S.M. Arnob

September 7, 2021 12 By JAR BOOK

 

 কবি ও লেখক পরিচিতি

S.M. Arnob

Student

Golapbag, Pabna Sadar, Pabna.

অজানার সন্ধানে

বিশাল একটি ঘরে আমরা আছি মোট পাঁচ জন। আমি, দূর্জয়, জোনাকি, জিসান আর পায়েল। একটি মাঝারি সাইজের টেবিলের চারদিক ঘিরে বসে রয়েছি আমরা। টেবিলের এক মাথায় দূর্জয়, অন্য মাথায় পায়েল।

ঘটনাটা খুলে বলি। ছোট্ট এক গ্রাম সোনাউড়া। শহর থেকে খানিকটা ভিতরে। এই গ্রামে গত এক মাসে তিন-তিনটি খুন হয়েছে! এই তিন খুনের মামলায় দোষি সাব্যস্ত করা হচ্ছে পায়েল নামের পঁচিশ বছরের একটি মেয়েকে। এ গ্রামেই তার বাস। তিনটি লাশের আশেপাশেই পায়েলের কোনো না কোনো চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ থেকেই লোকাল থানার ওসি জিসানের সন্দেহ, এসব খুনের পেছনে হাত রয়েছে পায়েলের। সন্দেহ হওয়াটাও স্বাভাবিক, পায়েল এসব খুনের সাথে জড়িয়ে না থাকলে তার চিহ্ন প্রত্যেক লাশের পাশে পাওয়া যাওয়া নিতান্তই অসম্ভব নয় কি? কিন্তু পায়েলের বাবা হাফিজুর রহমান মানতে নারাজ, যে পায়েল এসব করতে পারে। তাই তিনি লোক পাঠিয়ে দূর্জয়কে ডেকে পাঠিয়েছেন। এ কেসের সমাধান করতেই আমরা সোনাউড়ি গ্রামে।

“”তোমার নাম?”” নীরবতা ভাঙল দূর্জয়।
“”পায়েল।””
“”লোকাল থানার দাবি যে গত এক মাসে যে তিনটি খুন এ গ্রামে হয়েছে, সেগুলো তুমিই করেছো। এটি কি সত্যি?””
“”না।””
“”তাহলে তুমি বলছো যে এ খুনগুলি তুমি করোনি?””
“”জ্বী।””
“”কিন্তু প্রত্যেক লাশের কাছাকাছি তোমার চিহ্ন পাওয়া গেছে। তুমি খুনের সময় সেখানে না থাকলে সেই চিহ্নগুলো আসলো কীভাবে?””
“”আমি কীভাবে জানব?””
“”তুমি কি জানো কে এই খুনগুলো করেছে?””
“”জ্বী, জানি।””
“”তুমি জানো?””
“”জ্বী।””
“”কে করেছে?””
“”সুমি।””
“”এই সুমিটা কে?””
“”রহিম চাচার মেয়ে। চার মাস আগে মারা গিয়েছে।””
“”জিসান, কথাটা কি সত্যি? সুমি নামে কেউ চার মাস আগে মারা গিয়েছে?”” জিসানের দিকে মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল দূর্জয়।
“”হ্যাঁ দূর্জয়, সত্যি।””
আবার পায়েলের দিকে মনোযোগ দিলো দূর্জয়,
“”তুমি বলতে চাইছো যে একজন মৃত মেয়ে তিনটি খুন করেছে?””
“”জ্বী।””
“”তুমি কীভাবে জানলে?””
“”সে বলেছে।””
“”কে বলেছে?””
প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠলো মেয়েটি। কী অপূর্ব সেই হাসি! ঠোঁটের সাথে যেন তার চোখ দুটিও হেসে উঠছে।
“”কী হলো? তুমি হাসছো কেন?””
“”আপনার এমন বোকা প্রশ্ন শুনে হাসছি।””
“”আমার প্রশ্নটি তোমার বোকা প্রশ্ন মনে হলো?””
“”জ্বী, মনে হলো।””
“”কেন?””
“”যে খুন করেছে সেই আমাকে বলেছে। অন্য কে বলবে?””
“”তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে বলছো যে একজন মৃত মেয়ে তিনটি খুন করেছে আবার সে-ই তোমাকে সেই খুনের কথা বলেছে?””
“”আপনি বিশ্বাস করছেন না?””
“”আমি কেন বিশ্বাস করব? একজন মৃত মেয়ে তিনটি খুন করেছে আবার তোমার কাছে এ খুনের কথা স্বীকার করেছে – এ কথার পিছনে কি কোনো যুক্তি আছে?””
“”সবকিছুকে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।””
“”অবশ্যই যায়। এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোনো কিছুই যুক্তির বাইরে না। প্রত্যেক ঘটনার পিছনেই যুক্তি আছে। The world is a playground of logic.””
“”আচ্ছা। আমি আপনার সাথে তর্ক করব না।””
“”মেনে নিলাম যে, সুমির আত্মা তোমাকে এসে বলেছে যে সে-ই খুন তিনটি করেছে। কিন্তু কীভাবে সে এই খুনগুলো করেছে?””
“”জানি না। সে আমাকে বলেনি।””
“”সে তোমার সাথে কীভাবে কথা বলে?””
“”যখন আমার সাথে কেউ থাকে না, তখন কথা বলে।””
“”সে কি এখানে আছে এখন?””
“”আমার মনে হচ্ছে আপনি আমার একটি কথাও বিশ্বাস করছেন না।””
“”না, করছি না।””
“”তাহলে আপনার ধারণা কী?””
“”আমার ধারণা, এই সুমির আত্মা একান্তই তোমার কল্পনা। আসলে তুমিই এই খুন তিনটি করেছো, পূর্ব কোনো ঘটনার সূত্র ধরে। হয়তো সেই ঘটনার সাথে সুমিও জড়িয়ে আছে। তাই খুনগুলো করার পর তোমার অবচেতন মন সুমির আত্মা নামের এই চরিত্রকে তৈরি করে নিয়েছে।””
“”আমি এখন আসি?””
“”আসো। তবে এই গ্রাম ছেড়ে কোথাও যেও না। আমি তোমার সাথে দ্রুতই দেখা করব আবার।””
“”আচ্ছা।””

পুরো ঘটনার সময় দূর্জয়ের মুখ ছিল ভাবলেশহীন। এই প্রথম তার মুখে ক্লান্তির ছাপ দেখা দিল।
“”জিসান, আমি কড়া এক কাপ চা খাব।””
“”ঠিক আছে। চলুন বাইরের দোকানে বসি।””

চা খেতে খেতে আমরা চারজন আবার কথা শুরু করলাম।
“”জিসান, আমার কয়েকটা প্রশ্নের একদম সঠিক উত্তর দরকার।””
“”ঠিক আছে, জিজ্ঞেস করুন। আমি চেষ্টা করব একদম ঠিকঠাক উত্তর দিতে।””
“”সুমি নামের মেয়েটির সাথে পায়েলের সম্পর্ক কী?””
“”তারা খুব ভালো বান্ধবী ছিল।””
“”সুমির মৃত্যু কি স্বাভাবিক ছিল?””
“”না, আত্মহত্যা। মাস চারেক আগে একদিন সকালে গ্রামের পূর্বপাশের বড় আমগাছটার সাথে ওর লাশ পাওয়া যায়।””
“”আপনি কি শিওর যে সুমি আত্মহত্যা করেছিল?””
“”এতে শিওর হওয়ার কী আছে? লাশের সাথে একটা চিঠিও পাওয়া গিয়েছিল, সেখানে স্পষ্ট লেখা আছে যে সে পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করায় আত্মহত্যা করেছে।””
“”আপনার কি মনে হয় যে শুধুমাত্র পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করার জন্য কেউ আত্মহত্যা করবে?””
“”করতেই পারে। মানুষ বড়ই অদ্ভুত।””
“”লাশের পোষ্টমর্ডেম রিপোর্টটা দেখাতে পারবেন?””
“”পোষ্টমর্ডেম রিপোর্ট?””
“”হ্যাঁ।””
“”ইয়ে মানে..””
“”কী ব্যাপার? লাশের পোষ্টমর্ডেম করান নি?””
“”না, মানে, আসলে দেখে বোঝাই যাচ্ছিল যে ওইটা আত্মহত্যা। তাই আর বাড়তি ভেজাল করিনি।””
“”এতটা কেয়ারলেস আপনারা? আপনি কি জানেন, এই কথা উপরের মহলে পৌঁঁছালে আপনার কী হতে পারে?””
“”ভুল হয়ে গেছে দূর্জয়। এমন আর হবে না। প্লিজ এই কথা কাউকে বলবেন না।””
“”সুমির পরিবার কি এখনো এখানে থাকে?””
“”জ্বী, থাকে।””
“”আমরা দেখা করতে যাব। আপনি নিয়ে চলুন।””
“”ঠিক আছে, আসুন আমার সাথে।””

রহিম বাবুর বাড়িটি টিনের হলেও গ্রামের অন্যান্য টিনের বাড়ি থেকে বেশ বড় এবং ভেতরটা সুন্দরভাবে গোছানো। কিন্তু বাড়ির অবকাঠামোয় যে মুগ্ধতা, তা বাড়ির মানুষদের মধ্য থেকে উধাও। এখনো কন্যা বিয়োগের শোক কাটে নি। আমরা বসে আছি সামনের ঘরে। আমাদের সামনে যে মানুষটি বসে আছেন, তিনি রহিম বাবু, সুমির বাবা। ভদ্রলোক স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক।

“”জানি এখন এ প্রসঙ্গ তোলা আমার উচিত নয়, তবুও তুলতে হচ্ছে। কিছুই করার নেই, মাফ করবেন।””
“”সমস্যা নেই। যা জিজ্ঞেস করতে চান, করুন। আমি উত্তর দেয়ার চেষ্টা করব।””
“”ধন্যবাদ। আচ্ছা, আপনার কি মনে হয়, আপনার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে?””
“”আমার তা মনে হয় না। এমন কোনো কারণ আমি দেখি না, যাতে আমার মেয়ে আত্মহত্যা করবে।””
“”আপনার মেয়ের লাশের সাথে পুলিশ যে চিঠি পেয়েছিল, তাতে লেখা ছিল পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্টের দুঃখে আর লজ্জায় আপনার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। এটা আপনি কীভাবে দেখেন?””
“”সেই চিঠিটা আমার মেয়ে লেখেনি। ওইটা আমার মেয়ের হাতের লেখা না। আর সে পরীক্ষায়ও তেমন খারাপ রেজাল্ট করেনি।””
“”তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন যে আপনার মেয়েকে খুন করা হয়েছে?””
“”আমি জানি না। শুনুন, আমার মেয়ে প্রচণ্ড হাসিখুশি মানুষ ছিল। ছাত্রীও খারাপ ছিল না। তাই তার আত্মহত্যা করার কোনো কারণই নেই।””
“”ঠিক আছে। আজ বরং উঠি।””
“”আচ্ছা, আপনি এতদিন পরে কেন এতসবকিছু জিজ্ঞেস করছেন?””
“”কারণ আছে। কারণটা অন্য আরেকদিন বলব। আমি এই মাসে যে তিন খুন হয়েছে, তার তদন্তে এসেছি। আচ্ছা, সুমি আর পায়েলের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল?””
“”পায়েল, মানে হাফিজ ভাইয়ের মেয়ে?””
“”হ্যাঁ।””
“”ওদের তো খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। বেচারা পায়েল, এই তিন খুনের কেসে ফেসে গেছে।””
“”আপনার কি মনে হয়, পায়েল এই খুন করতে পারে?””
“”না, মনে হয় না। ও খুব সাধারণ আর ভদ্র মেয়ে।””

আমরা বিদায় নিয়ে চলেই আসছিলাম, তখন হঠাৎ আমার চোখ পড়ল দেয়ালে টাঙ্গানো একটি অসম্ভব রূপবতী মেয়ের ফ্রেমবন্দী ছবির দিকে। মেয়েটির মায়াবতী চোখজোড়ার দিক থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না।
“”ওটা কি সুমির ছবি?””
“”জ্বী, এটাই আমার অভাগী মেয়ে।””
আর কিছু বললাম না। প্রকৃতির খেলা আমি বুঝি না। প্রকৃতি অসম্ভব রূপবতীদের এ জগতে বেশিদিন বাঁচিয়ে রাখে না।
আমরা বাড়ি থেকে বের হয়ে কিছুদূর যেতেই পিছন থেকেভেক বয়স্ক পুরুষকণ্ঠের কান্নার আওয়াজ পাওয়া গেল।

আমরা উঠেছি হাফিজ বাবুর বাড়িতে। এই গ্রামে দুটি পাকা বাড়ি, তার একটি হাফিজ বাবুর। আমি আর দূর্জয় শুয়েছি এক ঘরে, জোনাকি অন্য কোনো ঘরে আছে। এ বাড়িতেই আছে পায়েলও। অবশ্য পায়েলের সাথে আমাদের আর দেখা হয়নি। সে নিজের ঘর থেকে এখন নাকি বেশি বের হয়না। হাফিজ বাবুর সাথে প্রায় আধাঘণ্টা ধরে আমাদের কথা হয়েছে। ভদ্রলোক দৃঢ় বিশ্বাসী যে তার মেয়ে খুনের মতো জঘন্য কাজ করতে পারে না। তার সাথে আলাপ শেষে আমরা নিজেদের ঘরে আসলাম।
“”তোমার কী মনে হয় সুরীদ, খুনগুলো কি পায়েলই করেছে?”” দূর্জয় জিজ্ঞেস করল।
“”আমি এই কেসের বিশেষ কিছু বুঝতে পারছি না। গ্রামের সবাই, এমনকি জিসানও বলছে যে পায়েল খুব ভালো এবং শান্ত মেয়ে। তার পক্ষে তিন-তিনটে খুন করা সম্ভব নয়। কিন্তু পায়েলের পক্ষে তো কোনো প্রমাণই নেই।””
“”আর ওই সুমির ব্যাপারটা?””
“”ওইসব ভুল ধারণা। পায়েল সুমির মৃত্যুটাকে সহজে গ্রহণ করতে পারেনি। তাই তার মনের অবচেতন অংশে সুমির আত্মার জন্ম হয়েছে।””
“”বুঝলাম। কিন্তু, পায়েল কেন বলবে যে সুমি ওই তিনজনকে খুন করেছে? সুমির সাথে কি ওই তিনজনের কোনো রিলেশন আছে? সুমির কথিত ‘আত্মহত্যা’র পিছনে কি কোনো বড় রহস্য লুকিয়ে আছে? বন্ধু, এ কেস এত সোজা না। আমাদের এক মাসে তিন খুনের কেসের রহস্য সমাধান করতে হলে চার মাস আগের সুমি হত্যার কেস ফাইল খুলতে হবে।””
কিছুক্ষণ পর দূর্জয় জিসানকে ফোন করল।
“”হ্যালো, জিসান। এত রাতে ফোন করায় দুঃখিত। আসলে একটা জরুরি কথা বলার ছিল।””
ওপাশ থেকে কথা।
“”ধন্যবাদ। শুনুন, আপনাকে এখন যে কাজটা করতে বলব তা আপনার পাগলামো বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আপনাকে করতে হবে।””
ওপাশ থেকে আবার কথা।
“”কাল সকাল সকাল সুমির কবর খুঁড়তে হবে। সেখান থেকে লাশের যে অংশটুকুই পাওয়া যায় না কেন, বের করে পোষ্টমর্ডেম করতে পাঠাতে হবে।””
ওপাশ থেকে জিসান কিছু বলল।
“”আহ, যা বললাম তাই করুন। অত আপনাকে বুঝতে হবে না।””
দূর্জয় ফোন কেটে দিল।

দুই দিন পেরিয়ে গেছে। সুমির লাশ বের করা হয়েছে। লাশের যে অংশ অবশিষ্ট পাওয়া গেছে, তা-ই শহরে পোষ্টমর্ডেমের জন্য পাঠানো হয়েছে। রিপোর্ট আজকালের মধ্যে পেয়ে যাব। যেই তিনজন খুন হয়েছে, রাসেল, কালাম, নাঈম – এ তিনজন সম্পর্কে গ্রামে খোঁজখবর করা হয়েছে, তাদের বাড়িতে যাওয়া হয়েছে। জানতে পেরেছি, এ তিন ছেলেই অত্যন্ত বখাটে ধরণের ছিল। নেশা গ্রহণ করত, বাজে ছেলেদের সাথে ঘুরে বেড়াত। আজ আমরা আবার পায়েলের সাথে কথা বলতে বসেছি। দূর্জয় কথা শুরু করল।
“”কেমন আছো পায়েল?””
“”আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।””
“”গুড। তোমার সাথে আজ কিছু কথা আছে।””
“”আজ তো আপনি সুমিকে নিয়ে কথা বলবেন।””
চমকে উঠলাম আমরা। এই কথা পায়েল জানলো কীভাবে?
“”তুমি কী করে বুঝলে?””
“”ও বলেছে।””
“”কে বলেছে? সুমি?””
“”জ্বী।””
“”কী বলেছে?””
“”আপনারা আমাকে কী কী প্রশ্ন করবেন সেগুলো।””
“”সেগুলোর উত্তর তোমার কাছে আছে?””
“”জ্বী, আছে।””
“”ঠিক আছে। তাহলে আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে দাও। সুমির কীভাবে মৃত্যু হয়েছিল? ও তো আত্মহত্যা করেনি, তাইনা?””
“”জ্বী না। ও আত্মহত্যা করেনি।””
“”তাহলে কীভাবে ও মারা গেছে? ওর মৃত্যুর সাথে কি রাসেল, কালাম আর নাঈমের কোনো সম্পর্ক আছে?””
“”জ্বী, আছে।””
“”কেমন সম্পর্ক?””
“”ওরাই সুমিকে খুন করেছে।””
“”কেন? সুমি ওদের কী করেছিল যে ওরা সুমিকে খুন করবে?””
“”ওরা সুমিকে ধর্ষণ করে। সুমি যখন হুমকি দেয় যে এই কথা সবাইকে জানিয়ে দিবে, তখন ওরা তাকে খুন করে।”” কথাটা বলার সময় সুমির চোখে জল চলে আসে।
“”শান্ত হও সুমি। শান্ত হও।””
“”আমি ঠিক আছি, আপনি বলুন আর কী জানতে চান।””
“”আর কিছু জানতে চাই না। তুমি যেতে পারো।””

খানিক পর জিসান আসলেন সাথে একটা ফাইল নিয়ে।
“”দূর্জয়, এই নিন আপনার পোষ্টমর্ডেম রিপোর্ট।””
“”আমার, না সুমির?””
হেসে ফেললেন জিসান, “”দুঃখিত, সুমির রিপোর্ট।””
“”এত দ্রুতই চলে আসলো? বাহ!””
রিপোর্টটা দেখে হঠাৎ করে দূর্জয়ের মুখে বিস্ময়ের ভাব ফুটে উঠলো।
“”কী হয়েছে বন্ধু?”” জিজ্ঞেস করলাম।
“”দেখো, রিপোর্টে কী আছে।””
কৌতূহল নিয়ে রিপোর্টটা হাতে নিলাম। লাশের বেশ খানিকটা অংশ পঁচে গেছে। কিন্তু আধুনিক যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষা করায় মৃত্যুর কারণটা জানতে বেশি অসুবিধা হয়নি। রিপোর্টটা দেখে আমি ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম। সুমিকে খুন করা হয়েছে, কিন্তু তার ২৫ ঘণ্টা আগে, ধর্ষণের শিকার হয়েছিল সে!

“”পায়েল, তুমি ভেবো না যে আমি সুমির আত্মায় বিশ্বাস করেছি। শুধু একটু কৌতূহল জন্মেছে। সুমির হত্যার সময় তুমি কি ওখানে ছিলে?””
“”না।””
“”তাহলে তোমাকে সুমির আত্মা বলেছে যে সে খুন হয়েছে?””
“”জ্বী।””
“”আর ধর্ষণের ব্যাপারটা?””
“”সে-ই বলেছে।””
“”সে-ই কি এই খুন তিনটি করেছে?””
“”জ্বী।””
“”আর কেউ কি সুমির হত্যার সাথে জড়িত?””
“”জ্বী, আরো একজন আছে।””
“”কে সে?””
“”কেন বলব?””
“”কারণ তোমার বলার উপর ভিত্তি করে একজন মানুষের প্রাণ বেঁচে যেতে পারে।””
“”কিন্তু সে যে জঘন্য অপরাধ করেছে, তার শাস্তি কী?””
“”তার শাস্তি দেয়ার জন্য আইন আছে।””
“”তার মানে আপনি সুমির আত্মার কথাটা বিশ্বাস করেছেন?””
“”না, করিনি।””
“”তাহলে আপনি এত আগ্রহী কেন? আপনার লজিক কী বলে?””
“”আমার লজিক বলে যে তোমার মধ্যে একটি দ্বিতীয় সত্ত্বার জন্ম হয়েছে, যে নিজেকে সুমি ভাবছে। সুমি কোনো এক সময় তার জীবনে ঘটে যাওয়া সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা তোমার সাথে শেয়ার করেছে, আর এখন তুমি ভাবছো তার খুনের পেছনে ওই চারজন ছেলেই দায়ী। তাই তুমি তাদের একে একে খুন করছো।””
“”তাই নাকি? আচ্ছা, তাহলে আমি বলেই দেই সেই চতুর্থজনের নাম। আপনি বাঁচিয়ে নিয়েন।””
“”বলো।””
“”তার নাম – জিসান!””
ভয়ঙ্কর রূপে অবাক হলাম আমরা! পায়েলের কথাটি কি সত্যি? জিসান তো এখানে নেই। লোকটি কি বিপদে আছে? সে কি অপরাধী? দূর্জয় কয়েকবার জিসানকে ফোন করার চেষ্টা করল, কিন্তু পারলো না। Not reachable.
“”হাফিজ বাবু, আপনি প্লিজ পায়েলকে আমাদের ঘরে আটকে রাখুন। আমাদের ঘর থেকে তো কোনো বেরোনোর পথ নেই। ওকে আমাদের শোয়ার ঘরে রেখে বাইরে থেকে তালা দিয়ে দিন, যাতে ও কোনোভাবেই ঘর থেকে বের হতে না পারে।””
“”কিন্তু..””
“”কোনো কিন্তু নয়। প্লিজ, আমার কথা শুনুন।””
পায়েল খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো, “”লাভ নেই। সুমি ওকেও ছাড়বে না। হিহি।””
ওর শীতল কণ্ঠ শুনে আমার মেরুদণ্ড দিয়ে ঠাণ্ডা বাতাস বেরিয়ে গেল।

পায়েলকে ঘরে তালাবন্দী করার পর আমি আর দূর্জয় বেরিয়ে গেলাম জিসানের খোঁজে। ততক্ষণে অন্ধকার নেমে এসেছে। চাঁদের আবছা আলোয় প্রকৃতি অপরূপ লাগছে, কিন্তু আমরা সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছি না। আমরা ব্যস্ত জিসানের খোঁজে। আমাদের সাথে থানার দুই কনস্টেবল আছে। গ্রামের প্রায় সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেছি, কিন্তু জিসানের কোনো হদিসই পেলাম না। তাকে ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে না। ফোন বেজে চলেছে, কেউ তুলছে না। আমরা গ্রামের উত্তরপাশের ঝোপঝাড়আলা এলাকাটাতে এলাম। এখানেও যদি জিসানকে না পাই, তাহলে আর খোঁজার কোনো জায়গা বাকি থাকবে না। কিন্তু, এত রাতে এই ঝোপঝাড়ে জিসান কেনই বা আসবে? সে কি আসলেও সুমির হত্যার সাথে জড়িত? যদি জড়িত হয়ও, পায়েল কীভাবে তা জানলো? সুমির আত্মা বলে কি আদৌ কিছু আছে?
ঝোপের ভিতরে যেতেই আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে উঠলাম আমি। এক মানুষের হিমশীতল হাতের স্পর্শ! ভালো করে তাকিয়ে দেখি, ওটা জিসান!

জিসানের খুন কীভাবে হয়েছে কেউ তা বলতে পারেনি। এমনকি কেউ ওকে ঝোপঝাড়ের দিকে যেতেও দেখেনি। সে কীভাবে ওখানে পৌঁঁছালো, কে তাকে খুন করল, তা অজানা। সবচেয়ে বড় কথা, যাকে এতদিন খুনি বলে ভাবা হচ্ছিল, সেই পায়েল ঘরবন্দী ছিল! তবে কি সে অন্য কাউকে দিয়ে এই খুন করিয়েছে? তা হওয়ার সম্ভাবনাও কম, কারণ পায়েল তেমন কারো সাথে মেশা একদম কমিয়ে দিয়েছিল। সকালবেলা ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই আজকে দূর্জয়কে কেমন যেন অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে। যেন কী হচ্ছে সে বুঝে উঠতে পারছেনা। খাবার টেবিলে বসে আমি প্রথম কথা তুললাম, “”দূর্জয়, এখন কী করবে? কোনদিক থেকে আবার শুরু করবে?””
“”আর শুরু করব না।”” এখনও সে অন্যমনস্ক।
“”মানে?””
“”এ কেসের সমাধান সম্ভব নয়।””
“”বলো কী! এরকম কথা কেন বলছো?””
“”জানি না, আবার হয়তোবা জানি।””

প্রকৃতি কিছু রহস্য পরম মমতায় নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। কেউ সেসব রহস্যের সমাধান করে না। করতে পারে না।”