Miath Ahmed Shuvo

September 7, 2021 0 By JAR BOOK

 

 কবি ও লেখক পরিচিতি

Miath Ahmed Shuvo 

Student

Chittagong road, siddirganj ,Narayanganj

মনের ডানা

অনুরাধার পাশের বাড়ির মালতীর আজ বিয়ে। সকাল থেকে সাজো সাজো রব।বর কোটিপাতি বাবার একমাত্র ব্যবসায়ী সন্তান।মালতীর বাবা শ্যামল বাবু কোটিপতি জামাই পেয়েছে। মেয়ে সুখের কথা ভেবে বিয়ের আয়োজনের কোন ত্রুটি করেননি।অনুরাধা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মালতীর গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান দেখছিল।এমন সময় অনুরাধার মা মায়া দেবী মেয়ের গায়ে হাত দিয়ে বলেলন…
এভাবে দাঁড়িয়ে আছিস কেন মা?আজ যখন স্কুলে যাবি না, তখন না হয় মালতীদের বাড়ি থেকে একটু ঘুরে আয়।এভাবে সব সময় মন খারাপ করে থাকিস কেন?যা…মা,একটু ঘুরে আয়।আমি তমালকে খায়িয়ে স্কুলে দিয়ে আসছি…। অনুরাধা মায়ের কথার কোন উত্তর না দিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে বুকে নিচে বালিশটা টেনে নিয়ে শুয়ে পড়ে ভাবছে মালতী নিশ্চয়ই ঘরের লক্ষ্মী হবে।আর যদি না হয়,তবে….?

মায়া দেবী তমালকে স্কুল দিয়ে আসার জন্য বেরিয়ে গেলে অনুরাধা হাও হাও করে কেঁদে ওঠে..। অনুরাধা ভাবে তারও তো এই মালতীর মতো ঘটা করে বিয়ে হয়ে ছিল!সেও লাল বেনারসি পরে কারোর নববধূ সেজেছিল।সেও তো সুখের সংসারের স্বপ্ন দেখেছিল। এই সব ভেবে চোখের জল সে কিছুতেই আটকাতে পারছে না।চোখের জলে ছবি হয়ে উঠল সেই আট বছর আগের দিন গুলো….

সে দিন অনুরাধার কলেজ যাওয়ার দেরি হয়ে গেছে তাড়াতাড়ি করছে এমন সময় অনুরাধার বাবা সুনীল বাবু মেয়েকে ডেকে বললেন….কোথায় যাচ্ছো এখন? অনুরাধা ব্যাস্ততার ভঙ্গিতে বলে.. কলেজে বাবা। সুনীল বাবু একটু বিরক্তি নিয়ে বলেন…আমি যে কাল বললাম মোহন বাবু ও তার পরিবার আজ আসবেন!তোমাকে ওরা ওদের ছেলের জন্য পছন্দ করেছেন।আজ পাকা কথা বলে বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক করে যাবেন!তবে তুমি কলেজে বেরোচ্ছো যে? অনুরাধা দৃঢ়তার সঙ্গে বলে..বললাম তো বাবা, আমি এখন বিয়ে করতে চাইনা।আর কতোবার বলবো বাবা আমি পড়তে চাই।আমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে চাই,একেবারে নিজের মতো করে।মোহন বাবু রেগে গিয়ে বললেন..রাখো তোমার পড়াশুনা।এমন পাত্র হাতছাড়া হয়ে গেলে আর পাবো না।আমি ওদের পাকা কথা দিয়েছি।বিয়ে তোমার করতে হবেই।ছেলে সুদর্শন শিক্ষিত। যদিও বেকার।তবে কোটিপতি সোনা ব্যাবসাসী বাবার সন্তান। আভিজাত্য পরিবার এলাকায় সুনাম আছে।তুমি ওখানে সুখে থাকবে,ভালো থাকবে।ওখানেই তোমাকে বিয়ে করতে হবে-এটাই আমার শেষ কথা বলে মোহন বাবু কোন কাজে বেরিয়ে গেলেন।

অনুরাধা অসহায় নিরুপায় হয়ে পাথরের মতো কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে নিজের ঘরে গিয়ে কলেজের শাড়ি খুলে খাটে শুয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। কান্না শুনে মায়া দেবী ঘরে মেয়ে কাছে এসে গায়ে হাত বোলাতে বোলাতে বলেন..এমন করে না মা।তুমি মেয়ে সন্তান ঘরে কতদিন রাখবো? বিয়ে তো তোমাকে একদিন করতে হবে মা।বাবা যখন চাইছেন এখানে তোমার বিয়ে দিতে তখন তুমি আর অমত করো না।বাবা খোঁজ খবর নিয়ে দেখেছেন ভালো ধনী পরিবার।তোমাক ওরা সুখে রাখবে।আর ছেলেকে তো তুমি দেখেছো?কতো সুন্দর।তুমি কালো তবুও তো ওরা তোমাকে পছন্দ করেছে।আর আমাদের অবস্থা এমন নয় যে পরে অনেক টাকা পয়সা সোনা দানা দিয়ে তোমাকে এমন ছেলে দেখে বিয়ে দিতে পারবো!।তুমি এমন করো না লক্ষ্মীটি আমার। মায়ের কথায় অনুরাধা এই সত্যিটা বুঝতে পারল..তার নিজের কোন ইচ্ছা থাকতে পারে না,বা থাকতে নেই!আমি শুধু বাধ্য লক্ষ্মী মেয়ে।মূল ছেঁড়া ফুল ফল দেওয়া গাছ,যে এখানে পুঁতবে সেখানে ফুল ফল দিতে হবে…..।

অনুরাধা কোটিপতি শশুরের একমাত্র পুত্রবধূ বলে কথা। গা ভর্তি সোনার অলংকারে সাজিয়ে পুত্রবধূকে ঘরে তুলেছেন মোহনবাবু।অনেক কষ্টে তার বেকার বাউন্ডুলে ছেলের বউ জুটিয়েছেন।তার উপর আভিজাত্য পরিবার বলে কথা।লোক দেখানোর তো একটা ব্যাপার থেকে যায়…।

বিয়ের প্রথম দিন থেকে পরিবারের নানা সংস্কার শেখাতে থাকেন অনুরাধার শাশুড়ী।কোথায় কখোন কি করতে হবে কি করতে হবে না তা প্রায় হাতে ধরে শেখাতে থাকেন তিনি।তার ইচ্ছা বৌমাকে গৃহ কাজে নিপুনা বাড়ির লক্ষ্মী করে তুলবে। বিয়ের প্রথম কিছুদিন অনুধাধা বুঝে উঠতে পারছিলো না শাশুড়ী ঠিক কি শেখাতে চাইছেন।পরে সে বুঝতে পারে এই আভিজাত্য পরিবার সংস্কারারের অন্ধকারে ডুবে থাকা একটা পরিবার।টাকা আর টাকা নিয়েই এদের জীবনের আভিজাত্যের বড়াই।আর জীবনের সব সত্ত্বাকে দূরে রেখে স্বামীকে পতি পরম শুরু জ্ঞানে সেবা করা, শ্বশুর শাশুড়ীকে পিতা মাতা রূপে ভক্তি শ্রদ্ধা করে সুখের সংসার গড়ে তোলা।লোককে বুঝিয়ে দেওয়া তুমি এ ঘরের লক্ষ্মী।যেখানে শিক্ষা সংস্কৃতর কোন মূল্য নেই।

অনুরাধা ছোট বেলা থেকে পড়াশুনায় ভালো।ছোট থেকে তার স্বপ্ন সে বড়ো হয়ে ডাক্তারি পড়বে।এই স্বপ্ন নিয়ে সে কলেজে পড়েছে। কিন্তু সংসার আর সংসার-এই শব্দটা তাকে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে দেইনি।প্রথম দিকে শ্বশুর বাড়ির সব কিছু নীরবে মানলেও পরে অনুরাধা তার প্রতিবাদ করতে থাকে এবং নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছার প্রকাশ করতে থাকে অনুরাধা।তাই নিয়ে ঘটতে থাকে ছোটখাটো অশান্তি।যার কারণে মা বাবাকেও অনেক বার ছুটে আসতে হয়েছে মেয়েকে বোঝানোর জন্যে।স্বামী প্রথমে অনুরাধার পক্ষে থাকলেও প্রকাশ্যে মা বাবার বিরুদ্ধে যেত না। কিন্তু পরে সেও মা বাবার পক্ষ নিয়ে গালিগালাজ করতে থাকে।এমনকি নেশা করে গাঁয়েও পর্যন্ত হাত তুলেছে অনেক বার।

বাড়ির কাজ কর্ম,এটা করো এটা করো না।এটায় মঙ্গল,এটায় অমঙ্গল হয়।এ সবেতে অনুরাধা বড্ড হাঁপিয়ে উঠেছে। চারিদিক থেকে ঘণ অন্ধকার ঘিরে ফেলে তাকে। নিজের মা বাবা বার বার বোঝাতে থাকে তুমি না মেয়ে সন্তান?বিয়ের পরে শ্বশুর বাড়ি তার সব।সব কিছু মানিয়ে গুছিয়ে নিয়ে সংসার করতে হয়।মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার পর তারাও যেন কেমন দায়িত্ব কর্তব্য থেকে মুক্ত। অনুরাধা নিজেকে নিঃসঙ্গ অনুভাব করে প্রতিপদে।

ছোট বেলায় কিছু দিন নাচ গান শিখেছিল অনুরাধা। বাবার শেখানোর ইচ্ছা থাকলেও আর্থিক অবস্থা সেখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই বেশি দিন নাচ গান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি।একদিন অনুরাধা এ সব থেকে নিজেকে একটু মুক্তি দিতে গান শেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয় এ বাড়ির লোক জনের গান বাজনা নিষিদ্ধ আছে।তাই তাদের পূর্ব পুরুষের কেও কখনো এসব করেনি। তাছাড়া বাড়ির বৌ গান বাজনা করে বেড়াবে? কোথায় যাবে পরিবারের মান সম্মান? বাড়ির প্রবল বিরোধিতার কারণে সে ইচ্ছা আর পূরণ হয়নি অনুরাধার।তবে বই পড়ায় তেমন বাঁধা নিষেধ না থাকায় সময় পেলে অনেক বই পড়ত অনুরাধা।এমনি সাপ লুড়ুর খেলায় চলতে থাকা অনুরাধার জীবনে ঘটে যায় এক ঘটনা…..

সকাল বেলা বাড়িটা একটু থমথমে।যে যার কাজে ব্যাস্ত।অনুরাধা সন্তান সম্ভাবা।তাই সামান্য কাজ করেই সে হাঁপিয়ে পড়েছে। একটু শুয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে।এমন সময় পোষ্ট মাস্টার বাড়িতে এসে হাকা হাকি শুরু করেছেন… কোথায় এ বাড়ির লক্ষ্মী বৌটি কোথায়?সুখবর আছে,সুখবর। বাড়ির কেউ সারা না দেওয়ায় অনুরাধা আস্তে আস্তে উঠে এসে বলে…আসুন বসুন কাকাবাবু।কি সুখের খবর আনলেন? পোষ্ট মাস্টার হেসে বলেন..তুমি চাকরী পেয়েছ।এই তোমার নিয়োগ পত্র এসেছে।তুমি স্কুলের দিদিমনি হয়েছ।হ্যাঁ হ্যাঁ কাকাবাবু আমি সেবার বাপের বাড়িতে থাকাকালীন চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিলাম।আমি পাশ করেছি!আমি দিদিমনি হয়েছি! পোস্ট মাস্টারের হাত থেকে চিঠিটা এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে দৌড়ে ঘরে গিয়ে কাঁদতে শুরু করে।

বৌমার চাকরির খবরে বাড়ির থমেথমে আকাশটা গম্ভীর কালো মেঘে ছেয়ে গেল। ঝড়বৃষ্টি সময়ের অপেক্ষায়। সেই ঝড়বৃষ্টি শুরু হল রাতের খাওয়ার টেবিলে।মোহন বাবু বৌমাকে বলে দিলেন… এ বাড়ির বৌ চাকরি করবে না।টাকা পয়সার এমন অভাব হয়নি ঘরের বৌ বাইরে যাবে। এতে পরিবারের সম্মান যাবে।তাছাড়া এ বাড়িতে যে নতুন অতিথি আসছে তার দেখাশুনা করবে কে?তাকে মানুষ করবে কে? কোন মতে চাকরি করা যাবে না। অনুরাধা একটু চুপ থেকে বলে…শুনুন বাবা,আমি এ চাকরি করবো।আমি এভাবে নিজেকে শেষ করতে পারবো না। আমার একটা জীবন আছে। আমার ইচ্ছা অনিচ্ছা আছে।স্বামীর জুতো জোড়া পরিস্কার করবো। পায়ে পরিয়েও দেবো।এই ভালো স্ত্রী হতে আমি পারবো না।দাসীর মতো জীবন নিয়ে আমি শুধু এ বাড়ির লক্ষ্মী বৌ হয়ে থাকতে চাইনা।এ জীবন থেকে আমি মুক্তি চাই।

বৌমার মুখের উপর কথা বলায় মোহন বাবু অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বললেন.. চাকরি তুমি করবে না এটা শেষ কথা।আর ঘরের বাইরে গেলে এ ঘরের দরজা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। অনুরাধা শ্বশুরের কথার জবাব দিতে দেরি না করে বলে দিল..চাই না আমি ঘর।চাই না এ দাসত্বের জীবন।চাই না হতে এ ঘরের লক্ষ্মী হয়ে থাকতে।আমি চাকরি করবোই।তাতে যদি এ ঘরের দরজা চিরতরে বন্ধ হয় তো হবে।এ সংসার কারাগার আমি চাই না।আমি চাই মুক্ত আকাশ।শ্বশুরের মুখের উপর কথা আজ প্রথম দেখল বাড়ির সবাই। তাই বেগতিক দেখে সবাই একরকম চুপ হয়ে যায়।

অনুরাধার স্বামী বাবার মতের বিরুদ্ধে কথা বলে স্ত্রীর ইচ্ছার মর্যাদা দেবে সেই মেরুদন্ড তার নেই।কারন সে এখনো বাবার পয়সায় নেশা করে গভীর রাতে বাড়ি ফেরে।স্ত্রীর প্রতি সামান্য দায়িত্ব কর্তব্য টুকু সে কখনো দেখায়নি।তাই সকালে যখন অনুরাধা শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে বাপের চলে আসে তখন কোনরকম তাকে বাঁধা দেয়নি। শাশুড়ী পিছন থেকে বলেছিলেন..এমন অলক্ষ্মী ঘরে না থাকা ভালো তাতে ঘরের অমঙ্গল হয়।”