Kaniz Fatema Suhi

September 15, 2021 0 By JAR BOOK

কবি ও লেখক পরিচিতি

Kaniz Fatema Suhi

Student

Dhaka   

যুদ্ধই জীবন 

কানিজ ফাতেমা ছুহী 

১৯৩৯ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য দায়ী ব্যাক্তিটির  কথা আমরা অনেকেই জানি।

তিনি হলেন হিটলার।  হিটলারের তথাকথিত একটি বহুল জনপ্রিয় কথন ছিলো “” War is life “” । যার বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায়– “” যুদ্ধই জীবন””।

অনেকেই প্রথমে এমন কথা শুনে ভেবেই বসবেন,  যার মুখের বহুল প্রচলিত বুলি যুদ্ধই জীবন!  সে যুদ্ধ,  রক্ত,  খুন রাহাজানি ছাড়া আর কি বা বুঝবে৷ তাদের কথায় আমি একটু দ্বিমত পোশন করছি। যাদের  মত আমার মতের পক্ষে নয় তাদের জন্য আমি আমার মতের ব্যাখ্যা দিতে  বাধ্য৷ অর্থাৎ আমার মতে তিনি যা বলেছেন কথাটি খাঁটি সত্য কথা৷  যুদ্ধই আসলে জীবন৷ আমার এই স্বল্প পরিসরের মগজে খুব একটা বেশি কিছু ধরে না৷  তাই এখানে আমি হিটলারের ইতিহাস লিখবো না৷ 

তবে মতামত তুলে ধরার জন্য  কিছু কথা নিজের যতটুকু বোধগম্য হয়েছে তা সমান্য ব্যাখ্যা দেবো৷ 

আমার জানামতে হিটলারকে যখন কারাবন্দী করা হয় তখন তিনি শক্তি সঞ্চয় করে ফিরে আসেন।  প্রভাব খাটিয়ে যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে কোনো দেশের বিমানবন্দর, সমুদ্রবন্দর দখল করতেন৷  পোল্যান্ডের সাথে ১৯৩৩ সালে ১০ বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি করে মাত্র ছয় বছরের মাথায় বিশ্বাসঘাতকতা করে ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ডের বিমানবন্দর দখল করে। হিটলারের সমসাময়িক এমন আরও দুজন তথাকথিত ভালোমানুষ ( রুপক অর্থে) একত্র হয়েছিল। তারা হলেন জাপানের হিরোহিতো এবং ইতালির মুসোলীনি। যাকে ফ্যাসিবাদের জনক বলা হয়৷  কথায় আছে – ‘ দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’। এই অনুপ্রেরণাতেই বোধহয় তারা একজোট হয়েছিলেন এবং বিশ্বে তাদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন৷ 

যাই হোক৷ তখনকার সমাজিক জীবনব্যবস্থা কেমন ছিলো তা আমার জানা নেই৷  তবে আমি বর্তমানের কথা বলতে পারি৷ ফুলের মতো সুন্দর এই পৃথিবীতে অনেক মানুষ শোষণের শিকার।  

উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত প্রায় সর্বোস্তরের মানুষ। ক্রমে উচ্চবিত্ত থেকে সেটা আঁছড়ে পড়ছে মধ্যবিত্ত এবং  নিম্নবিত্তের সাধারণ মানুষের উপর। এই শোষণ নির্যাতনের সার্কেল ক্রমান্বয়ে হয়ে আসছে। তখনকার মতো এই প্রভাব এখনো আমাদের সমাজে বিরাজমান৷ যাই হোক আমার প্রসঙ্গ আরও সহজ কিছু নিয়ে৷   স্কুলের জীবনটা দিয়ে যেহেতু আমাদের পথ চলা শুরু  আমি প্রথমে এই প্রসঙ্গই তুলবো।  এই যে কাল একটু কম্পিউটারে কার্টুনের জগতে হারাতে গিয়েছি ওমনি আম্মু এসে মনে করিয়ে দিলো নতুন CGPA- 4 এর কথা৷ ক্লাস টেস্ট,  অর্ধ – বার্ষিক,  ফাইনাল মডেল টেস্ট,  বার্ষিক পরীক্ষা,  এছাড়াও হঠাৎ ক্লাসে এসে ম্যাম যখন বলেন,  “” এখনি  টেস্ট নেওয়া হবে। “” এমন বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো পরীক্ষা শেষ হয়ে ফলাফলের খাতায় নিজের চশমারই গোল গোল ফ্রেমের একই ছবি দেখে অবশেষে চোখ থেকে বৃষ্টি ঝরে পড়ে। সৃজনশীলের উত্তর যেখানে নিজারাই   বানিয়ে ফেলতে পারি ,  সেখানে অনেক শিক্ষার্থী জানেই না যে স্মৃতিসৌধ কোথায়?  অথবা CGPA এর পুরো অর্থ কী?  

এবার সংসারের কথায় আসা যাক৷ সকালে উঠে মায়ের নামায,  কুরআন শেষে সময়মতো বাচ্চাদের খাবার তৈরি,  ঘর গুছানো,  আমাদের স্কুলের জন্য রেডি করা,  ব্যাগ গুছানো  ইত্যাদি ইত্যাদি আরও কতো কি! তাদের কাজের লিস্ট লিখে শেষ হবে না৷ শুধু শুধু খাতার কাগজই নষ্ট হবে। আবার বাবারা সংসারের হাল ঠেলা,  বাইরে সমালানো, বাচ্চাদের স্কুলের পৌঁছানোসহ অনেক যুদ্ধ করে চলেন৷ সন্তানদের এবং ঘরের সকল প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি অফিসে চলে কলিগ, ক্লায়েন্ট এবং বসের কাছে ফাইল জমা দেওয়ার হার না মানা সব যুদ্ধ৷ 

এবার আাসা যাক অন্যান্য।  বিশ্ববিদ্যালয় পাশের পর চাকরি নামক মরিচীকার পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে হাতে সিভি নামক তলোয়ার এবং শার্ট, টাই পরে যোদ্ধা বেশে ইন্টারভিউ নামক যুদ্ধ ময়দানে যাওয়া। এসব লোকদের বিশাল একটা দল হেরে যায় মীর জাফর নামক বিশ্বাসঘাতকের বাঁ হাত ঢুকিয়ে নিজের পক্ষকে টেনে এনে চাকরি দিয়ে যুদ্ধে জিতিয়ে দেওয়ায়।

যারা ডাক্তারি পড়ছেন তারাও এমন যুদ্ধের বাইরে নন৷ ডাক্তারি পড়ে এমবিবিএস এবং ইন্টার্নি কমপ্লিট করতে না করতেই ডিউটি করা লাগে৷ আবার সিভিল ইন্জিনিয়ার হয়ে অন্যের স্বপ্নের সেই বাড়িকে বাস্তবে রুপ দেওয়ার যুদ্ধ ৷ শিক্ষকদের আছে ছাত্র ছাত্রীদের জ্ঞানের ক্ষুৎপিপাসাকে জাগ্রত করে তোলার যুদ্ধ ৷ নিজের বিপক্ষকে কথার মার পেঁচে ফেলে যুক্তি তর্কে হারানোর যুদ্ধ উকিল ব্যারিস্টারদের৷ রাজনীতিবীদরাও কম নন। তারাও এই যুদ্ধের শামিল৷ এমনকি নিম্ন আয়ের মানুষরাও এর থেকে রেহাই পায়নি৷  

এবার বলি অন্যরকম যুদ্ধের কথা৷  সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠার জন্য অতীব আরামদায়ক মজার স্বপ্নময় ঘুমকে ছেড়ে ওঠার যুদ্ধটা যে কি আমার মতো বয়সী কিংবা উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা সেটা শুধু হাড়ে হাড়ে না শিরায় শিরায় টের পায়৷  দাঁত ব্রাশ করতে গিয়ে জীবানুর বিরুদ্ধে লড়াই৷  সকালের নাস্তা করতে গিয়ে একখানা ছোট্ট রুটি গলধকরণ করতে মনে হয় পৃথিবীর সমান সাইজের রুটিটা পেটে ঢুকানোর জন্য  সে কি লাড়াই!তারপর তৈরী হয়ে কেউ ছোটে স্কুলে,  কলেজে কিংবা অফিস আদালতে৷ লোকাল বাস স্ট্যান্ডে দাড়িয়ে অফিস এর সময় কিংবা স্কুলের সময় বাসে উঠার যে কি যুদ্ধ তা একমাত্র যারাই উঠেন তারাই বোঝেন৷ কতটাব যুদ্ধ করে ঠেলে কীভাবে উঠেন এবং নিজে মনে মনে  মনকলা খেয়ে যাকে ঠেলে উঠেছেন তার গালমন্দ শুনে কোনোরকম নিজ গন্তব্যে পৌঁছানো।  সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম আর সাইক্লোন ঝড়ের শেষে রাতে যখন নিজের শরীরকে বিশ্রাম দেওয়ার পালা তখনি হাজারো টেনশন কোথা থেকে যেনো মাথায় ভনভন করে৷ সেই সব টেনশনকে মার ঝাড়ু, মার ঝাড়ু, মেরে ঝেটিয়ে বিদেয় কর বলে বলে ঘুম পাড়ানির মহা যুদ্ধ৷ জীবনের প্রতিমূহুর্তেই যখন যুদ্ধ তখন আর সাংর্ঘষিক যুদ্ধের কথা তুলে ধরার কিঞ্চিৎ মাত্র প্রয়োজন হয় না৷  নিজেদের জীবনের প্রত্যেকটি সময়কে একেকটি স্থির চিত্র দিয়ে দেখার চেষ্টা করুন।  আপনি আমি আমরা সকলেই জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে স্থবির হয়ে একেক বেশে যুদ্ধ করে যাচ্ছি।  বাংলার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তাদের বেশ কিছু কবিতা,  গ্রন্থে- “”জীবন সংগ্রাম “” কথাটি উল্লেখ করেছিলেন৷ হয়তো হিটলার কবি না হয়ে উগ্রবাদী হয়ে কথাটি বলে গিয়েছিলেন৷ 

এই জীবন বড়ই কণ্টকাকীর্ণ।  এখানে জেতা খুবই কষ্টের৷  কেউ যদি কখনো জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে স্থবির হয়ে পড়েন এবং ভাবেন, “” আল্লাহ যা করবেন সবকিছু ভালোই হবে। পরিশ্রম তো কম করিনি আজ পর্যন্ত  “” তাহলে মনে রাখা উচিত, যদি আমরা জীবনের সঠিক পথেই থাকি, কিন্তু কাজকর্ম না করে রাস্তার মাঝখানে বসে থাকি, গাড়ি চাপা পড়ে মৃত্যু নিশ্চিত। ! 

সুতরাং যুদ্ধ করলে আরও করতে হবে।  বৃদ্ধ হয়ে মরে যাওয়া পর্যম্ত৷  কেননা শেষ বয়সের যুদ্ধ থাকে ঈমানের সহিত মৃত্যু বরণ করার৷  ইনশাআল্লাহ আল্লাহ যেনো সবাইকে এই তৌফিক এনায়েত করেন।( আমিন)তাই আমাদেরকে সংগ্রাম করেই যেতে হবে৷  হাল ছাড়ে দেওয়াটা খুব সহজ কাজ, সবাই পারে৷  কিন্তু সবাই যখন ধরেই নিয়েছে আপনি হেরে গিয়েছেন,  তখনও হাল ছেড়ে না দিয়ে চেষ্টা করাটাই হচ্ছে আসল শক্তির পরিচয়।  সবশেষে এটাই আর বলার বাকি আছে। আপানারা সকলেই আশা করছি বুঝে গিয়েছেন যে ..    “” War is truly life “”