Mutasim Nayon

September 23, 2021 0 By JAR BOOK

কবি ও লেখক পরিচিতি

Mutasim Nayon

ছাত্র

চাঁদখালী, পাইকগাছা, খুলনা, বাংলাদেশ।

আমার কাছে স্বাধীনতা।

খেলার মাঠ থেকে শিশুর বাড়ি ফেরা আর ফেরানোর মধ্যে যে তফাৎ স্বাধীনতা আর পরাধীনতার মধ্যেও তাই।
যৌনসুখ উপভোগ আর ধর্ষণের মধ্যে যে তফাৎ স্বাধীনতা আর পরাধীনতার মধ্যেও তাই।
শাসন ও শোষণের মধ্যে যে তফাৎ স্বাধীনতা আর পরাধীনতার মধ্যেও তাই।
তাহলে স্বাধীনতার বিপরীত শব্দ কি পরাধীনতা?
একটা ছোটোখাটো উদাহরণে  যাওয়া যাক।পাটবনে নিজেদের ইচ্ছেমতো ঘুরে চলা মুরগির বাচ্চাগুলো স্বাধীন নাকি মায়ের পালকের ঝাপটায় পরাধীন থাকা বাচ্চাগুলো স্বাধীন?
নিঃসন্দেহে দ্বিতীয়রা স্বাধীন। কেননা নিজের জীবনের বিনিময়ে অপরের জীবন রক্ষার মতো এমন নিরাপত্তারক্ষী পৃথিবীতে দ্বিতীয় আর হয় না। সেক্ষেত্রে প্রত্যেকটা মানুষের মায়ের অধীন থাকা  ঘুমন্ত শিশু তার মায়ের উপস্থিতিতে স্বাধীন।
সুতরাং পরাধীনতা সবসময় নিরাপত্তাহীনতা নয়। তাই স্বাধীনতা শব্দের বিপরীত শব্দ পরাধীনতা নয়। কেননা আমার কাছে  স্বাধীনতার বড় অর্থ  নিরাপত্তা। মজলুমের নিরাপত্তা, দেশের নিরাপত্তা ইত্যাদি।  অথচ পরাধীনতার অর্থ সবসময়ই নিরাপত্তাহীনতা হয় না।

স্বাধীনতা শব্দের সাথে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক দুটো শব্দ হলো মৌলিক চাহিদা এবং অতিরিক্ত চাহিদা বা ইচ্ছে বা শখ। মানুষের অফুরন্ত ইচ্ছের মধ্যে যেগুলো তার জীবন ধারণের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় ও অত্যবশ্যকীয় তা তার মৌলিক চাহিদা। বাকি চাহিদাগুলো হলো বিলাসিতা বা অন্যকিছু। স্বাধীন দেশে অবশ্য মৌলিক চাহিদাসমূহকে মর্যাদা দিয়ে মৌলিক অধিকার নামকরণ করা হয়।
যায়হোক, মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণের যুযোগকে স্বাধীনতা বলে। আর বাকি চাহিদা বা ইচ্ছেগুলো পূরণের সুযোগকে স্বাধীনতার সর্বোচ্চ পর্যায় বলে বিবেচনা করা হয়। মানুষের সকল ইচ্ছে বা শখ বা চাহিদা পূরণের বড় সীমাবদ্ধতা হলো নিরাপত্তা। সকলের সকল ইচ্ছে পূরণের  এই নিরাপত্তা যে পরিবারে, যে সমাজে বা যে দেশের মানুষের মধ্যে নিশ্চিত থাকে সেই পরিবার, সমাজ বা দেশকে স্বাধীন বলা চলে।
পরাধীন দেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। বর্তমানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে ধরা যাক। উক্ত দেশে ভ্রমণে যেয়ে কারো শখ পূরণ দূরে থাকুক জীবন বাঁচিয়ে সুস্থভাবে ফিরে আসা যাবে এই গ্যারান্টি কে দিবে?
এটা তো দূর দেশের কথা বললাম। আমরা যেখানে আছি অর্থাৎ এই পরিবার, এই সমাজ, এই সংসারের কথায় আসি একবার।
আমাদের অনেক সাহিত্যিক,দার্শনিক কিংবা রাজনীতিবিদরা স্বাধীনতা শব্দের বৃহৎ ব্যবহারটা করেন দেশের ক্ষেত্রে। অথচ স্বাধীনতা শব্দটি অনেক  বৈচিত্রপূর্ণ এবং এটা কেবল জীবনের  একটি নির্দিষ্ট অংশের জন্য সীমাবদ্ধ না থেকে বরং প্রত্যেকটা প্রাণীর  জীবনের সর্ব অংশে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে বিশেষ ও অসীম চাওয়া হিসেবে। এবং কালান্তরে জীবন যাপনের নতুন পদ্ধতি কাঠামো উদ্ভাবনের সাথে সাথে স্বাধীনতার সুপ্ত ধরণ গুলো প্রকাশিত হয়। তাই  “”স্বাধীনতা মানে কী”” এটা নিয়ে যতই গবেষণা হয়ে থাকুক না কেনো তা যথেষ্ট মনে করি না। তাই  শুধুমাত্র ‘দেশ’ নামক ক্ষেত্রে স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ রাখা চরম ভুল।
শুরুতেই একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চেয়েছি যে, নিরাপত্তার জোরে হলেও পরাধীন থেকেও  স্বাধীন থাকা যায়।  ঠিক একইভাবে বলবো, স্বাধীনতার মধ্যেও রয়েছে পরাধীনতা। দেশের ক্ষেত্রেও তাই। আর এখানেই স্বাধীনতা শব্দের ব্যাপক ক্ষেত্রের বিস্তীর্ণতা ও গভীরতা প্রকাশ পায়।
তার মানে হলো, স্বাধীন দেশের মানুষও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। যেমন আমাদের সমাজের এমন কিছু প্রচলিত  রীতি আছে যেখানে সে দেশের সরকার ইচ্ছে করলেই হস্তক্ষেপ করতে পারে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের অধীন থাকা নারীর প্রতি নিত্য অবজ্ঞা, অবহেলা তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।  এখনো সমাজে কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে বিচারের সময় বিচারকের চিরাচরিত বুলি (মেয়ে বাইরে যায় কেনো)  শুনার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয় ধর্ষিতার বাবাকে। এমনি করেই দেশের মতো পরিবারে,সমাজে যাবতীয় নির্যাতন সহ্য করতে হয় পরাধীনদেরকেই।

স্বাধীনতার একটা বৃহৎ ও অনস্বীকার্য শাখা হলো বাক স্বাধীনতা। মুখ দিয়ে নিজস্ব মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বাক স্বাধীনতা বলে। কোনো জাতির স্বাধীনতা হারানোর প্রথম ধাপই হলো বাক স্বাধীনতা হরণ। স্বাধীনতা মানেই অসীম বা সীমাহীন চাওয়া। এই চাওয়া বা ইচ্ছে যদি ঐশ্বর্যশালীদের কাছে পেশ না করা যায় বা করলেও গ্রহণযোগ্য না হয় তবে স্বাধীনতা আর থাকলো কোথায়?
এইখানে আবারও স্বাধীনতাকে নিরাপত্তাতে খুঁজতে হচ্ছে।   স্বাধীনতার বিপরীত শব্দ তাই পরাধীনতা না হয়ে নিরাপত্তাহীনতা হবে । আবার সীমাবদ্ধতাও হতে পারে তবে নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই। 
তবে হ্যাঁ, স্বাধীনতার বিপরীত শব্দ পরাধীনতা না হলেও পরাধীনতার বিপরীত শব্দ নির্দ্বিধায় স্বাধীনতা।

এতো কিছুর পরেও যারা দুয়ে দুয়ে চার মেলাতে পারলো না তাদের জন্য মোদ্দা কথা এই যে,
যারা কোমর বেঁধে রাস্তায় নেমে নির্দ্বিধায় চিৎকার করে বলতে পারে “”আমরা স্বাধীন”” তারা আসলেই স্বাধীন।
তাহলে পরাধীনরা কী করতে পারে?
এইখানেই কবি বাকরুদ্ধ!  এইখানেই কবির কলমের উদ্ধত কালি প্রতিবাদের আগুনে সমাজকে জাগিয়ে তোলে। মহাত্মা গান্ধীজি বা শেখ মুজিবের মতো অসাম্প্রদায়িকদের ধ্রুপদী নেতৃত্বে  সংগ্রাম কখনো সফল হয় কখনোও বা চিরাচরিত মার খায় পরাধীন।