Naimur Rahman Nishan

September 10, 2021 0 By JAR BOOK

কবি ও লেখক পরিচিতি

Naimur Rahman Nishan

Student

হরিনাকুন্ড থানার পাশে, পশু হাসপাতাল সংলগ্ন, হরিনাকুন্ড, ঝিনাইদাহ

আত্মহত্যা !!!

আপুর মাধ্যমিক আর আমার চতুর্থ।বয়সের গড়মিলের তুলনায় আমাদের বন্ধুত্বটা একটু অন্যরকম।হাজারো মতের অমিল থাকলেও বোন তো বোন ই।বিশাল এক ঝগড়া আর অভিমান শেষে আপুর স্কুলফল ফেরার ওই একটা চকলেট ই ছিলো সব অভিমানের মহা ঔষধ।
চার সদস্যের এক পরিবার। হাজারো কষ্ট এই মধ্যবিত্ত পরিবারে উঁকি দিলেও আমাদের হাসির ভাজে তা হারিয়ে যায়।চাওয়া পাওয়ার খুব একটা আক্ষেপ আমাদের নেই।প্রাইমারি স্কুলের প্রথম ছাত্র আর বালিকা বিদ্যালয় এর প্রথম ছাত্রী এর থেকে বেশি আর কোনো বাবা-মা ই তার সন্তানের কাছে থেকে আশা করে না।
আমার আর আপুর স্কুলের একই রাস্তায় থাকায় ঝগড়ার সময়টা বেশি পাওয়া যায়। ঝগড়া আর অভিমানের বেশি সময়কে উপেক্ষা করে রাস্তা পার করানোর দায়িত্বটা আপু ই পালন করেন।সূর্যের পূর্বে ঘুম থেকে ওঠা আর সূর্য হারিয়ে যাবার আগে বাড়ি ফেরা, এভাবেই কেটে যাচ্ছে দিন।আপুর মাধ্যমিক আর আমার বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হলো।রেজাল্ট এক কথায় আশানুরূপ। ছাত্রজীবনে ঘুরতে যাবার বিশেষ কোনো সময় পাওয়া যায় না তবু বার্ষিক পরীক্ষা শেষে নানীবাড়ি ভ্রমণ খুব একটা খারাপ কাটে না।সময়ের পরিক্রমায় দিদি যখন কলেজে, তখন আমার মাধ্যমিকের তোড়জোড়।এখন নিজে রাস্তা পার হতে শিখেছি বিধায় দুজনার স্কুলের রাস্তাও পরিবর্তন হয়েছে।এখন আপুর সাথে খুব কম সময় কথা হয়।স্কুল, প্রাইভেট,কোচিং শেষে নিজেকে সময় দেওয়ার মতো সময়টুকু ই পাওয়া যায় না আর গল্প তো দূরের কথা।
বেশ কয়েকদিন ধরে আপুকে কলেজ ফেরার পর থেকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছে। সব উপেক্ষা করে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম,””কি হয়েছে আপু?”” আপু বলতে নারাজ,শেষমেশ আপুর আ্যসাইনমেন্ট করে দেবার খাতিরে জানতে পারলাম আপুকে কিছু ছেলে খুব বাজে ভাবে বিরক্ত করেছে। বিষয়টা বেশ চিন্তার হলেও বাবা-মাকে জানানো নিষিদ্ধ ছিলো বিধায় আমার দুঃখপ্রকাশ করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না।
কিছুদিন যাবার পর আপুর চিন্তা দ্বিগুন হলেও জীবনের গ্যাড়াকলে পড়ে আমি প্রায় বিষয়টা ভুলতে বসেছি।
শুক্রবার আপুর ছুটির দিন হলেও আমার, বাবার কিংবা মায়ের কোনোভাবেই ছুটির দিন নয়। বাবার দোকান,মায়ের বিরতিহীন কাজ আর আমার বিরক্তিকর কোচিং এর পরীক্ষা।
পরীক্ষা শুরু হবার খানিকটা সময় বাকি,ঠিক তখন পেস্নিলব্যাগ খুলতে গিয়ে দেখি একটা চিরকুট….

“”ক্ষমা করিস!!
দেহ খাদক ক্ষুধার্ত কিছু মানুষ নামক জানোয়ারের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষমতা আমাদের নেই।
‘তবে ময়েটার সাথে যা হয়েছে খারাপ হয়েছে’ বলে সান্ত্বনা দেওয়ার মানুষের অভাব আমাদের সমাজে নেই।সান্ত্বনা পাবার কোনো ইচ্ছে আমার নেই,তাই সান্ত্বনা পাবার ঘটনা টি ঘটার আগে পৃথিবীকে বিদায় জানানোটাই শ্রেষ্ঠ উপায়।
ভালো থাকিস!””

দৌড়ে বাড়ি পৌছানোর আগেই গেট থেকেই শুনতে পেলাম মেয়ে হারানো মায়ের এক চাপা কান্না।আপুকে ঘিরে অনেক মানুষের ভিড়।সবাইকে ঠেলে গিয়ে পড়লাম আপুর মুখের উপর,আপুর নাক দিয়ে ঠেলে বেরিয়ে আসছে রক্ত, আপুর গলায় যেন শখ করে পড়া কালো হারের ক্ষিপ্র দাগ।

“”আত্মহত্যা করা পাপ জানি,তবে দেহখাদক ক্ষুধার্ত কিছু মানুষ নামক জানোয়ারের হাত থেকে বাঁচার জন্য আত্মহত্যা করা পাপ কিনা আমার জানা নেই।””

এভাবে আরিশা আপুর মতো হাজারো আপু প্রতিনিয়তো মৃত্যু কে সঙ্গী করে নিচ্ছে।চেনা কন্ঠেগুলে থেকে হয়তো ভেসে আসছে
“”মেয়েটার সাথে খুব খারাপ হয়েছে”” এই একটা কথায় বিচার হয়ে যাচ্ছে সেই মানুষ নামক জানোয়ারের।আপনি যখন বন্ধুদের আড্ডায় মেয়েদেরকে নিয়ে রসালো আলাপ জমান কিংবা তাদের দেহের ভাজে ভালোবাসা খুজেন, তখন কি একটিবারও চিন্তা করে দেখেছেন যে সে হয়তোবা কারও বোন,মা কিংবা মেয়ে এবং একই ঘটনা আপনার বোন, ম কিংবা মেয়ের সাথে হচ্ছে না।
“”আসুন নিজেকে বদলায় একদিন দুনিয়া বদলে যাবে।””

2; আকাঙ্ক্ষা!!

প্রতিদিনের টিফিন এর জন্য আমার পাঁচ টাকা বরাদ্দ।সূর্য পূর্বে না উঠে পশ্চিমে উঠলেও আমার পাঁচ টাকার মাফ নেই।সপ্তাহের ছয় দিনের ত্রিশ টাকা,এরকম দশ সপ্তাহের টাকা বইয়ের ভাজে রেখে, বই যেনো ফুলে উঠেছে।এতগুলো টাকা!!হ্যাঁ, এতগুলো টাকা হাতে পেয়ে, আমার চিন্তাধারা আর আনন্দের অভিপ্রকাশ দেখে মনে হচ্ছে আমি যেনো বিশ্বব্যাংক হাতে পেয়েছি।মনের মাঝে রঙতুলি দিয়ে একে চলেছি হাজারও স্বপ্ন।এই তিনশত টাকা দিয়ে আমি মায়ের জন্য একটা নতুন শাড়ি কিনবো।বাবার দিকে তাকিয়ে মনে হলো এ টাকা দিয়ে বাবার চশমাটা সারিয়ে দিবো।বাবার পায়ের দিকে তাকিয়ে মনে হলো বাবার এই তালি মারা জুতা ফেলে একটা নতুন জুতা কিনে দিবো।ছোটবোনকে মেলায় ঘুরতে নিয়ে যাবো,নাগরদোলনায় চড়াবো,শন পাপড়ি খাওয়াবো,আবার পড়তে বসে মনে হয়েছিল পড়ার টেবিলের লাইট টা কিনি।
বাবা মায়ের কথাপোকথন শুনে মনে হলো, আমি যদি টাকা না দেয় তাহলে মনে হয় রাতটা না খেয়েই কাটানো লাগবে। এভাবে কতটা রাত যে না খেয়ে কাটিয়েছি তার হিসেব মেলে না, তবুও কেউ জিজ্ঞাসা করলে খেয়েছি বলে যে হাসিটা দিয়ে দুঃখ ঢাকার চেষ্টা করি সেই হাসিটা দেখেই তার কাছে মনে হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ডিনার হয়তো এদের বাড়িতেই হয়েছিল। বাবাকে বললাম, “”এই নাও বাবা বাজার করে নিয়ে আসো।””
: তুই টাকা কই পালি?
:অইতো বাবা টিফিন এর টাকা গুছিয়ে রেখেছিলাম।
:না থাক ওটা তোর জমানো টাকা, তুই রাখ।
:নাও তো বাবা কোনো সমস্যা নেই।
বাবার কিছু করার ছিল না,হয় ছেলের জমানো টাকা দিয়ে বাজার করতে হবে না হয় রাতে রোজা থাকতে হবে।তাই বাবা তার সমস্ত লজ্জা আর অপমান ধূলোয় মিশিয়ে ছেলের জমানো টাকা দিয়ে রাতের খাবার জোগাড় করতে বের হলো।
আর আমি আমার সেই রঙতুলি দিয়ে আঁকা স্বপ্নের এক বিশাল ক্যানভাসে এক বালতি পানি দিয়ে স্বপ্নগুলো ধুয়ে মুছে সাগরজলে ভাসিয়ে দিলাম।
এখনো মার পরনে ছেঁড়া শাড়ি
বাবার পায়ে ছেঁড়া জুতা আর চোখে ভাঙা চশমা।
বোনের আশা আবার নতুন করে ঘর বাঁধলো, পরের মেলার আাশায়।
আর আমার পড়ার টেবিলের লাইট?চিন্তা করাটা ও কিছুটা হাস্যকর।

3;

লকডাউন!!!

কঠোর লকডাউন! তবুও মসজিদে নামাজ পড়লে এক অন্যরকম আনন্দ কাজ করে।তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদে নামাজ পড়ার চেষ্টা করি।
রমজান মাস চলছে।মসজিদ থেকে ফেরার সময় বিভিন্ন বাড়ি থেকে যে কথাগুলো ভেসে আসে তা একটু মধুরই হয়।যেমন কারো বাড়ি থেকে আসছিলো “”পিয়াজু কোথায়?”” আবার কারও বাড়ি থেকে, “”আর একটু পরে খাবো।”” শুনতে খারাপ লাগছিল না বইকি।
তবে টিনের ছাওনি আর চাটোর বেড়ার ওপাশ থেকে যে এতটা আবেগ মেশানো তিক্ত কথা একটা পাঁচ বছরের মেয়ের মুখ থেকে বেরোতে পারে তা আমার কল্পনার বাইরে

:””আম্মু রোজা কি রাতেও রাখতে হয়?””

মা নিশ্চুপ। দ্বিধাবোধ না করে বাড়ির ভিতরে ঢুকলাম।এমন দুঃসময়ে আমার আগমন দেখে মা একটু থতমত খেলো আর বাচ্চা মেয়েটা দৌড়ে পালালো। মায়ের চোখের নোনাপানির উঁকি আমার চোখকে ফাকি দিতে পারল না।আমি সবকিছু উপেক্ষা করে প্রশ্নটা করেই বসলামঃ “”ঘরে খাবার নেই?””
তিনি কোনোমতে নিজেকে সামলে আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন। তার চোখে নোনা পানির স্রোত।
“” লকডাউন এ তার স্বামীর কোনো কাজ নেই, কোনো খাবার ও আসে না বাড়িতে,তিনদিন হতে চলেছে চুলো জ্বলে না।এমনকি রোজা নাকি তাদের বাড়িতে একদিন আগেই শুরু হয়েছিল।তাদের জীবিকার একমাত্র সম্বল রিকশাটাও নাকি তার স্বামী বিক্রি করতে বসেছে।””
এই হাজারো কষ্টের কোনো সমাধান আমার ছোট হৃদয়ে ছিল না, তবু একদৌড়ে বাড়িতে গিয়ে সেদিনের রাতের খাবার আর জমে থাকা ইফতার গুলো নিয়ে গিয়ে তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম,
“”আজ রাতে না হয় রোজাটা থাকার দরকার নেই””।