Mahmudul Hasan Sumon

September 9, 2021 0 By JAR BOOK

 কবি ও লেখক পরিচিতি

Mahmudul Hasan Sumon

Medical Student,3rd year

Kharampur,Sherpur Sadar,Sherpur.

নীলা


নীলার পেটে আমাদের প্রথম বাচ্চা।সাতমাস হয়ে গেলো।আমরা বাচ্চার নাম ঠিক করে রেখেছি।নীলা আমাকে হেসে হেসে সেদিন বলছিলো,’রাতুল,কি অদ্ভুত ব্যাপার বলো?আমাদের সন্তান পৃথিবীতে এসে জানতে পারবে তার জন্মের আগেই নাম রাখা হয়ে গেছে!হি হি হি!””
নীলা খিলখিল করে হাসতে থাকে।আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি নীলার দিকে।সন্তান পেটে এলে মায়েরা নাকি তার জীবনের কিশোরী বেলায় ফিরে যায়।নীলা জিজ্ঞাস করে, “”তুমি কি নাম ঠিক করে রেখেছো গো?”” আমি আলতো করে নীলার পেটে মাথা রেখে বলি,””মেঘ””! নীলা মুখ ঘুরিয়ে ডাক্তারের লিখা প্রেসক্রিপশনগুলোতে বার বার চোখ বুলিয়ে নেয়।নিয়ম করে ওষুধ খায়।আমি “”বাবা””-হতে যাচ্ছি একটা জীবন্ত প্রাণ কিছুদিন পর আমাকে “”বাবা””-বলে ডাকবে?আমার ঘোর ঘোর লাগে!’
নীলার ছোটোবেলা থেকে শ্বাসকষ্টের সমস্যা ছিলো।ভার্সিটিতে পড়ার সময় থেকেই তাকে দেখে আসছি নিয়ম করে ইনহেলার ব্যাবহার করে আসছে।তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলে সে পাগলের মতো ইনহেলার খুঁজে ফেরে।যেন এক মূহূর্তের দেরী হলেই সে মারা যাচ্ছে।আমি ভীষণ অস্থির হয়ে যাই ঠিক সেই মূহূর্তে।শুধু আলতো করে ওর ঘামে ভিজে যাওয়া মুখে হাত বুলিয়ে দিই।ও শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরে।তারপর দ্রুত শ্বাস নিতে নিতে বলে,’রাতুল!আমি বাঁচবোনা..আমি বাঁচবো না রাতুল!””
নীলা আমাকে ডেকে বলে,””এই চলো!আজ রাতে আমরা লং ড্রাইভে বের হই।আজ না ভরা জোসনা?ক্যালেন্ডারটা দেখো!আমি বড় করে মার্কার পেন দিয়ে হাইলাইটেড করে রেখেছি।”” আমি ক্যালেন্ডারে তাকাই।নীলা ক্যালেন্ডারকে ছোটোবেলার বই এর মতো করে লিখে লিখে ভরিয়ে ফেলেছে। ১৫ই এপ্রিলে দাগ দিয়ে লিখেছে-“”রাতুলের জন্মদিন। আমরা সারাটা বিকেল-সন্ধা দুজন রিকশায় ঘুরবো!”” আমি মুচকি হাসি।ও আমার হাসিতে আনন্দ পায়।আমি আমার গাড়ির ড্রাইভার মতিন মিয়াকে বলে দিই,চাবিটা রেখে যেতে আজ আমি ড্রাইভ করবো। সন্ধা নাগাদ আমরা গাড়ি ছুঁটিয়ে বেরিয়ে যাই।নীলার প্রিয় কিছু গ্রামের রাস্তায়।
নীলার গ্রামের রাস্তাগুলো নাকি ভীষণ প্রিয়।এদিকের আকাশ নাকি অদ্ভুত রকমের সুন্দর। রাতে রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে নীলাকে বলি,””নীলা,আকাশের আবার আলাদা রকম হয় নাকি? আকাশ তো সবই এক!সব জায়গা থেকেই একরকম।”” নীলা খানিকটা মাংস তুলে নিয়ে,আমার পাতেও তুলে দেয় অনেকটা।””আমি এতো খেতে পারি না নীলা!””-বলে একটু বিরক্ত হই।নীলা মুখ ফিরিয়ে নেয়।অভিমানে তার চোখ ভিজে ওঠে।নীলা এক আস্তে করে আমার হাত চেপে ধরে বলে,””আমি মারা যাচ্ছি রাতুল!”” আমার কণ্ঠ থেকে কোনো শব্দ বেরুয় না।অখন্ড নিরবতা। আমি নীলার দিকে অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকি। আমরা খাবার শেষ করে রাতের রাস্তার নির্জন হাইওয়ে ধরে এগুই।নির্জনতা ভেঙে নীলা বলে ওঠে- “”শহরের আকাশগুলোর দিগন্ত ছুঁয়ে থাকে একগুচ্ছ দালান। আকাশে তাকালেই কৃত্তিমতা সবটা জুড়ে।গ্রামের আকাশে ওসবের বালাই নেই।দিগন্ত অব্দি সবুজ।তার উপর ভেঙে পড়ে একটা অখন্ড আকাশ।ওসবের সৌন্দর্য,তুমি বুঝবে বুদ্ধু!””
গাড়িতে নীলার খুব প্রিয় একটা বাংলা গান বাজিয়ে দিই। “”আমি তোমাকেই বলে দেবো.. কী যে একা দীর্ঘ রাত.. আমি হেঁটে গেছি বিরান পথে.. ছুঁয়ে কান্নার রং,ছুঁয়ে জোসনার ছায়া!”” নীলার মূহূর্তেই মন ভালো হয়ে যায়।আহারে নীলা!কি যে মুড সুইং করে ওর!সম্ভবত শুধু ওর না এবয়সী সব নারীদেরই।নীলা আস্তে করে বলে ওঠে,””এই!!বৃষ্টি নামছে!চলো আমরা শেষবারের মতোন বৃষ্টিতে ভিজি!”” আমি নীলার পেটের দিকে এক মূহূর্ত তাকিয়ে বলি,””এ অবস্থায় বৃষ্টিতে ভেজা উচিত হবে না নীলা!আমাদের বাচ্চা…।”” “”কিচ্ছু হবে না!চলোতো!”” নীলা আমাকে থামিয়ে দেয়। আমার হাত টানতে টানতে ঠিক হাইওয়ের মাঝ অব্দি নামিয়ে আনে।বৃষ্টির স্রোত গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে আমাদের। কি যে ভালো লাগছে!সেদিকে আমাদের ভ্রুক্ষেপ নেই।আমরা তাকিয়ে আছি একে অন্যের দিকে।ধীরে ধীরে কাছাকাছি এগিয়ে আসছি।আমার চশমার কাঁচে ঝাঁপসা হয়ে আসছে নীলার মুখ।নীলা খানিকটা লজ্জায় মাথা নুইয়ে ফেলে!আমি নীলাকে অন্ধকার হাইওয়েতে জাপটে ধরি।নীলা খানিকটা কেঁপে ওঠে। এদিকের রাস্তায় কোনো ল্যাম্পপোস্ট নেই।ঝড়ঝড় করে বৃষ্টি পড়ছে অন্ধকারে।পাশেই আমাদের প্রাইভেট কারটা থামিয়ে আমরা বৃষ্টি ছুঁতে নেমেছি।সেই বৃষ্টি যে নীলার এতো প্রিয় তা আমার আগে জানা ছিলো না। আমি নীলার চুলগুলো খানিকটা এলোমেলো করে দিয়ে কানের কাছে মুখ গুজে বলি,””নীলা,তুমি সত্যি মারা যাচ্ছো?””
নীলা,অন্ধকারে ফুসফুস করে শব্দ করতে থাকে।আমার বুকে অন্ধকারে মাখা ঠোকে।যেভাবে প্রার্থনায় বসে মানুষ মাথা ঠোকে মসজিদে-মন্দিরে,ঠিক সেইভাবে।আমি নীলার শরীরের উত্তাপ অনুভব করি।নীলা খানিকটা বৃষ্টি হাতে নিয়ে আমার গালে মাখিয়ে দেয়।আমি নীলার ছেলেমানুষী দেখতে থাকি।খুব ছোটোবেলা বৃষ্টিতে ভেজার সময় যেভাবে মেয়েরা আহ্লাদ করে,অনেকটা সেরকমভাবে।আমি নীলার আহ্লাদ দেখে থামিয়ে দিই না।শুধু অল্প একটু হেসে ওঠি। আমার চোখ থেকে ঝরঝর করে জল গড়িয়ে পড়ে।সে জল মিশে যায় বৃষ্টির সাথে। নীলার তিন দিন হলো,শরীরে প্রচন্ড জ্বর,মাথাব্যাথা,শুকনো কাশি আর গলায় প্রচন্ড ব্যাথা।আমার ভয় হয় করোনা কিনা।সিম্পটম্পগুলো যে হুবহু মিলে যাচ্ছে।আমি আইইডিসিআর এর হটলাইনে কয়েকশোবার ফোন করি।ডাক্তার দেখাই,অনুরোধ করেছি বারংবার।নাহ!ওরা কোনো স্যাম্পল নেয় নি।টেস্ট করার কন্ডিশন নাকি ভিন্ন।
এপ্রিলের ৫ তারিখ নীলার অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে।আমি ওপাশে রান্নাঘরে রান্না করছি,হঠাৎ নীলার ছটফটানি শুনতে পাই।নীলার গলায় প্রচন্ড ব্যাথা,ঠিকমত কথা বলতে পারে না।ওর প্রচন্ড শ্বাস কষ্ট শুরু হয়।আমি ওকে ড্রয়ার থেকে ইনহেলারটা বের করে দিই।ও পাগলের মতোন মুখে টেনে নিতে থাকে।ঘামে ভিজে যায় ওর শরীর।পাশের হসপিটালে ইমার্জেন্সিভাবে এম্বুলেন্সে করে নিয়ে যাই।ওরা করোনা সাসপেক্টেড বলে দিয়ে ঢাকার বড় হসপিটালে রেফার্ড করে দেয়।সে রাতেই গাড়িতে করে ওকে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হয়। ওর মা যায় আমাদের সঙ্গে।এর মাঝে একফাঁকে আমি বাসায় আসতেই একগাদা মানুষ আমাকে ঘিরে ধরে।পাশের বাসার আনোয়ার সাহেব আমাকে দেখেই বলে ওঠে,””ভাবীর নাকি করোনা হইছে?ঘটনা কি ভাই?সত্যি নাকি?”” গেটে ঢুকতেই দারোয়ান সালাম দিয়েই বলে,””স্যার!আমি চাকরি করবো না,আমার বেতনটা দিয়ে দেন,আমি চলে যাবো!”” আমি দাড়োয়ানের দিকে তাকিয়ে বলি,””তোর ভাবিকে ঢাকায় নিতে হবে রে!সিচুয়েশনটা অন্তত বোঝ!”” আমি কেঁদে দিই।আমার কান্না দারোয়ানকে স্পর্শ করে না।সে তার রুমের সব কাপড়-চোপড় গুছিয়ে ফেলে।আমি বাসায় জিনিস গুছিয়ে ঢাকা রওনা হবার সময় দেখি,আমার কাছে এ মূহূর্তে একগুলো টাকা নেই। আমি নিচ তলার আজগর সাহেবের দরজায় কড়া নাড়ি। “”আসগর সাহেব!”” “”আসগর সাহেব বাড়ি নাই।কি চাই বলেন!”” “”দরজাটা একটু খুলবেন?জরুরী দরকার।”” আজগর সাহেবের বউ দরজা খুলে না।ভেতর থেকে কাজের মেয়ে ফুলি চিল্লায়ে বলতে থাকে-“”আপনেগো না করোনা হইসে?আফায় দরজা খুলতে না করছে।যান তো এহান থেকা।”” আমি ঘরে ফিরি।আলমারিতে নীলার বিয়ের গহনাগুলো সামনে পড়ে।সেগুলো ব্যাগে ভরেই বেরিয়ে পড়ি।বাইরে নীলার এম্বুলেন্স “”পো..পোও..””-শব্দ করে উপস্থিতি জানান দেয়।আমার শাশুড়ি ডাকতে শুরু করে,””বাবা,জলদি করো!”” আমি দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামি।পাশের দেয়ালে একটা প্রচন্ড ধাক্কা খাই।আমার কপালের অনেকটা কেটে গল গল করে রক্ত বের হতে থাকে।আমি রক্ত উপেক্ষা করি।পকেট থেকে রুমাল চেপে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করি।কাজ হয় না। আমার রুমাল রক্তে ভিজে যায়।জীবনের প্রথমবারের মতো আমি নীলার চোখে তাকিয়ে নিজের কপালের কাটা দাগের কথা ভুলে যাই,রক্তে ভেজা রুমালের কথা ভুলে যাই। এম্বুলেন্স ঢাকা পৌঁচ্ছোয়।
হসপিটালের বারান্দায় ছুটাছুটি করতে থাকি।রিসিপশনের ভদ্র মহিলা আমাকে মিষ্টি করে হেসে বলে,””স্যার,এনি ইমার্জেন্সি?”” খুব সম্ভবত এরা মৃত্যুর ভয়কে আর ভয় পায় না রোজ মৃত্যু দেখতে দেখতে।যত বিপদই আসুক না কেন,এদের বলে দেওয়াই হয় রোগীর আত্নীয় বা কেউ রিসিপশনে আসলেই মিষ্টি করে হেসে দিতে। “”জি মানে,আমার ওয়াইফের সম্ভবত করোনা ভাইরাস আক্রমণ করেছে।”” “”করোনা সাসপেক্টেড?”” “”ও মাই গড!”” “”ভর্তি করাতে হবে হসপিটালে।ইমার্জেন্সি।কি করতে পারেন,বলবেন কি?”” ভদ্রমহিলা সাথে সাথেই কাউকে টেলিফোনে ফোন দেয়।তার মুখ আতঙ্কে শুকিয়ে গেছে। তারপর খানিকবাদে আস্তে করে ফোন নামিয়ে বলে,””সরি স্যার,আমাদের হসপিটালে এ মূহুর্তে কোনো নতুন রুগী ভর্তি করা হচ্ছে না।”” হাসপাতালের টিভিতে খবর চলছে।স্বাস্থ্যমন্ত্রী জোর কণ্ঠে বক্তব্য দিয়ে চলেছেন।””আমাদের দেশে এ মূহূর্তে কোনো করোনা আক্রান্ত রোগী নেই।যদি কেউ কোনো গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করেন,তাহলে তার বিরুদ্ধে আমরা যথাযথ আইনী পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করবো এবং কঠোর শাস্তি বিধান রয়েছে।”” আমি তার শাস্তিবিধানের দিকে মনোযোগ না দিয়ে পাগলের মতো সামনে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে থাকি।দুজন লোক এসেই আমার হাত ধরে আটকে ফেলে।ভেতর থেকে উচ্চ পদস্থ কেউ এসে এসে আমাকে কনভেন্স করার চেষ্টা করে। “”দেখুন,আমরা ঠিক এ মূহুর্তে কোনো এ ধরণের রিস্ক নিয়ে রোগী ভর্তি করাচ্ছি না।আপনি দ্রুত তার ব্লাড স্যাম্পল টেস্ট করানোর চেষ্টা করুন।অন্য কোনো হসপিটাল দেখুন।”” আমি কাঁদতে কাঁদতে ফ্লোরে বসে যাই,লোকটার পায়ের কাছে পড়ে অনুরোধ করি,””দয়া করে আপনারা আমার স্ত্রীকে বাঁচান,ওর পেটে আমার সন্তান।দিনে দিনে বড়ো হচ্ছে।একদিন জন্ম নিবে।আমাকে বাবা বলে ডাকবে…”” আমার কান্নার শব্দে কথা বন্ধ হয়ে আসে।

সকাল শেষ হতে থাকে।আমি নিরুপায় নিশ্চিত প্রত্যাখ্যান মানতে বাধ্য হয়ে এম্বুলেন্সে ফিরতে থাকি।স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হয়।উনি বিশ্বাসী গলায় বলতে থাকেন,””আপনারা কেউ আতঙ্কিত হবেন না।বিশ্বাস করুন,””করোনা মোকাবিলায় আমরা শতভাগ প্রস্তুত।””আমার কানে বক্তব্য শেষ হবার পর টিভির ওপারে মানুষের করতালির ধ্বনি কানে আসে। আমি গাড়িতে ফিরে নীলার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। নীলার সম্ভবত প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। আমি নীলার দিকে এগুতেই নীলা আমার সকল সমস্যা দূর করে,শ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দেয়।আমি অনেকক্ষণ পর্যন্ত বুঝতে পারিনা,নীলা মারা গেছে।কিংবা বুঝতে পারি হয়ত,বিশ্বাস করতে পারি না।এই পৃথিবীতে কিছু কিছু সত্য বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট হয়ে দাঁড়ায়।কিছু সত্য মিথ্যার মতোন মনে হয়।নীলা মারা যায়। রাতের অ্যাম্বুলেন্স শব্দ করতে করতে ছুটে চলে।আমার ব্যাগে থাকে নীলার বিয়ের গহনা,আমার চোখে থাকে নীলার আমার উপর করা অভিমানের জল।আমি কি অবাক হয়ে খেয়াল করি কালো মেঘে ছেঁয়ে গেছে আকাশ। আকাশেরও এতো রকমফের হয় খেয়াল করিনিতো আগে। নীলা খেয়াল করতো।নীলা আমাকে আকাশ চিনিয়েছিল।আর আমি নীলাকে চিনিয়েছিলাম পৃথিবী। যে পৃথিবীতে নীলার ক্যালেন্ডার ঝুলে আছে।দাগানো আছে পনেরো এপ্রিল।আমার জন্মদিন।যেদিন আমার আর নীলার একসাথে সারাটা বিকেল -সন্ধ্যা ঘোরার কথা ছিলো। আমি নীলাকে না জানিয়েই একটা নীল রঙা শাড়ি কিনেছিলাম।আর আমার জন্য নীলার হলুদ পাঞ্জাবী। নীলা আমাকে বলেনি যদিও পাঞ্জাবীর কথা। আমাকে চমকে দিতে চেয়েছিলো।আর আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেও না দেখার ভান করে যাচ্ছিলাম। কি আশ্চর্য!নীলা আমাকে সবচেয়ে বেশি চমকে দিলো।আমার নীলা। আমার প্রিয় নীলা।আমার সন্তানের মা নীলা। আমার খুব ভোরে ঘুম ভাঙানো নীলা।যার কফি ছাড়া আমার সকালের ঘুম কাটতোই না,সেই নীলা।
এম্বুলেন্স ছুঁটে চলে রাতের নৈশব্দ ভেদ করে।নীলাকে সেবার কবর দেওয়ার জন্য কোনো মানুষ পাওয়া যায় না।জানাজার জন্য কোনো মানুষ পাওয়া যায় না।বহু টাকার বিনিময়ে কয়েকজন লোক ম্যানেজ করে নীলাকে কবর দিই।নীলাকে কবর দেয়ার আগে সরকারী নির্দেশে নীলার শরীর থেকে স্যাম্পল নেয়া হয়,করোনা ভাইরাসের কোনো জীবানু আছে কিনা।দিন তিনেক পরে রিপোর্ট আসে করোনা নেগেটিভ।নীলার শরীরে কোনো করোনা ভাইরাসের জীবানু দ্বারা সংক্রমণ দেখা যায় নি। আমি প্রচন্ড ঘৃণা আর অবিশ্বাসে রিপোর্টকে ছিঁড়ে ফেলে আগুণ জ্বালিয়ে দেই।তারপর কোয়ারান্টাইনের রাতের পর রাত আমি না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিই।আমার চোখ পাথরের মতো স্থির হয়ে থাকে।আমি নীলার সব শাড়ি,কাপড়, ব্যবহারের সকল জিনিস বাড়ি থেকে আলাদা করে ওর চিহ্ন মুছে ফেলতে চেষ্টা করি। আমরা মানুষেরা ভুল করে বিশ্বাস করি,মানুষের চিহ্ন মুছে ফেলা গেলেই বোধহয় স্মৃতি মুছে ফেলা যায়।অথচ স্মৃতি গুলো মানুষের ব্যবহৃত জিনিসের চেয়েও যে অনেক বেশি থাকে বুকের ভেতর সেটা ভুলে যাই।চোখের দেখায় দৃশ্যমান জিনিসগুলোকে আমরা সরিয়ে ফেলতে পারি সত্যি,মনের ভেতর বসতবাড়ি তৈরি করা স্মৃতিগুলি মুছার সাধ্য কার? অনেক রাতে আমার হুট করে মনে হয় বারান্দায় ইজিচেয়ারে কে যেন বসে আছে।কে যেন কাঁদছে।একটা ছোট বাচ্চার ক্রন্দন ধ্বনি।খুব সম্ভবত বাচ্চা যখন একা একা থাকার পর বাবা মায়ের আদর আশা করে কান্না শুরু করে,অনেকটা সেরকম।আমি সব ভুলে বারান্দায় ছুঁটে যাই। চিৎকার শুরু করি,””নীলা…ও নীলা,কই তুমি?বাচ্চাটাকে একটু কোলে নাও না গো!বাচ্চাটা কাঁদলে আমার এত্তো খারাপ লাগে।”” বারান্দায় গিয়ে দেখি চাঁদের অল্প আলোতে খা খা করে।কেউ নেই।কারো কি থাকার কথাই বা ছিলো?না তো। আমার ঘোর কেটে যায়।আমার মা পাশের ঘর থেকে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।মাকে জড়িয়ে ধরে আমি পাগলের মতো,কাঁদতে থাকি।শব্দ করে কিছু বলত পারি না-আমারও তো আর দশটা মানুষের মতো একটা খুব সাধারণ একটা পরিবার নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন ছিলো।একটা ফুটফুটে চাঁদের মতো বাচ্চার মুখে তাকিয়ে সব ক্লান্তি ভুলে থাকার কথা ছিল। কাল থেকে আমি কার জন্য বাঁচতে শুরু করবো?কাল থেকে আমি দুঃখ পেয়ে নীলার মতো কার বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদবো?

 

কান্নাঘর

“রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই হুট করে একটা সাইনবোর্ডে চোখে আটকালো!সাইনবোর্ডে লিখা:-
“”কান্নাঘর””
এখানে সুলভ মূল্যে কান্না করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া হয়!’
কি আশ্চর্য!এ রাস্তায় তো এ সাইনবোর্ড আগে কখনো চোখে পড়েনি ।হালকা শীতের রাত!তখন সিলেটে কেবল বৃষ্টি থেমেছে।রাত একটা। আমি কফির নেশায় বের হয়েছি।কৌতুহল থামাতে না পেরে ভেতরে ঢুকেই পড়লাম!ওরে বাবা!কি দারুণ আয়োজন!২১ ডিগ্রীতে এসি চলছে!কেমন বিষন্ন ভায়োলিন আর খুব মৃদ্যু ভয়েসের কোনো গান চলছে!হালকা সবুজ আলো আর খানিকটা আধো-অন্ধকার ব্যাপার।শান্ত চারদিক!
আমি কাস্টমার ডেস্কে গিয়ে যোগাযোগ করতেই একটা টোকেন পেলাম।টোকেন নিয়ে সরাসরি-‘দুঃখঘরে!’আমা­র রুমটা পেয়ে গেলাম। ভেতরে ঢোকার আগে শুধু ম্যানেজার একটা কথা বললেন,আমরা বিশ্বাস করি-‘জন্মঘর’-যেমন রয়েছে-হসপিটাল,মৃত্যু­ ঘর যেমন রয়েছে, তেমনি কান্নাঘরও জরুরী।এ শহরে চিৎকার করে কাঁদার মতো কোনো জায়গা নেইশুধু এই কান্নাঘর আছে!মন খুলে কাঁদুন।’
রুমটা বেশ গোছানো।রুমে শুধু কান্নার যে ব্যবস্থা তাই না,প্রচন্ড কাঁদতে পারার মত কিছু মুভির সিডিও রেখে দেওয়া আছে।কাঁদার মতন ট্রাজেডি উপন্যাস আছে!আর আছে একটা ডায়েরী!আমি একটা চেয়ারে বসতেই কেমন অদ্ভুত বিষন্নতা অনুভব করলাম।নীলার জন্য,তার চলে যাবার পর দীর্ঘদিনের কান্না জমে আছে;জীবনে কিছুই করতে পারি নি-বলে কান্না জমে আছে!সবার সামনে নিজে একটা কথা বলবো-কে কী বলবে ভেবে কথা না বলতে পারার যন্ত্রনা-বুকের ভেতর আছে।হুট করে কান্না চলে এলো।কাঁদতে থাকলাম।জীবনের একেক স্মৃতি,নিজেকে নষ্ট করার গল্প-ভেবে ভেবে একটা পুরো রাত কাঁদলাম।কান্নাঘর-ঘরট­ার বিশেষত্ব ছিলো।যে যে কান্নাঘরে আসবে তার পেমেন্ট টাকায় হবে না।শুধু সারাটা রাত কাটাবার পর শেষরাতে নিজের কান্নার গল্পটা লিখে যেতে হবে!এটাই পেমেন্ট!এ ঘর শুধু খোলা হবে…রাত বারোটায়।থাকবে ভোর ছয়টা পর্যন্ত।কান্নাঘরে-ঢু­কেই চমকে গিয়েছিলাম প্রথমটায়।কি আশ্চর্য!এত্তো মানুষ আসে কান্না ঘরে?এ শহরে এতো মানুষ কাঁদার জায়গা খু্ঁজে পায় না।?এ শহর এতো দুঃখী মানু্ষ?
নীলার কথা ভাবতে ভাবতে রাতটা পার করে দিলাম!তারমাঝেই ডাইরিটা বের করে নিলাম!ডাইরির কভারে লিখা-“”দুঃখকে সুলভ মূল্যে বিক্রি করে,কান্নাঘরের বিল পরিশোধ করুন!নিজের গল্পটি লিখুন!’ ডায়েরির পাতায় পাতায় গল্প।বেশিরভাগই নাম পরিচয়হীন!অরিদ্রা-নাম­ের এক মেয়ে লিখেছে-
‘বরুণ,
কাল ভোরে আত্মহত্যা করবো;আপাতত এই ছাড়া আর কোনো উপায় নেই!তোমার প্রতারণার খবর শুনে এরচেয়ে ভালো কোনো উপায় আর এ মুহূর্তে আমার হাতে নেই!’
জাস্ট এতোটুকুই।
চোখ থমকে গেলো হঠাৎ।কি আশ্চর্য!তার চারটা পাতা পরেই আরেকটা চিঠি।বরুণের লিখা।
‘অরিদ্রা-
তোমার মৃত্যুর সংবাদ পেয়েছি।বুকের ভেতর তো পুঁড়াচ্ছে ভীষণ!তুমি কি জানো-সেদিন তোমাকে ছেঁড়ে চলে এসেছিলাম কেনো?কারণ আমি জানতাম-আমি তিনদিনের মধ্যেই মারা যাচ্ছি! আজ শেষ দিন!’
পরের পেইজে ইশিকা নামের একজন লিখেছে-
“”জীবনে কোথাও নিজের কথা বলতে পারিনি।নিজের স্বপ্ন ছিলো বড় হবার!অথচ মুখ ফুটে কিছু বললেই সবাই হোহো করে হেসে ওঠতো!কারণ আমার জন্ম থেকেই “”ঠোঁটকাটা”” রোগ ছিলো!’কথা বললে বড্ড বাজে দেখাতো।
চোখে ঘুম ঘুম ভাব এসেছে।কান্নার পর নিজেকে প্রচন্ড হালকা লাগছে। শরীরটা একটু ঘাম ছেড়েছে।এবার ডাইরিটা নিয়ে লিখলাম-
‘নীলা-
নিজের শব্দ আজ শেষ হয়ে গেছে বলে ধার করে লিখছি!কে যেন বলেছিলো-‘আমরা কখনোই ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসি না বোধহয়,আমরা ভালোবাসার মানুষটি আমাদের ভালোবাসে-এ ব্যাপারটাকে ভালোবাসি।’ তুমি কি আমাকে ভালোবাসতে?নাকি আমাকে করুণা করে ভালোবাসি বলে পাশে ছিলে?’

দূরে ফজরের আজান দিচ্ছে!রুমে আজানের শব্দ বাজছে। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!’-বলে শেষ হয়ে গেলো।আমি বের হয়ে গেলাম রুম থেকে।দরজায় লিখা-‘যদি মনে করেন,কাঁদলে নিজের ভেতর বড্ড শান্তি লাগে;নতুন করে বাঁচার ইচ্ছে জাগে-তবে আবার আসবেন!নয়তো নিজে মরুন;অন্যদের আসার এবং কাঁদার জায়গা দিন!এ শহরে আর কাঁদার জায়গা নেই।’
করিডরে হাঁটতে হাঁটতেই নীলার কথা মনে হলো।শুধুমাত্র টাকার জন্য ভুঁড়িওয়ালা মানুষটাকে বিয়ে করে নিশ্চয় সে সুখী হবে না!নিশ্চয়-সেও একদিন আসবে কান্নাঘরে!কেঁদে যাবে-চিৎকার করে!হাউমাউ করে!
এসে কি নীলা ভুল করেও পড়বে আমার এ চিঠি?সঙ্গে কি তার বাচ্চাকাচ্চা থাকবে?আমি হয়তো তখন ঠিক কোনো চাকরির খবর পত্রিকা কেঁটে,যত্ন করে আবেদন পত্র তৈরি করে পরের ইন্টার ভিউটার জন্য প্রস্তুত হবো।এ শহরে চাকরী আর কই?সত্যিকারের ভালোবাসাই আর কই?একটা জীবন না হয় অবহেলায় কাঁটিয়ে দিবো।