Monowar Hossain

September 9, 2021 0 By JAR BOOK

 কবি ও লেখক পরিচিতি

Monowar Hossain

Student

Dhanmondi 15, dhaka, bangladesh

কলকাতা কাহিনী (পর্ব- ১)

কলকতার দুই বছরে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাদের সাথে আমার সু-সম্পর্কে কোন ফাটল ধরেনি তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন মিন্টুদা। মিন্টুদার আদি নিবাস বাংলাদেশের আখাউড়া । স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তার বাবা তাদেরকে আসাম হয়ে ওপার বাংলায় নিয়ে যান। তখন তার বয়স ছিল মাত্র সাত বছর । যাই হোক,জীবনের অনেক চড়াই উৎরাই পার করে মিন্টুদারা এখন আগরপাড়ায় বেশ প্রভাবশালী । তিন তলা বাড়ি করেছে, গাড়ি কিনেছে, তার দাদা বিদ্যুৎ লাইনের ঠিকাদারি করেন, নিজের বড়োবাজারে জুয়েলারি দোকান আছে । এই হলো মিন্টু দার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি । সে এক অদ্ভুত চরিত্রের মানুষ। তার সম্পর্কে পরবর্তী পর্বগুলোতে বিস্তারিত জানাবো । আজকে শুধু তার সাথে প্রথম সাক্ষাতের স্মৃতিটুকু লিখবো । 


কলকাতায় আমি একদম নতুন । বাংলাদেশ থেকে যে ১৫০ ডলার নিয়ে গিয়েছিলাম তার মধ্যে ১০০ ডলার প্রথম তিন দিনেই শেষ হোটেল সম্রাটে থাকতে গিয়ে । অবস্হা বেগতিক হতে যাচ্ছে ভেবে বনগাঁর এক দাদাকে ফোন করলাম। মূলত, তার ভরসাতেই বাংলাদেশ থেকে বেড়িয়েছিলাম। সে ছিল পূর্ব পরিচিত। সেই দাদা মিন্টুদার নাম্বারটি দিয়ে বললো- আমার নাম বলে সমস্যার কথা জানাও , মিন্টু একটা ব্যাবস্হা করে দিবে নিশ্চয়ই। তার নির্দেশমতো সেদিনেই মিন্টু দাকে ফোন করে দেখা করতে গেলাম আগড়পাড়ায় ।


শ্যাম বর্ণের, ছোট-খাটো আর গোলগাল চেহারার অধিকারী মিন্টু দা । প্রথম দেখাতেই খুব আপনজনের মতো বললো- এসেছিস, চল বাড়িতে যাই। বাড়িতে ব্যাগটা রেখে একটু ঘুরি। বিকেলটা বেশ সুন্দর । [ অনেককে বলতে শুনেছি ,, বাংলাদেশ থেকে কোন অতিথি কলকাতায় গেলে নাকি প্রথম জিঙ্গেস করে , খেয়ে এসেছন না বাড়ি গিয়ে খাবেন । এই কথার সত্যতা আমি দুই বছরেও পাইনি। ] মাথায় অনেক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিলো। অনেক সমস্যার কথা বলার ছিলো। কিন্তু কিছুই বলার সুযোগ না দিয়ে একপ্রকার জোর করেই তার বাড়িতে নিয়ে গেলো। ওয়েটিং রুমে বসতে দিয়ে বললো- ব্যাগটা রেখে বস, আমি একটু ভিতর থেকে আসতেছি। একটু বসার কথা বললেও অনেক্ষন ধরে অপেক্ষা করেও দাদাকে আসতে দেখা যাচ্ছিলো না। পর্দার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখছি , দাদা বউদির পিছু পিছু ঘুরঘুর করছে। কৌতুহলবশত কান খাড়া করতেই দুই-একটা কথা শুনে যা বুঝলাম , দাদা বউদির কাছে টাকা চাচ্ছে কিন্তু বউদি টাকা দিতে চাচ্ছে না। কারন, ঘন্টা-দুয়েক আগেও নাকি ১০০০ টাকা নিয়েছে। যাইহোক, তাদের লেনদেনের হিসেব চলছে আর আমি নানা দুঃশ্চিন্তা নিয়ে অপেক্ষা করছি। এমন সময় সাদা ধপধপে একটা বালিশ হাতে এক ভদ্রলোক ওয়েটিং রুমে ঢুকে বেশ ভূবনমোহিনী হাসি দিয়ে বললো- দাদা আপনার কাছে কি কাগজ- কলম আছে? আমি কথা না বাড়িয়ে বললাম আছে। কেন? ভদ্রলোক বিনয়ের সাথে বললো- এই একটা হিসেব করে দিতে হবে আর কি। আমি পকেট থেকে কাগজ আর কলম বের করে বললাম – বলুন কি হিসেব?

 
লোকটি বললো- লিখুনঃ
তুলা=২৫০ টাকা
কভার = ১০০ টাকা
মজুরিী =১৫০ টাকা
বালিশ =৫০০ টাকা
————————–
মোট =১০০০ টাকা

 
এরকম হিসেব দেখে তো আমার চোখ কপালে। আড়চোখে তার দিকে তাকাতেই লোকটি মোদিমার্কা বিনয়ের ভাব নিয়ে বললো- সস্তায় পেয়েছি না দাদা? নিজের পকেট থেকে কারিগর ছেলেটাকে ৫০ টাকা বকশিস দিয়েছি। সেটা লিখলাম না। দাদা আবার কি মনে করে ।
আমি মনে মনে উৎকন্ঠায় আছি, মিন্টুদার কাছে লোকটা কি রকম অপদস্ত হয় দেখার জন্য। কিছুক্ষন পর মিন্টু দা এলে বালিশটা নিয়ে চিরকুটটা দুই-তিনবার মনোযোগ দিয়ে পড়ে বললো- সেন্টু রিকসা ভাড়া যে লিখো নাই। আমিতো পুরাই অবাক।সেন্টু আমতা আমতা করে বললো-দাদা, থাক লাগবে না। মিন্টুদা রিকসা ভাড়া বাবদ আরও ১০০ টাকা জোর করে তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাকে বিদায় করে দিলো। এবার আমি একটু বুদ্ধিমান ভাব নিয়ে বললাম- দাদা, হিসেবটা দেখেছেন ভাল করে? দাদা আর একবার চিরকুটটার দিকে তাকিয়ে বললো- হিসেব ঠিক আছে, শুধু লিখতে একটু ভুল করেছে । জোড় দিয়ে বললাম- লিখেছি আমি, ভূর হওয়ার প্রশ্নই আসে না। দাদা একটু হেসে বললো- ওহ, তুই তো জানিস না , তাই ভুল করেছিস । শেষে যে বালিশ ৫০০ লিখেছিস, এখানে লেখার দরকার ছিলো শিবের প্রসাদ( গাঁজা )৫০০। আমি বললাম- বুঝলাম না দাদা । দাদা বললো- বুঝবি কি করে , তুই যে নতুন ।আসলে ওর একটু শিবের প্রসাদের উপর ভক্তি- শ্রদ্ধা আছে । টাকার টান পড়েছে, তাই হয়তো,,,,,,,,,,,,,,,,,,,। আর আপনিও কিছু না বলে দিয়ে দিলেন? দাদা বললো- গত দশ বছর ধরে আমার ম্যানেজারি করতেছে, একটু হাতটানের অভ্যাস থাকলেও লোক ভালো। তাছাড়া শিবের প্রসাদ বলে কথা, এখানে না করতে নাই। আসলে শিবের প্রসাদের ভক্ত আমি ওর থেকে বেশি। সেই অর্থে সেন্টু আমার অনুসারী। অনুসারীদের সবসময় ক্ষমার চোখে দেখতে হয় , না হলে ভক্তি- শ্রদ্ধা পাওয়া যায় না। দাদার সেই উপদেশবানী বা আঙ্গাবাক্য মাথায় রেখে আজও আমি অনুসারীদের সাথে মনোমালিন্যের আচরন করি না । প্রসঙ্গত, বলার লোভ সামলাতে পারছি না। কয়েকমাস আগে বাংলাদেশেও বড় ধরনের বালিশকান্ড ঘটে গেল, সবাই হা-হুঁতাস করলো, দেশ গেলো- দেশ গেলো বলে। ফেসবুক, হটসআপ, টুইটারের নিউজফিড লিখে ভরিয়ে দিলো।আমি কিন্তু নিশ্চুপ ছিলাম। কারন, এর আগেই দুই-একটা বালিশকান্ডের সম্মূখীন হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল এবং মিন্টুদার বদৌলতে জানতে পেরেছিলাম এগুলো আসলে গুরু-শিষ্যের সূক্ষ প্রেম।”