Rahul Dev Biswas

September 7, 2021 2 By JAR BOOK

 

 কবি ও লেখক পরিচিতি

Rahul Dev Biswas

Banker

Zaman Manson’,22, Zahidur Rahman sarok, Sobedatola, Khulna.

 

মুখার্জি বাবুর শিক্ষা

লেখা: রাহুল দেব বিশ্বাস

মুখার্জি বাড়িতে আজ সকাল থেকে তুমুল হট্টগোল শুরু হয়ে গেছে! বাড়ির বাহির থেকে শুনে বোঝার উপায় নেই বৃটিশ ভবনের আঙ্গিকে তৈরি এই দোতলা বাড়ির ভিতরে আসলেই কি ঘটছে। তবে চেঁচামেচির আওয়াজ এতটাই বিকট যে কেউ কেউ মনে করছে ভিতরে মনে হয় কোন লঙ্কাকান্ড ঘটে গেছে!
কিছু অতিউৎসাহী লোক রাস্তায় দাঁড়িয়ে কানাঘুষো করছে আর বলছে,””ওরে সর্বনাশ! মুখার্জি বাড়ি নাকি পুলিশ ঢুকে গেছে!””

কিছুক্ষণ পর দেখা গেল বাড়ির প্রধান কর্তা সকলের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত মুখার্জি বাবু,তিনজন পুলিশ কনস্টেবল এবং এই বাড়িতে দীর্ঘ দশ বছর ধরে কাজ করা কুমারেশ দস্তিদারের দু’হাতে শক্ত হাতকড়া পরানো অবস্থায় মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে আসল।

মুখার্জি বাবু খুবই গম্ভীর প্রকৃতির লোক। তিনি এতক্ষণ ধরে বাড়ির বাহিরে রাস্তায় দাঁড়ানো অতিউৎসাহী লোকগুলোকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “”আপনারা শুনুন, চাকরবাকর কোনদিন বিশ্বাস করবেন না। ছোটলোক কোনদিন মানুষ হতে পারে না। এরা হলো বিষধর সাপ। সুযোগ পেলেই মালিকদের ছোবল মারে। এধরনের আরও অনেক কথা তিনি উৎসুক জনতাকে শুনিয়ে যাচ্ছেন আর এরা হাঁ করে গিলছে মুখার্জি বাবুর অমৃত বাণী!””

আটপৌরেভাবে ময়লা শাড়ি পরা অল্প বয়সের একটা বউ কিছু দূরে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে খুব জোরে জোরে কান্নাকাটি করছে। সে আর দেরি না করে একদৌড়ে এসে মুখার্জি বাবুর পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো, “”বড়ো বাবুগো, বিশ্বাস করেন,আমার স্বামী চুরি করেনি। ওকে আমি ভালো করেই চিনি। ও কিছুতেই চুরি করতে পারে না। বাবুগো, আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। ঈশ্বরের দোহাই লাগে আমার স্বামীকে পুলিশের হাতে তুলে দেবেন না।””

মুখার্জি বাবুর অনেক ক্ষমতা। তিনি দৃঢ় কন্ঠে ধমকের সুরে বলে উঠলেন,””তোমার স্বামী দোষী কি নির্দোষ সেটা পুলিশই ভালো বুঝবে।””

সেদিন মুখার্জি বাবুর পায়ে ধরে কুমারেশকে পুলিশের হাত থেকে ছাড়াতে অনেক কাকুতিমিনতি করেছিল কুমারেশের বউ। কিন্তু কোন কিছুতেই অনড় পাথর টলেনি। অচল সমাজ ব্যবস্থায় জী হুজুর বলা মানুষগুলো সেদিন বিচারের আগেই কুমারেশকে চোর সাব্যস্ত করে ওর নিষ্পাপ বউটিকে চোরের বউ তকমা লাগিয়ে দিয়েছিল।

তারপর অনেক দিন কেটে গেছে। লোকমুখে শোনা যায় ছয় মাসের মতো জেল খেটে কুমারেশ দস্তিদার জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিল। কিন্তু এই তল্লাটের মানুষ কোনদিন আর কুমারেশকে একটিবারের জন্যও দেখেতে পায়নি।

মুখার্জি বাবু বিলেত ফেরত লোক। দামি গাড়ি, প্রাসাদ বাড়ি, কোন কিছুরই তার অভাব নেই। সারাক্ষণ গলায় শোভা পায় এক মহা মূল্যবান হীরার হার। ছুটির দিনে নিজের পাজেরো গাড়ি নিজেই ড্রাইভ করে সারা শহর দাপিয়ে বেড়ানোই তার একমাত্র শখ। সেদিন আউটিংয়ে মুখার্জি বাবুর গাড়ি চলতে চলতে রাস্তায় হঠাৎ করে ডিস্টার্ব দিলে পাশেই একটি ওয়ার্কশপে নিয়ে ঠিক করে আবার দ্রুত বেড়িয়ে পড়েন। ব্যস্ত মানুষ,জরুরি কাজ আছে ।

মুখার্জি বাবুকে আড়াল থেকে এক পলক দেখে সেদিন অন্য কাজের অজুহাতে আড়ালেই থাকলো ওয়ার্কশপের নতুন কর্মচারী কুমারেশ দস্তিদার।

অনেকক্ষণ হলো বাবুর গাড়ি ওয়ার্কশপ থেকে বেরিয়ে গেছে। কিন্তু কিভাবে যেন মহা মূল্যবান বাবুর হীরার হারটি গলা থেকে খুলে পড়ে গেছে ওয়ার্কশপের মেঝেতে! কিন্তু সেদিকে মুখার্জি বাবু খেয়ালই করিনি।
সেদিন অনেক কষ্ট করে ওয়ার্কশপের অন্য কর্মচারীদের বুঝিয়ে বলতে গেলে এক প্রকার যুদ্ধ করে কুমারেশ ওদের কাছ থেকে হীরার হারটি নিয়ে ছুটলো হীরার হারটি ফিরিয়ে দিতে মুখার্জি বাড়ি।

অনেকদিন পর কুমারেশ দস্তিদার আজ দাঁড়িয়ে তার অতি পরিচিত মুখার্জি বাড়ির মেইন গেটে। বুক পকেটে তার মহা মূল্যবান হীরার হার।

মুখার্জি বাবু মূল ফটক খুলে জিজ্ঞেস করলেন, “”কে ওখানে?””

কুমারেশ মৃদুস্বরে উত্তর দিলো,”” বাবু আমি কুমারেশ দস্তিদার! ওয়ার্কশপে ফেলে আসা আপনার হীরার হারটি আমি ফিরিয়ে দিতে এসেছি। দয়া করে আপনি নিলে আমি চলে যাব।””

মুখার্জি বাবু কিছুক্ষণের জন্য যেন ভাষা হারিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন! কিছুক্ষণ পর সম্বিত ফিরে আসলে কুমারেশকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “”ভাই, তুই আমাকে মাফ করে দিস্। আমি তোর সাথে মহা অন্যায় করেছি। আমি দুধকলা দিয়ে যে কত বড় কালসাপ পুশেছিলাম সেটি আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পেরেছি। আমার নিজের শালা (বউয়ের ভাই) যাকে আমি আপন ছোট ভাইয়ের মতো দেখে আসছি, সেই আমার বাড়িতে কিভাবে পুকুর চুরি করতে পারে আমি কল্পনাও করতে পারিনি। আর তুই সেদিন এ বাড়ির সামান্য চাকর হয়েও মুখার্জি বাড়ির সম্মানের কথা ভেবে সব জেনেও মিথ্যা দায় মাথায় নিয়ে নি:শব্দে সাজা খেটেছিস। আর আজ মহা মূল্যবান জিনিস পেয়েও আমাকে ফিরিয়ে দিতে আসলি। আমি আজ বুঝতে পারলাম যে ছোটলোক,চাকর তারাই হয় যাদের ভিতরের বিবেকটা পচে গেছে। যে শিক্ষা আমি বিলেতে পাইনি সেই শিক্ষা আমি তোর কাছে পেলাম। আজ থেকে মুখার্জি বাড়িতে তুই চাকর নয়,আমার আপন ভাই হয়েই থাকবি।””

কুমারেশ দস্তিদারের মুখ দিয়ে আর একটি কথাও বেরোলো না। সে অতীতের মতো আজও নির্বাক! শুধু দুচোখে তাঁর আনন্দাশ্রু টলমল করছে!”

 

বউ-শাশুড়ির দ্বন্দ্ব, অতঃপর শান্তি।’

লেখা: রাহুল দেব বিশ্বাস

সারাদিন অফিসে কাজের ধকল, অমানুষিক খাটাখাটুনি, সেই সাথে রাস্তার সমস্ত ঝুট ঝামেলা শেষ করে তিন তলা পর্যন্ত সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে এসে ক্লান্ত রোহান । ওর ফ্লাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে কলিং বেল দিচ্ছে। অথচ বাসার ভেতরে যারা আছে তাদের সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই! ভিতরের মানুষগুলো যে সব বধির হয়ে গেছে ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও তা নয়!
ব্যাপারটা অন্য জায়গায়!
রোহান বাইরে দাঁড়িয়ে দিব্যি শুনতে পাচ্ছে ভিতরে রাম রাবণের যুদ্ধ লেগে গেছে! বউ শাশুড়ির মধ্যে কে রাম আর কে যে রাবণ বুঝা বড় মুশকিল! মাঝে মাঝে রোহানের মনে হয় কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ এই যুদ্ধের কাছে নস্যি! প্রত্যহ এইসব দেখে দেখে রোহান এক অলৌকিক সহ্য ক্ষমতা রপ্ত করে ফেলেছে! এখন ওর খুব বেশি গায়ে লাগে না। সারাক্ষণ বউ আর মায়ের মধ্যে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি লেগেই থাকে। কী নিয়ে যে এতো ঝগড়াঝাঁটি,একে অপরের পিছনে লেগে থাকা, এর মাথামুণ্ডু কিছুই রোহান বুঝে উঠতে পারে না।
ফ্লাটে রোহানেরা মাত্র চারজন মানুষ। রোহান, ওর বউ, ওদের চার বছরের বাচ্চা আর রোহানের মা। রোহানের বাবা দুই বছর হলো চাকরি থেকে রিটায়ার্ড করেছে। ভদ্রলোক গুলশানে তার মেয়ে জামাইয়ের ফ্লাটে থাকেন। মেয়ে জামাইয়ের খুব জোরাজুরিতে তিনি কিছুদিন যাবৎ ঢাকাতে একমাত্র নাতনির সাথে খুনসুটি করে দিব্যি দিন পার করে দিচ্ছেন।
এতক্ষণ ধরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে রোহান যখন জোরে জোরে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলো তখন অগত্যা রান্নাঘর থেকে কাজের বুয়া ছুটে এসে দরজা খুলে দিল।
রোহানের খুব মেজাজ খারাপ হল। সে জোরে জোরেই বলল,’হয়েছে কী তোমাদের? আধা ঘন্টা ধরে বাইরে দাঁড়িয়ে কলিং বেল বাজিয়ে যাচ্ছি,সারা বিল্ডিয়ের মানুষ শুনতে পাচ্ছে আর তোমরা কি বাসার মধ্যে কানে তুলা দিয়ে থাকো?
পাশ থেকে রোহানের মা মুখ ঘুরিয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে পান চিবোতে চিবোতে বলল,’কলিং বেলের আওয়াজ শোনার কি আর জো আছে বাবা। তোর বউ এর কন্ঠের আওয়াজ শুনলে আর কলিং বেলের আওয়াজ কানে আসে না! একেবারে কোকিল কন্ঠ! সারা ঘরে শুধু বাজতেই থাকে, বাজতেই থাকে!’
রোহানের বউ আর সহ্য করতে না পেরে রাগে রাগে বাচ্চাটাকে বেডের উপর রেখেই শাশুড়িকে বলল, ‘দেখুন,বয়স হয়েছে আপনার, মুখে লাগাম টেনে কথা বলবেন। সারাদিন এই বাসায় কে চিল্লাচিল্লি করে তা আশেপাশের দু’দশটা ফ্লাটের লোকজন জানে! ভুতের মুখে রাম নাম মানায় না! আগে নিজের সুর খাটো করবেন তারপর অন্য কারোর দোষ ধরার চেষ্টা করবেন।’
‘দেখলি!দেখলি! তোর বউ তোর সামনেই আমাকে কিভাবে অপমান করল। আমাকে বলে কিনা ভুত! আমাকে সুর খাটো করতে বলে! কত বড়ো ঘরের বেটি সে ? আমাকে টিক্কা দিয়ে চলে! এই সংসার আমার হাতে গড়ে তোলা। আমাকে বলে কিনা চুপ থাকতে!’ প্রচন্ড রাগে রোহানের মা গিড়গিড় করছে।
রোহানের বউ পাশ ফিরে বিড় বিড় করে বলল,’চোরের মায়ের আবার বড় গলা!’
কথাটি এমনভাবে বলল যাতে কেউ না শুনলেও শাশুড়ি কিন্তু ঠিকই শুনতে পেল।
রোহানের মা তখন রেগেমেগে বলল,’হায়! হায়! তুমি আমার ছেলেকে চোর সাব্যস্ত করলে। আমাকে তুমি..’
মায়ের কথা শেষ করতে না দিয়ে রোহান খুব জোরে সবাইকে ধমক দিয়ে বলল,’তোমরা এবার ঝগড়াঝাঁটি থামাবে নাকি আমি আবার অফিসে ফিরে গিয়ে রাত কাটাবো।’
অবস্থা বেগতিক দেখে ড্রয়িং রুম ছেড়ে সেদিন যে যার মতো রুমে চলে গেল।
রোহান তার বাচ্চাটাকে কোলে তুলে আদর করে চুমু খাচ্ছে আর বাচ্চাটি খিলখিল করে হেসে গড়াগড়ি যাচ্ছে। এই বাসায় আর কিছু না হোক প্রতিদিন বাপ বেটার খুনসুটি বেশ জমে ওঠে।
এই বাসার দোতলায় দক্ষিণ পাশের বিশাল ফ্লাটটি নিয়ে থাকে একজন ষাটোর্ধ্ব ভদ্রমহিলা ও ওনার স্বামী। ঘরে বাইরে এরা স্বামী-স্ত্রী মিলে দুজন ছাড়া আর কেউ নেই।
রোহানের এক বন্ধু সেদিন কথা প্রসঙ্গে ওনাদের কথা বলল। ভদ্র মহিলা নাকি ওদের এলাকার নামকরা একটি সরকারি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। রোহানের বন্ধু ভদ্র মহিলার সম্পর্কে উচ্ছসিত প্রশংসা করে বলল,’ওনার মতো শিক্ষিকা ওই তল্লাটের মানুষ আগামী একশো বছরে আর একজনও পাবে কিনা সন্দেহ!ও আরো বললো, ভদ্রমহিলার স্বামী একজন সুনামধন্য লেখক। অসাধারণ দিলদরিয়া মানুষ। অনেক বড়ো আমলা ছিলেন কিন্তু দেখে বোঝাই যায় না! প্রকৃত একজন সাদা মনের মানুষ!’
বন্ধুর মুখে ভদ্রমহিলার খুব প্রশংসা শোনার পর রোহানেরও খুব ইচ্ছা ছিল ওনাদের সাথে একবার দেখা করবে। কিন্তু একদিকে চাকরির ঝামেলা অন্যদিকে সংসারের নানারকম ধকল সামলাতে সামলাতে তার আর সময় হয়ে ওঠেনি।
এদিকে তার সাথে দেখা না হলেও ইতোমধ্যে তার বউ ও মায়ের সাথে ঠিকই মাসিমার বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছে। মাসিমার ফ্লাটে এখন রোহানের বউ ও ওর মায়ের প্রতিনিয়ত যাতায়াত। মাসিমার সাথে রোহানের বউ আড্ডা দিয়ে আসতে না আসতেই ওর মা ছুটে যায়। কী যে এতো কথা হয় ভগবান জানে? তবে আশ্চর্য ব্যাপার হলো রোহানের মা ও বউ কেউই মাসিমার কোনো কথার বিরুদ্ধে কখনো দ্বিমত পোষণ করে না।
রোহানের সেটা ভালোই লাগে। রোহান ভাবে,’ভালোই হলো,কোনকিছুতে মিল না হলেও অন্ততপক্ষে একটি জায়গায় তো উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরুর দুইজন মিলেমিশে গেল! সত্যিই মাসিমা আপনার তুলনা নেই।’

রোহানের বউ এক সপ্তাহ পর আজ বাবার বাড়ি থেকে এসেই রান্নাঘরে ঢুকে সবকিছু এক নজরে দেখে নিল। বাচ্চাটাকে কাজের বুয়ার কাছে রেখে সোজা দৌড়ে গেল মাসিমার ফ্লাটে।
‘কি গো মা.. তুমি কখন এসেছ?’ মাসিমা হাতের বইটি টেবিলে রেখে জিজ্ঞেস করল।
‘আর বলেন না মাসিমা,কিছুক্ষণ আগে বাসায় এসেই আমার মেজাজটা খুব খারাপ হয়ে গেছে! বাসার সবকিছুই লন্ডভন্ড! যেটা যেভাবে রেখে গেছি কোনোকিছুই ঠিকঠাক মতো নেই। এসে দেখি রাইস কুকার নষ্ট। গ্যাসের চুলাও যায় যায় অবস্থায়। আর ঝুলকালি, ময়লা আবর্জনায় বাসাটি একেবারে পোড়ো বাড়ির মতো মনে হচ্ছে। কেমন লাগে বলেন তো! একটা সপ্তাহ মাত্র ছেলেকে রান্না করে খাইয়েছে তাতেই এই অবস্থা!’
মাসিমা ধৈর্য ধরে সবকথা শুনে উৎকন্ঠিত হয়ে বলল,’তাই নাকি মা? তাহলে যে তোমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেল! তবে যাই বলো না কেন, তোমার শাশুড়ি কিন্তু আমার কাছে তোমার কথা কোনদিন খারাপ বলে না। মানুষটা মনে হয় একটু অন্যরকম!’
‘মাসিমা আপনি ওনাকে চিনতে ভুল করেছেন। ওনার মুখে মধু, অন্তরে বিষ!’
মাসিমা এবার হাসতে হাসতে রোহানের বউকে বলল, ‘শোনো মা, আমি দিদিকে যতোটুকু দেখেছি তাতে কিন্তু আমার ওরকম মনে হয়নি! একটু রাগী কিন্তু ভিতরটা অনেক পরিস্কার!’
মাসিমা সোফা থেকে উঠে রোহানের বউকে আলতোভাবে আদর করে বলল,’আমি তোমার পছন্দের পায়েস রান্না করেছি। একটু বসো, খেয়ে যাবে। নইলে কিন্তু আমি এখন খুব রাগ করবো!’
মাসিমার কথা অমান্য করার শক্তি তার নেই। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে আজ জ্বলছে!
রোহানের বউ বেরোতে না বেরোতেই রোহানের মা গেল মাসীমার ফ্ল্যাটে। এতোক্ষণ ধরে বউ তার বিরুদ্ধে কি সব লাগালো তা শোনার জন্য উনার বোধ হয় আর তর সইছে না।
‘আসুন,ভিতরে আসুন দিদি। বেশ কিছুদিন ধরে আপনি আসেন না। একবার ভেবেছিলাম উপরে যাব কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। বিশেষ কিছু কাজে আঁটকে গেছি। তা দিদি,কেমন আছেন?’
এক বুক নি:শ্বাস ফেলে রোহানের মা বলল,’আর থাকা দিদি! এক সপ্তাহ ধরে বাসার জঞ্জাল পরিষ্কার করতে করতে আমার অবস্থা বেগতিক। কোমরের যে অবস্থা নড়াচড়া করতে ভীষণ কষ্ট হয়। সেই রকম আমার পোড়া কপাল! ভেবেছিলাম ছেলেকে বিয়ে দিয়ে কোথায় একটু শান্তিতে থাকবো। কিন্তু সে কপাল কি আমার আছে?’
চোখে মুখে প্রশান্তির হাসি দিয়ে মাসিমা বলল,’কি যে বলেন দিদি! আপনিতো একটা লক্ষ্মীমন্ত বউ পেয়েছেন! ওর মুখে তো সারাক্ষণ শুধু আপনার প্রশংসা। মেয়েটি কিন্তু ভারী মিষ্টি দিদি!’
যা শুনে রোহানের মায়ের থোঁতা মুখ ভোঁতা হয়ে গেল!

আগে থেকেই আসন্ন দূর্গা পূজায় মাসিমা রোহানের ফ্লাটের সবাইকে মহা অষ্টমী পুজোর দিন সকাল বেলা নিমন্ত্রণ করে রেখেছে। মাসিমা কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে কারো কোন অজুহাত সে ওইদিন শুনবে না! যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে তাহলে আগেই সেরে ফেলতে হবে।
মাসিমা সবসময় দাবি নিয়ে কথা বলে! যে দাবি লঙ্ঘনের ক্ষমতা শুধু রোহানের কেন তার বাবারও নেই! তাই অগত্যা রোহানের বাবাকেও আসতে হচ্ছে মেয়ে জামাইয়ের বাসা থেকে।
দূর্গা পূজা শুরু হয়েছে দুই দিন হয়ে গেছে। সারা দেশ মেতেছে পুজোর উৎসবে। পাড়া মহল্লায় ধূপ ধূনোর পবিত্র গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। মহা অষ্টমী পুজোর অঞ্জলি দিতে ঘরে ঘরে সবাই গোজগাছ করছে। আর একটু পরেই মায়ের উদ্দেশ্যে যে অঞ্জলি দিতে হবে!

আজ রোহানের বাসার সবাই সেজেগুজে যাচ্ছে মাসিমার ফ্লাটে। কলিংবেলের শব্দ শুনেই মাসিমা ভেতর থেকে জোরে আওয়াজ দিল ,’একটু দাঁড়ান ,আমি ওদেরকে নিয়ে আসছি।’
মাসীমার কথা শুনে রোহান বেশ অবাক হলো। ভাবছে ভিতরে আবার কারা! কিছুক্ষণ পর সবকিছু পরিষ্কার হল।
দরজা খুলতেই দেখা গেল এক দল নয় দশ বছরের কুমারী মেয়ে বরণ ডালা সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার পরনে লাল পাড়ের সাদা শাড়ি। পিচ্চি পিচ্চি মেয়েগুলোকে দেখতে পরীর মত লাগছে! মুহূর্তেই মন প্রাণ জুড়িয়ে গেল। সবাইকে বরণ করে মাসিমা ও মেসোমশাই নিয়ে গেল একটি নতুন কক্ষের ভিতরে। যেখানে আগে থেকেই একটি অপূর্ব কুমারী মেয়েকে মা দুর্গা সাজিয়ে সিংহাসনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। আজ এখানে কুমারী পূজা হবে। যার পুরোহিত মেসোমশাই নিজেই। এই মেয়েগুলোকে মাসিমা বিভিন্ন বস্তি থেকে ডেকে এনেছে। মাসিমা এদের লেখাপড়া ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছে।
একটি তাকের উপর মিহি বুননের জলছাপ দেয়া সাদা সাদা শাড়ি আর ঝকঝকে সাদা সাদা ধূতিপাঞ্জাবি সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা।
মাসিমা ওগুলো দেখিয়ে সকলকে বলল,’আপনাদের পরার জন্য আধা ঘণ্টা সময় দিচ্ছি। এরপর কিন্তু কুমারী পূজা শুরু করতে হবে।’
রোহানের বউ আস্তে আস্তে রোহানকে বলল, ‘এই সেই কক্ষ, যাতে মাসিমা সব সময় তালা ঝুলিয়ে রাখে। কাউকে ঢুকতে দেয় না।’
মাসিমা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে রোহানের মাকে উদ্দেশ্য করে বলল, ‘দিদি, এই কক্ষে আমার একমাত্র ছেলে, বৌমা ও আমার নাতি থাকতো। আজ থেকে ঠিক চার বছর আগে আমেরিকাতে এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনায় আমার সব শেষ হয়ে গেছে! ওদের স্মৃতি সারাক্ষণ আমাকে দুমড়ে মুচড়ে ফেলে। আমার চোখের সামনে ভাসে আমার বউমা আমার গলা জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো বলছে, তুমি আমার সোনা মা! লক্ষ্মী মা! তাই দেখে আমার নাতির সেকি রাগ! ওর মা’কে সরিয়ে দিয়ে বলে ,বলো ঠাম্মি, তুমি শুধুই আমার সোনা মা! লক্ষ্মী মা! আমি তখন ওদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতাম, আমি তোমাদের দুজনেরই সোনা মা! লক্ষ্মী মা!’
রোহানের বউয়ের দিকে তাকিয়ে মাসিমা বলল, ‘শোনো মা, একজন মানুষ চোখের সামনে ঘোরাফেরা করলে তার অভাব বোঝা যায় না! তার অভাব টের পাওয়া যায় সেদিন, যেদিন এই মানুষটা চিরতরে চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যায়! তখন শত চেষ্টা করেও তাকে আর ধরা যায় না। সে তখন সব ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়! আমরা মেয়েরা যদি পরকে আপন করতে পারি তাহলে আপনকে কেন পর করব?’
মেসোমশাই পুজোয় বসার জন্য বারবার সবাইকে নতুন বস্ত্র পরে আসতে বলছে। যে যার মতো সবাই গেল নতুন বস্ত্র পরতে। শুধু রোহানের বউ মেঝেতে বসে খুব যত্ন করে শাশুড়ির শাড়ির কুচি ঠিক করে দিচ্ছে আর শাশুড়ি হাসি হাসি মুখ করে বউ এর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যা দেখে রোহানের খুশিতে দু’চোখ জলে ভরে উঠলো!

কিছুক্ষণের মধ্যে কুমারী পূজা শুরু হলো। মাসিমা, রোহানের বউ আর মাকে পাশে নিয়ে পুজোয় বসলো। কক্ষে একপ্রকার শ্বেত শুভ্রতা বিরাজ করছে। পূজার প্রারম্ভে মেসোমশাই তার ভরাট কন্ঠে আত্ম শুদ্ধি ও পবিত্রতার মহা মন্ত্র উচ্চারণ করে কুমারী পূজার বিহীত কার্য শুরু করলো।

আর সেই মহা মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে শুদ্ধ হলো রোহানের পুরো পরিবার।”