোনকে বলে আবির।


‘বাইরে যাবো?’  আবিরের ঠাট্টার কাছ দিয়েও গেলো না ও। 


বোনের থমথমে গলায় আবির থমকে যায়। অবাক গলায় বলে, ‘আজ তো রেইনি ডে।  স্কুলে গিয়ে কি করবি?’


‘স্কুলে না।  রিশাকে পড়াতে যেতে হবে।  আগামীকাল থেকে ওর পরীক্ষা।  তাই আজ থেকে সকাল-বিকাল পড়াতে চেয়েছিলাম।  গতকাল ওর মা পঁই পঁই করে বলে দিয়েছে।  আম্মু অসুস্থ হওয়ায় বেশ ক’দিন যাওয়া হয়নি।’ একটানে বলে থামলো আদিবা।


-ওহ.. .. দীর্ঘশ্বাস ফেলে গুম হয়ে যায় আবির।

‘ছাতা নিয়ে বের হবি?  এই বৃষ্টিতে তো তাও সম্ভব না।  মন খারাপ করিস না।  দেখ বৃষ্টি কমে কিনা! বৃষ্টিটা ঝরে গেলে যাস।  শান্ত¡নার স্বরে বলে।  পরক্ষণেই আবার কি মনে করে বলে, 

 ‘ভাইয়ার জন্য কড়া করে এক কাপ লেবু চা করে নিয়ে আয়তো। সোনা বোনটা আমার।’ 


‘কচু, এই তাহলে আপনার মতলব।’  ভাইয়ের উদ্দেশ্যে ভেঁংচি কেটে কিচেনের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায় আদিবা। 



কি মনে হতেই কিচেনে না গিয়ে মায়ের ঘরে উঁকি দেয় আদিবা।  সারারুম জুড়ে বড় আপুর বই-খাতা বিছানো।  আপুর হাতের নকশা তোলা বেড কাভার, ড্রেস, পোট্রেট আরো কত কি সমস্ত রুম জুড়ে।  আর মা আপুর হাতে আঁকা একটা পোট্রেটের সামনে দাঁড়িয়ে একমনে তাকিয়ে আছে।  চোখ বেয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় অশ্রæ ঝরছে।  আদিবার মনে হল আদরের আত্মজার জন্য মায়ের চোখের বর্ষণ যেন শ্রাবণের ধারা কেও হার মানায়।  মাকে এখন কিছু বললেই চরম বিরক্ত হবে।  তাই ভেতরে ঢুকতে গিয়েও চুপচাপ মায়ের দরজা থেকে ফিরে এলো।


অস্ফুটে স্বগোক্তি করলো, ‘ইস!  গত ক’দিনের অসুস্থতা আর টেনশনে মায়ের শরীরটা কেমন ভেঙে গেছে।’


মা ছিল খাঁ বাড়ীর সবচেয়ে সুন্দরী বউ।  মায়ের অমন চমৎকার চেহারাটা কেমন মলিন হয়ে গেছে।  বড় আপু অবশ্যই মায়ের চেহারা পুরোটাই পেয়েছে।  মাকে দেখতে দেখতে আদিবার মনে হল ওই তো বড় আপু।  মাকে মাথায় তেল মালিশ করে দিয়ে চুলে বেনী করে দিচ্ছে আর হেসে হেসে কি যেন বলছে মা ও হাসছে। 


‘আদি!  আদি!  ছোটন!  কইরে… .. ..জলদি আয়।’ 


‘ওহহো..চা দিতে বলেছিল।’  ভাইয়ার ডাক শুনে স্মৃতির ঘোর কেটে গেল ওর। বড় আপুর কথা মনে হলেই বুকের গভীরে ফাঁকা ফাঁকা লাগে আদিবার। 


‘এইতো, আসছিইই।’  বলে কিচেনে ঢুকে আদিবা।  

কেটলিটা চুলায় চাপিয়ে ছোট্ট ট্রেতে কাপ-পিরিচ সাজায়।  সেটটা কয়েকটা দোকান ঘুরে ঘুরে কিনেছিল দু’বোনে।  

বৃষ্টি এলেই বেশী করে ঝাল-পেঁয়াজ  আর সরিষার তেল দিয়ে মুড়ি মাখাতো বড় আপু।  পিঠাও বানিয়ে ফেলত কখনো কখনো।  তারপর সবাই মিলে চলত আড্ডা আর গল্প।  একটু চিন্তা করে আদিবাও মুড়ি মাখালো।  চায়ে চিনি দিতে গিয়ে দেখে বয়াম প্রায় ফাঁকা।  নিচের দিকে বড় জোড় চামচখানি চিনি পড়ে আছে।  তাই বেশী করে লেবু চিপে দিলো চায়ে।  


‘ভাইয়া, ভাইয়া.. কইরে.. এই যে তোর চা।’ বলতে বলতে ভাইয়ের রুমে ঢুকে থমকে দাঁড়াল আদিবা। 

পুরো রুম ছড়িয়ে ছিটিয়ে বই আর বড় আপুর আঁকা কয়েকটা পোট্রেট নিয়ে বসে আছে আবীর।  একটা পোট্রেট দেখিয়ে বলে,

‘আদি.. বড় আপুর আঁকা এই পোট্রেটটার কথা মনে আছেরে?  ওই যে ছোট মামা আমাদের সবাইকে সোনার গাঁয়ে ঘুরতে নিয়ে গিয়েছিল।  একটা উন্মুক্ত ড্রয়িং প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল মামা।  বড় আপু ফার্স্ট হওয়ায় মামা কি যে খুশী হয়েছিলেন।’


‘হু ..আছে।  আপুর অনারে মামা সবাইকে চায়নিজ খাইয়েছিলেন।’ 


‘কি চমৎকারই ছিল সেই দিনগুলি… … ।’  স্বগোক্তি করলো আবির।


‘ভাইয়া চা ঠান্ডা হয়ে গেল তো।’


‘কই দে তো চা টা ।  খেয়ে দেখি কেমন রাধুনি হয়েছিস, শাশুড়ির মন জয় করতে পারবি কিনা। বলতে বলতে মুড়িমাখা দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলো, ‘আরে, আবার মুড়িও মাখিয়েছিস দেখছি!  এই না হলে আমার সোনা বোন!’


এক মুঠ মুড়ি মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে বললো, ‘খুউবই মজা হয়েছে।  একেবারে বড় আপুর মত।’


চমকে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায় আদিবা।  কিছু একটা বলতে গিয়েও থমকে যায় আদিবা।


 চা মুখে দিয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলে আবীর। 


‘কিরে অমন চোখ-মুখ কুঁচকে রেখেছিস কেন ?  এখন থেকে প্রাকটিস কর।  ডায়বেটিকস হবে না। চিনি নাই।’ থমথমে গলায় বলে আদিবা। 


দীর্ঘশ্বাস ফেললো আবীর।  মাসের ১৫ তারিখ আজ।  অথচ …


বাবার একার আয়ে আর কুলিয়ে উঠছে না।  দু’ভাই-বোনে টিউশনী করে নিজেদের হাত খরচ আর পড়াশোনাটা কোনরকমে চালিয়ে নিচ্ছে।  বড় আপুর বিয়ে আর মায়ের অসুস্থতা সব মিলিয়ে ব্যাংকের জমানো টাকাও শেষ।  তারপরও যদি বোনটা… .. .. না আর ভাবতে চাই না আবীর।  বাবার কান্নাভরা কথাগুলো শুধুই ক্ষণে ক্ষণে কানে বাজে। ‘আশা!  মা মণি..!  তোর এ অক্ষম বাবাকে ক্ষমা করে দিস মা!’

 

‘কি ভাবসিস ভাইয়া।’


‘নাহ, তেমন কিছু না।  জানিস আদি!  আমার আপুকে খুব দেখতে ইচ্ছা করেরে.. …


                 ***


‘দেখতে ইচ্ছা করছে বললেই হলো.. .. ..যত্তসব আদিখ্যেতা.. দু’দিন পর পর বাপের বাড়ী যাওয়া।  নেহার পরীক্ষা, কিরণের পুরোদমে ক্লাস চলছে।  না.. … না এখন তোমার কিছুতেই যাওয়া চলবে না। তোমার বাবা তো কিছুই দেয়নি, শুধু রূপে কিছুই হয় না।  মেয়ের ঘর সাজাতেও তো মানুষ কিছু দেয়। তোমার বাবার জন্য আমাদের সবার কাছে লজ্জা পেতে হয়।’ 


আর সইতে পারে না রুমে এসে বিছানায় আঁছড়ে পড়ে ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদতে থাকে আশা। ।


‘বাবা!  বাবাগো.. .. আমি যে আর সইতে পারছি না।  এদের আভিজাত্যের আড়ালে যে কি লুকিয়ে আছে তুমি তা কল্পনাও করতে পারবে না, বাবা।  কত শখ করে বিশ্বদ্যালয়ের প্রসেররের সাথে মেয়ে বিয়ে দিয়েছিলে!’


যাওয়া তো দূরের কথা একটু মন ভরে ফোনেও দু’দন্ড বাবা-মায়ের খোঁজ নেওয়ার সুযোগও পায় না আশা। তাহলেও কথা শুনতে হয়।  ক’দিন ধরে মাকে এত দেখতে মন চাইছে, ছোট বোনটা একা একা কি করছে কে জানে।  হিরককে বলতেই বলল, ‘মেয়েদের এত ঘন ঘন বাবার বাসায় যাওয়া পছন্দ না আমার।’ 


ও শুধু বলেছিল, ‘ন’মাসে তো মাত্র দু’বার গিয়েছি তাও একদিন থেকে চলে এসেছি।’


 রাগী গলায় হিরক বলে, ‘মাকে বলো।’


শ্বাশুড়ীকে বলতেই রাজ্যের কথা শুনালো।

                               

‘ভাবী ও ভাবী.. .. !  ডাকতে ডাকতে ঘরে আসে ননদ নেহা।  চমৎকার একটা হিন্দি সিরিয়াল হচ্ছে  দেখবে চল।’


‘তুমি দেখ, নেহা।  আমার ওসব ছাইপাশ দেখতে ভালো লাগে না।  আর তোমার তো পরীক্ষা চলছে … ..’


‘কি আমি ছাইপাশ দেখি।  যতবড় মুখ নই তত বড় কথা। বাপের একটাকাও গিফট দেওয়ার মুরদ নাই। মেয়ের বড় বড় কথা।  আজ আসুক ভাইয়া এর একটা বিহিত না করে ছাড়ছি না।’ 

 ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই চেঁচিয়ে ওঠে নেহা। দুপদাপ করে রুম ছেড়ে চলে গেল।  

হতম্ভব আশা অপমানে লজ্জায় দু’হাতে মুখ ঢেকে কান্নায় ভেঙে পড়লো।


ভোরে উঠেই একহাতে সকলের জন্য নাস্তা রেডী করে আশা।  শাশুড়ীর জন্য আলাদা করে তরকারী রাঁধতে হয়।  আলসারের রুগী।  মশলা খেতে পারে না।  শ্বশুড়ের ডায়বেটিকস।  তার জন্য আলাদা আইটেম।  হিরকের দুপুরের খাবার রেডী করে দেওয়া।  ননদের টিফিন।  সারাদিনের রান্না করেই তারপর বের হতে হয়।  বাসে ঝুলে ঝুলে ভার্স্টি যেতে যেতে কোনদিনই প্রথম ক্লাসটা পায় না। 

 

‘অনার্সের রেজাল্টটা ধরে রাখতে পারবে তো!’ শংকিত হয় মনে মনে।  অনার্সে ফাস্ট হওয়ায় বাবা-মা কি খুশীই না হয়েছিলেন।  ভাবলেই মনটা আনন্দে ভরে ওঠে ওর। 


ক্লাস শেষে বাসায় ফিরতে ফিরতে বিকাল।  তারপর বিকালের নাস্তা, রাতের রান্না।  কেউ একগ্লাস পানি ঢেলেও সহযোগিতা করে না।  পড়তে বসলেই শাশুড়ীর বাঁকা বাঁকা কথা।  তার ওপর যোগ হয়েছে নতুন উপদ্রোব।  কথায় কথায় শাশুড়ী প্রায় শোনান তার ছেলের সাথে কতজন মেয়ে বিয়ে দিতে চেয়েছিল।  কত কি দিতে চেয়েছিল।  আত্মীয়-স্বজনেরা ছেলের বিয়েতে শ্বশুড়বাড়ী থেকে কত কি পাচ্ছে।  শুধু তার বরাতটাই খারাপ।  এসব আশা কিছুই গায়ে মাখেনি এতদিন।  কিন্তু ইউনিভার্স্টি টিচার, নারী স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা হিরক যখন বলল, 

‘তোমার বাবাকে বলে কিছু ব্যবস্থা কর।  আমার প্রজেক্টটা আরো বাড়াতে চাই।’ 


ও চমকে হিরকের দিকে চাইলো যেন বিশ্বাস করতেই কষ্ট হলো ও যা শুনলো।  হিরকের কাছে এমন কিছু শুনতে হবে ও কখনো কল্পনাও করেনি।


‘অসম্ভব..!  বাবাকে এ আমি বলতেই পারবো না।’ 


‘বললেই হল।  পারতে তোমাকে হবেই।  আর আজ থেকে তোমার ভার্স্টি যাওয়া বন্ধ।’ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলে বেরিয়ে যায় হিরক।  


ফোনটা ও নিয়ে নিয়েছে একমাস না পেরুতেই।  ও আপত্তি করতেই হিরক রাগী রাগী গলায় বলেছিল, ‘বাবা-মার সাথে ল্যান্ড ফোনে কথা বললেই তো হল।  আর ফোনে এত কথাইবা বলার  কি দরকার।’ 

                                       

ক’টা দিন যে কেমন যাচ্ছে দেখে শুনে কাঁদতেও যেন ভুলে গেছে আশা।  কেউ ওর সাথে ভালো করে কথাও বলে না।  ও কি খেল না খেল কেউ জানতেও চায় না।  খাবার টেবিলেও ওর উপস্থিতি কারো কাম্য নয়।  তাই সকলের পরে নিতান্তই বাধ্য হয়ে ভেতরের নতুন অস্তিত্বটার জন্যই খাবার মুখে দেয় আশা।


বাবার বলা কথাগুলো মনে করে বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে।  বাবা প্রায় বলতেন, ‘মা!  কখনো ক্ষুদ্রতম অন্যায়কে ও সাপোর্ট  করবে না।  কারণ, অন্যায় যত ক্ষুদ্রই হোক প্রতিবাদ না করলে তা একদিন মহীরূহ ধারণ করে তোমাকেই গ্রাস করবে।’ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে আশা মরে গেলেও এদের কিছুই 

দিবেনা। 

ওদের দাবীর কাছে নত না হওয়ায় সবাই মিলে যে আচরণ করে আশা কল্পনাও করতে পারে না মানুষ কেমন করে অন্যের সাথে এমন করতে পারে।


সেদিন বিকালে নাস্তার টেবিলে হিরকের সাথে কথা কাটাকাটি হয় আশার।  এক পযার্য়ে হিরক ওকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ড়্রিেসং টেবিলের সাথে মাথাটা ঠুকে দরদর করে রক্ত বেরিয়ে আসে।  কোন ভ্রুক্ষেপ না করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় হিরক।  বাসার কেউ ফিরেও তাকায় না।  বরং শাশুড়ী এসে একগাদা কথা শুনিয়ে যায়।  এক সময় কাজের মেয়েটা চুপি চুপি এসে ক্ষত স্থানটা ড্রেসিং করে ঔষধ লাগিয়ে দেয়।


দিন দিন টর্চারের মাত্রা বেড়েই চলেছে।  কথায় কথায় হিরক যখন তখন সবার সামনে ওকে গালাগালি করে।  গায়ে হাত তুলতেও দ্বিধা করে না।  কেউ সামান্যতম  প্রতিবাদ তো দূরের কথা আরো উৎসাহ দেয়।  

জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম মূর্হুত পার করছে ও।  যখন হিরক ওকে পাশে থেকে সাহস যোগাবে কি .. বরং সব থেকেও কেমন একাকী কাটে ওর সময়গুলো।  লোভাতুর আর হিংস্র চাউনির ভীরে হারিয়ে গেছে ভালবাসা, মনুষ্যত্ব।  অবাক লাগে আশার।  এ কি সেই হিরক.. .. যে তাকে পথ চলায় সাহস যোগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।  প্রিয়জনের এ অচেনা রূপ ওকে ভেতরে-বাহিরে নিঃশেষ করে দেয়। রাতের আকাশ পানে সীমাহীন শূণ্যতা নিয়ে পার হয় আশার দিনগুলি।  পৃথিবীর সব আকর্ষণ তুচ্ছ মনে হয় আশার কাছে।


নিজের ভেতরে বেড়ে ওঠা সত্ত্বাটার টানে বেঁচে থাকতে চাই আশা।  কিন্তু অনাদর,অবহেলা আর অত্যাচারে কেমন যেন মিয়্রমান হয়ে যাচ্ছে দিন দিন।  


সারাক্ষণ শারীরিক আর মানসিক টর্চারে প্রচন্ড অসুস্থ হয়ে পড়ে আশা।  নিরুপায় হয়ে ডক্টরের কাছে নিয়ে যায় হিরক।  ডক্টর বলে, ‘প্রচুর শারীরিক ও মানসিক বিশ্রাম দরকার এ সময়ে।’  ভালো করে কেয়ার নিতে বলে ওর।


বাবা-মাকে অসুস্থতার কথা জানাতে চেয়েছিলো আশা।  ক‘দিন ও’বাড়ী থেকে আসতে চেয়েছিলো।  শুনে এমন সিনক্রিয়েট করে হিরক যে দ্বিতীয়বার আর সে কথা মুখেও নেয় না ও।  

মাথার ভেতরটা সারাটা ক্ষণ দপ দপ করে।  অসহ্য যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারে না আশা।  হিরকের ঘুমের ডির্স্টাব হওয়ার ভয়ে বেলকনিতেই কাটে ওর রাতের অনেকটা সময়।  বৃষ্টি ভেজা রাতের আকাশপানে তাকিয়ে অভিমানে হৃদয়টা ভরে উঠে আশার।


‘বাবা, তোমার কি একটুও সময় নেই তোমার আশামণি কত সুখী (!) তা দেখে যাওয়ার।’ 


কাজের মেয়েটাকে দিয়ে লুকিয়ে খবর পাঠিয়েছিল, বাবা যেন ওকে নিয়ে যায়।  বাবা ফোন করেছিল। বললেন, ‘ধৈর্য্য ধর।  সংসারে এমন অনেক কিছুই হয়।  সব ঠিক হয়ে যাবে।  ক‘টা দিন পর আমি এসে তোকে দেখে যাবক্ষণ।’ 

তাই হিরকসহ সকলের আচরণ ওকে প্রচন্ড কষ্ট দিলেও মুখ বুঁজেই ছিল ও।  কিন্তু আর পারে না.. প্রতিবাদ করে হিরকের প্রতিটি আচরণের । 

আর তাই একদিন ভোরে সবাই জানল প্রস্ফুটিত হয়ে সৌরভ ছড়াবার আগেই অকালে ঝরে গেল একটি গোলাপ।

                                          **

নিজের রুমে আসে আদিবা। ‘‘বড় আপুর মত’’!.. .. .. ভাইয়ার বলা কথাটা প্রতিধ্বনি তোলে ওর ভেতরে।


‘না! না!  না বড় আপুর মত কিছু আমি চাই না।’  মাথার ভেতর কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।  মনে হচ্ছে কোথায় যেন ডুবে যাচ্ছে ও।  টেবিল থেকে ক্যামিস্ট্রি বইটা টেনে নেয়।  কিন্তু পড়াতে বিন্দুমাত্র মন বসাতে পারেনা। 


আবীর না ভাবতে চাইলেও আদিবা না ভেবে পারে না।  প্রচন্ড অস্থিরতায় টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আদিবা।  ধীরে ধীরে ওর সবচেয়ে প্রিয় বুক সেলফটার সামনে আসে।  টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো যেন অক্টোপাসের মত আঁকড়ে ধরে ওকে।  প্রতিটি বইয়ের সাথেই জড়িয়ে আছে বড় আপুর সাথে কাটানো আনন্দময় স্মৃতি।  বুকের ভেতরটা শূণ্য শূণ্য লাগে আদিবার।  বড্ড অভিমান হয়।  কেন ওদের সাজানো -গোছানো জীবনটা এমন হয়ে গেল ?  কেমন করে মানুষ এমন মোহান্ধ হয়?  স্বার্থের মোহে একটা সুন্দর জীবনকে দুমড়ে-মুচড়ে নিঃশেষ করে দিতেও দ্বিধা করে না?  কি অপরাধে ওদের ? কেন ওদের আনন্দমুখর দিনগুলোতে আজ শুধুই শ্রাবণের মেঘের ঘনঘটা? 


সীমাহীন বেদনায় হৃদয়টা যেন ছিঁড়ে যেতে চাই ওর।  রুম ছেড়ে বেলকনিতে এসে দাঁড়ায় ও।  সমানে বৃষ্টি ঝরছে।  আকাশটা যেন ওর সমব্যথী।  বৃষ্টি দেখতে দেখতে ভাবে আদিবা। ‘আমার বুকের জমানো কষ্টের চেয়েও কি আকাশের কষ্ট বেশী .. ..তাই বুঝি এত কান্না ঝরাচ্ছে ? আমি যদি এমন করে একটু কাঁদতে পারতাম!’


বাতাসের ঝাপটায় টবের গাছগুলো দুলছে।  আলতো হাতে গাছের পাতায় হাত বুলাতে লাগলো।  আপু বলতো, ‘ছোটন!  আমি যখন থাকবো না আমার প্রিয় গাছগুলোর মাঝে আমাকে খুঁজে নিস।’


লাল টকটকে গোলাপ ফুলগুলোতে হাত বুলাতে বুলাতে ফুঁফিয়ে চলে আদিবা। 

‘তোরা কি আমার কষ্টগুলো বুঝিসরে ?  আমি যে একা হয়ে গেলাম।  একদম একা।’   ওর সাথে পাল্লা দিয়ে  বাইরে তখনও আকাশ ভেঙে শ্রাবণের ধারা অঝোরে বর্ষে চলেছে।


সমাপ্ত


কবিতা


বাবা

সুমাইয়্যা সিদ্দিকা


বাবা তোমায় 

পড়লে মনে

দুখ সাগরে

ভাসি।

হৃদয় মাঝে 

ঘুরে শুধু

তোমার মুখের

হাসি।

রবের কাছে

জন্যে তোমার 

দুআ শুধু 

রাখি।

তোমায় যেন

করেন তিনি

ফেরদাউসের 

পাখি।