Motior Rahman Sumon

September 7, 2021 0 By JAR BOOK

 

 কবি ও লেখক পরিচিতি

Motior Rahman Sumon

Student

343/A, Bangabandhu Hall, BAU

বৃক্ষ হব

এম.আর.সুমন

আঁধারে নিমজ্জিত থাকিয়া আলো খুঁজিব সে সাহস আমার কোথায়?
আলোকোজ্জ্বল চারপাশ নিস্তব্ধ রজনী, আমি অন্ধকারে আচ্ছন্ন!
প্রদীপ করে আলোকিত, নিজের চারপাশে অন্ধকারের ঝাপটা।
তুমি জ্ঞান-গর্ভে উচ্চ, ভেতরে আঁধারে ক্ষত-বিক্ষত।
আমি স্বাধীন হা হা! পরাধীনতার মর্ম সেকি বোধগম্য?
রক্ত শোষণে ক্লান্তি হবে, জয়ী হব স্বাধীনতায়।

রক্তে শোষণ প্রতিকার হবে কিসে?
আরো রক্তের প্রয়োজন!তবু অনিশ্চিত!
মেনে নিয়ে প্রদীপ হব, সেটাও কি শোভে?

আঁধারে নিমজ্জিত থাকিয়া আলো দেখিব, বলিব আলোর কথা সে সাহস কোথায়?
আমি বরং বৃক্ষ হব তাই বরঞ্চ শ্রেয়!

ক্ষণিকের মায়া

-এম. আর. সুমন

আসাদ সাহেব উচ্চপদস্থ হলেও মাটির মানুষ। শৈশব কেটেছে পদ্মার পাড়ে। লেখাপড়ায় ছিলেন খুব মনোযোগী, অনেক কষ্টে লেখাপড়া করেছেন। তারস্বরূপ আজকের আমাদের আসাদ সাহেব। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন কিশোরগঞ্জ- হাওর এলাকায়।

নতুন জায়গায়, নতুন মানুষের সাথে আসাদ সাহেবের সখ্য গড়ে উঠতে খুব বেশি অসুবিধা হয়নি। থাকা খাওয়ায় প্রথম দু-তিন দিন একটু সমস্যা হলেও অল্প সময়েই সব সহজ হয়ে গেলো বিশ্বস্ত রইসুল মিয়াকে পেয়ে। রইসুল মিয়ার মা মরা বার-তেরো বছরের মেয়ে আলেয়া । বাজার-সদাই সব রইসুল মিয়াই করে দেয়, রান্না করে আলেয়া।

অনেকদিন আগে এই কোয়ার্টারসে এক সাহেব থাকতেন তখন রইসুল মিয়ার বউ আমেনা রান্না করে খাওয়াইতো সাহেবকে। রইসুল মিয়া তখন হাওরে গরু নিয়ে বেড়িয়ে যেত। সারাদিন থাকতো মাঠে। সাহেব আমেনাকে খুব স্নেহ করতেন। আলেয়া জন্মানোর পর সাহেব অন্য জায়গায় বদলি হয়েছেন। আজ রইসুল মিয়ার মেয়ে হলেন আসাদ সাহেবের পরিচারিকা।

শুক্রবার দিন বিকেলে আসাদ সাহেব রইসুল মিয়াকে নিয়ে হাওর ঘুরতে বের হলেন। সূর্য রশ্মির তেজ অনেকটা কমে গেছে তবে কিছুদিন একটানা ছিলো পুরোদমে। হাওরে কোথাও পানি নেই। মাটি খাঁ খাঁ করছে। বিস্তৃত খোলা মাঠ। অনেকে গরু চড়াচ্ছে। গরু চড়ানোর কাজটা যুবক ছেলে-পেলেরাও করে থাকে বিকেলবেলা। গরুগুলো ছেড়ে দিয়ে নিজেরা খেলায় মেতে থাকে। আসাদ সাহেব তাঁর শৈশবে ফিরে গেলেন। বাবার সাথে সেও কত ঘাস কেটেছে, গরু চড়িয়েছে কখনোবা নদীতে গিয়েছে জাল নিয়ে মাছ ধরতে। ক্লাসে একবার প্রধান শিক্ষক সব ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে পরিচয় হতে এসে জিজ্ঞেস করলেন- এই ক্লাসে রোল এক কার?
আসাদ চুপচাপ উঠে দাঁড়ালো। গায়ের শার্টের রঙটা হালকা হয়ে গেলেও দেখতে বেশ পরিপাটি। নিজেদের দীনতা ,বাবা-মায়ের আর্থিক অনটনের কথা কাউকে কখনো বুঝতে দিত না আসাদ।
আজ প্রধান শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলতে হল- বাবা মাঠে গরু চড়ায়, মা আরেকজনের বাসায় কাজ করে। সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আসাদের দিকে। প্রধান শিক্ষক সবার অবাক করাকে আনন্দে পরিণত করলেন হাত-তালির মাধ্যমে। আসাদের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে স্যার বলেছিলেন- আসাদ তুমি একদিন অনেক বড় হবে। সেদিন আজকের এই দিনগুলোর কথা ভুলে যেওনা।

রইসুল মিয়া বললেন- স্যার কি কিছু ভাবতাতাছুইন?
ও হ্যা-না। রইসুল তুমি না গরু চড়াতে, তোমার গরু কোথায় এখন? স্যার দুঃখের কথা আর না কই! আলেয়ার মা মইর‍্যা যাওনের পর আলেয়ার লালন-পালন নিয়া পড়লাম বিপদে। গরু আর রাহুন গেলোনা। দুইডা ছিল, দুইডাই বেইচ্যা দিছিলাম। আর কিনার সামর্থ্য অই নাই। রইসুলের কণ্ঠটা ভার ভার লাগছে। আসাদ সাহেব বললেন- রইসুল এখানকার সবচেয়ে নাম করা খাবার বা অন্য কী আছে? স্যার এইহানে তো তেমন কিছু নাই। তই শখিনার মার একটা দোহান আছে। ঐহানের চা’র নাম সবার মুহে মুহে শুনুন যায়। বুলেট চা!
তাই নাকি? চল তাহলে আমরাও আজ চা খেয়ে আসি।

হরেক রকমের চা পাওয়া যায় শখিনার মা’র দোকানে। বুলেট চা, মালটার চা, তেতুলের চা ইত্যাদি ইত্যাদি। বুলেট চা খেতেই সবার আগ্রহ এখানে। চা আবার বুলেট হয় নাকি? বুলেট চা কি রকম? এই রহস্য উদ্ধারের জন্যেই মানুষের এখানে এত ভিড়। বেশি করে কাঁচা মরিচ সাথে লেবু, আদা, তেতুল ইদ্যাতির মিশ্রণে তৈরী হয় বুলেট চা।
রইসুল বলল- স্যার এইডার জইন্যে এত কিছু।
হ্যা রইসুল মিয়া। অজানার প্রতি মানুষের আগ্রহ সব সময়। পেয়ে গেলে, জেনে গেলে আর আগ্রহ থাকে না।

আসাদ সাহেবের শরীরটা খারাপ করেছে। একটু জ্বর জ্বর লাগছে। আলেয়া রান্না শেষ করেছে কিছুক্ষণ আগে। মেঝেটা পরিষ্কার করে টেবিলে খাবার দিয়ে বড় সাহেবকে ডেকে জানান দিলেন।
আসাদ সাহেব কোন কথা বললেন না দেখে আলেয়া উঁকি দেয় রুমে। আসাদ সাহেব শুয়ে আছেন।
-বড় সাহেব আপনার কি শরীর খারাপ করছে?
না তেমন কিছু না। আলেয়া তোমাকে এত শুদ্ধ করে কথা বলা কে শিখিয়েছে? বড় সাহেব যে কী কন, আমরা গরীব মানুষ আমাদের আবার কে কি শিখাইবো?
আলেয়া তুমি কোন ক্লাস পর্যন্ত পড়েছো?
পড়িনাই সাহেব। শুনতে শুনতে ক, খ, স্বরবর্ণ, এ বি সি ডি, এক-দুই বানান শিখছি কবিতাও শিখছিলাম সাহেব কয়েকটা।

শুনতে শুনতে মানে ; কোথায় শুনতে? যে বাসায় আগে থাকতাম সেখানে ছোটমনি পড়তো আমি কাজ শেষ কইরা বইস্যা শুনতাম। ঐ বাসায় তো আর যাই না সাহেব। ঐ বাসার ছোট সাহেব উল্টা-পাল্টা কথা কইতো। সেদিন আমার হাত ধইরা টান দিছে। আপনে আসনের কিছুদিন আগে কাজ ছাইর‍্যা দিছি। চিন্তা করছিলাম আর কোনদিন কোন বাড়িতে কাজ করুম না। বাপের কথায় আবার-
আলেয়া শেষ করার আগেই আসাদ সাহেব বললেন- সবাই কী এক রকম হয় আলেয়া? মানুষের মাঝেই সব রহস্য, কত কত মানুষ অথচ কারো সাথে কারো কোন মিল নেই।
তা ঠিক সাহেব। আপনে খুব বালা মানুষ। মাইনষে কয়, বাপেও কইছে।
-তুমি তো শুদ্ধ করে বলতে পারো। সব সময় শুদ্ধ করেই বলার চেষ্টা করবে। আর আমাকে বড় সাহেব বলার দরকার নাই।
তাইলে কী বলমু সাহেব?
স্যার বলে ডাকবা।
আচ্ছা আলেয়া তোমার কী পড়তে ইচ্ছে করেনা? সবার সাথে স্কুলে যেতে ইচ্ছে করেনা?
আমাদের আর ইচ্ছা স্যার। আসাদ সাহেব চুপ করে রইলেন। আলেয়া দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে চলে যায়।
রাতে রইসুল মিয়া আসাদ সাহবের খবর নিতে আসে।
-শরীলডা কী বেশি খারাপ অইছে স্যার?
আরে রইসুল মিয়া তেমন কিছুই হয়নি। অনেক দিন পর হাঁটা-হাঁটি করছি শরীরটা তাই একটু জ্বর জ্বর লাগছে।
দেহি, স্যার কপালডা দেহি। জ্বরে তো স্যার পুইড়া যাইতাছে।
রইসুল মিয়া জ্বলপট্টি দিয়ে দিলো অনেকক্ষণ। এদিকে বাবার আসা দেরি দেখে আলেয়া আবার এসেছে আসাদ সাহেবের এখানে। আসাদ সাহেব কখন ঘুমিয়ে গেছেন বুঝতে পারেননি।
ঘুম ভাঙ্গার পর দেখেন রইসুল মিয়া ও আলেয়া মাথার পাশে বসে আছে। গা ঘামছে, জ্বর কমে গেছে অনেকটা।
আসাদ সাহেব অবাক দৃষ্টিতে- এ-কি আপনারা এতক্ষণ যাবৎ এখানেই বসে আছেন?
-এইডা কিছুনা স্যার। এহন তাইলে যাই স্যার। আপনে খায়া আবার ঘুমাইনযে।
আলেয়ারা চলে যাচ্ছে। আসাদ সাহেব তাদের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলেন এক দৃষ্টিতে। মায়ার বাঁধন বড় বেদনার। বড় রহস্যের। কখনো তা জন্ম দেয় বড় ভুলের!

সন্ধ্যার রান্না শেষ করে আলেয়া আসাদ সাহেবের কাছ থেকে পড়া শিখে নেয়। আলেয়া এখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। রইসুল মিয়া আসাদ সাহেবের সাহায্যে আবার একটা গরু কিনেছে। বিদ্যুতের আলোয় গ্রাম আলোকিত হলেও হাওরের মানুষ এখনো শিক্ষার আলো থেকে অনেকটা দূরে।

আমন মৌসুমের সময় হাওরের সবগুলো ক্ষেত সবুজে ঢেকে যায়। কৃষকেরা কেউ সার দিচ্ছে।কেউ-বা ঘাস বাছছে। কৃষকের মুখে হাসি ফোটেছে। কখনোবা অধিক বৃষ্টিতে হাওর পানিতে থই থই করে। চারদিকে তাকালে শুধু পানি আর পানি। বীজতলা, ধান ক্ষেত সব পানির নিচে চলে যায়। কৃষক মাথায় হাত দিয়ে আল্লাহরে ডাকে। হাওরের মত হাওরের মানুষের জীবনও বড় বৈচিত্র্যময়।

ইদানীং মানুষের মুখে মুখে আসাদ সাহেব আর আলেয়াকে নিয়ে গুঞ্জন শুনা যায়। রইসুল মিয়া কী বলবে ভেবে উঠতে পারেনা। কারো কথায় আলেয়ার কিছু আসে যায় না। সে জানে বড় সাহেব কেমন মানুষ।

কেটে গেলো বেশ কিছুদিন। সেদিন সন্ধ্যায় আসাদ সাহেব আলেয়াকে বললেন তুমি লেখাপড়াটা চালিয়ে যেও। তোমাকে অনেক বড় হতে হবে আলেয়া। আমি কাল চলে যাব। আলেয়া বললেন স্যার কয়দিন পর আসবেন? আর আসবোনা। বদলি হয়ে চলে যাচ্ছি অন্যত্র। নতুন যিনি আসবেন তাকে বলে যাব তোমার কথা। আলেয়া স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। যাওয়ার সময় শুধু বলল- আমার জন্য কাউরে কিছু বলতে হবে না। কিছু বলতে হবে না সাহেব।

জীবন বড় রহস্যময়। আকাশে মেঘ ডাকছে। বৃষ্টি হবে, কিছুক্ষণের মধ্যেই হবে। সেই বৃষ্টিতে ভেজা হবেনা আসাদ সাহেবের। আবার নতুন কোন সাহেব আসবেন। আলেয়ায় হয়তো রান্না করে দিবে। স্ত্রীর মৃত্যু, মেয়ের কষ্ট, সব ভুলে গিয়ে রইসুল মিয়া হয়তো আবার বড় সাহেবের সাথে ঘুরে বেড়াবেন। শখিনার মা’র দোকানে বুলেট চা খেতে নিয়ে যাবেন। অন্য কিছুও ঘটতে পারে।”