Dr. Satabdi Ghosh

September 15, 2021 28 By JAR BOOK

কবি ও লেখক পরিচিতি

Dr. Satabdi Ghosh

Doctor

Pabna, Bangladesh

ধরে থেকো হাতটা 

 

হঠাৎ করে মোবাইলের রিং টোন টা বেজে ওঠে। সুতপা একটু আনমনা ছিলো। মোবাইলে তাকিয়ে অপরিচিত নাম্বার দেখে প্রথমে সুতপা ধরতে চায়নি। পরে কি মনে করে ফোনটা ধরলো। অন্যপাশ থেকে একটা অপরিচিত কণ্ঠ বলছে, “একটু তাড়াতাড়ি হাসপাতালে চলে  আসুন”। কথাটা শুনেই সুতপা অস্থির হয়ে উঠে বলে, “কেনো কি হয়েছে”? ফোনের ওপাশ থেকে, “বৌদি, আমি সুনীলের বন্ধু রনি বলছি, সুনীলের সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে। আমি ঠিকানা লিখে আপনার মোবাইলে বার্তা পাঠিয়ে দিচ্ছি”। সুতপা ফোনটা রেখে বিছানার উপর বসে পরে ভাবে, আমাদের বিয়ে হলো পাঁচ মাস। সুনীল প্রথম যখন চাকরি পায়, তখনই আমার শ্বশুর ওকে মোটর সাইকেল কিনে দেয়। ও যেন অফিসে সময় মতো যেতে পারে। তাও আজ চার বছর হলো। এই চার বছর মোটর সাইকেল নিয়ে অফিসে যায়। আমার সাথে সুনীল যখন দেখা করতে আসতো, তখনও মোটর সাইকেল নিয়ে আসতো। আমরা দুইজন মোটর সাইকেলে কত জায়গায় ঘুরছি। কিন্তু কোনোদিন কোনো খারাপ কিছু হয়নি। তবে কি এই ঘটনার জন্য আমি দায়ী?  

সুতপা হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারের সামনে বসে আছে। সুতপার দিদি সুনন্দা পাশে বসে আছে। সুতপার নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। একের পর এক চিন্তাগুলো সামনে চলে আসছে। এই সময়ই সুনন্দা সুতপাকে জিজ্ঞেস করে, এই সুনীলের এরকম অ্যাকসিডেন্ট  কেনো হলো? তোদের সংসারে কি কোনো ঝামেলা চলছিলো? সুতপা একটু থেমে বলে, দিদি আমি আর পারছি না। এ কথা বলেই দিদিকে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে থাকে। 

সুনন্দাঃ আমাকে বলে একটু নিজেকে হাল্কা কর।   

আমিঃ দিদি, কালকে সুনীল আমাকে বলে, আমি নাকি সারাদিন মোবাইল নিয়ে থাকি, এইজন্য রান্নায় একটু লবণ বেশি হয়েছে। 

সুনন্দাঃ তাতে কি? একদিন এরকম হতেই পারে। 

আমিঃ জানো না, তুমি? আমার সব কাজে খুঁত করে। আমি বাসায় একা থাকি, মোবাইল তো দেখতে ইচ্ছে করেই আমার। এটা নিয়ে কথা শোনানোর কি আছে? আমি তো গত এক মাস ধরে ওর সাথে খুব দরকার ছাড়া কথা বলি না। আমাকে কথা শোনায়, তাই আমি ইচ্ছে করেই একটু ইগনোর করছিলাম। আমারো কি এসব করতে ভালো লাগে? তাই আমি এক সপ্তাহ আগেই বলে দিয়েছিলাম, আমি এই সংসারে থাকবো না, বাপের বাড়ি চলে যাবো।  

সুনন্দাঃ আরে দুইজন একটু একসাথে বসে কথা বলতে পারিস না? 

আমিঃ শোন দিদি, আমাদের তো ছয় বছরের সম্পর্ক। ও আমাকে কত কেয়ার (যত্ন) করতো, সব বিষয়ে। আমি ওর এই ব্যবহার দেখেই মুগ্ধ হতাম। আমি আইসক্রীম খেলে আমাকে নিষেধ করতো, বলতো ঠাণ্ডা লেগে যাবে। আমাকে রাত জাগতে মানা করতো। আমার তো সব কিছুই ওর ভালো লাগতো। আজ সংসারে করতে গিয়ে এত ভুল ধরবে কেনো? অফিস থেকে এসেই বলবে, ঘর এত এলোমেলো কেনো? বিছানায় কাপড় এভাবে ছড়িয়ে রাখছো কেনো? এই রান্নায় লবণ হয়নি? ওই রান্নায় ঝাল হয়নি? একেক দিন একেক কাজে। আরে, আমি কি বাপের বাড়ি কাজ করেছি? আর থাকি তো আমরা দুই জন। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি তো আর এখানে থাকে না। ঘর নোংরা থাকলে কি সমস্যা? এই নিয়ে ঝামেলা হইছে। এই এক কথা থেকে আরেক কথা। আর তুমি তো জানো, আমার কাজে কেউ ভুল ধরলে আমি তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেই। 

সুনন্দাঃ বাসায় একজন হেল্পিং হ্যান্ড (সাহায্যকারী) রাখলেই তো হয়ে যায়? 

আমিঃ দিদি, তুমি তো জানো, ওর যে বেতন। এখন কাউকে রাখা ওর পক্ষে সম্ভব না। এটা আমি বুঝি। তাই এই কথা আর বলি নাই। 

সুনন্দাঃ এতই যখন বুঝিস, কথা বলা বন্ধ না করে একটা সমাধান বের করতে পারতিস। 

আমিঃ  কি করে বের হবে? ওর সাথে তো আমি কথাই বলি না। 

সুনন্দাঃ এত রাগ করলে চলে বোকা? মেয়েদের একটু সহনশীল হতে হয়। সবেমাত্র তোদের বিয়ে হয়েছে। নিজেদের মধ্যে বোঝাপরা করার জন্য সময় তো লাগবে। এরকম হুটহাট সিদ্ধান্ত নিলে কি হয়, তুই বল? 

আমিঃ তুমি তো জানো, ছোটোবেলা থেকে তোমরা আমাকে কত আদর দিয়ে বড়ো করছো? কেউ আমাকে কথা শুনালে খুব রাগ হয়। তাই ইচ্ছে করেই ওর সাথে কথা বলি না। 

সুনন্দাঃ সুনীল আসলে তোকে ভালোবাসে। এজন্যই তোর বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার কথা শুনে নিশ্চয় বেশি কষ্ট পায়ছে। রনিও একই কথা বলছিলো, সুনীল নাকি আজকাল অফিসে চুপচাপ থাকে, কারো সাথে কথা বলে না আগের মতো।   

আমিঃ ও মনে হয় আমাকে কিছু বলতে চাচ্ছিলো, আমি কিছু শুনি নাই। এখন খারাপ লাগছে। 

সুনন্দাঃ কিছু কথা শুনতে হয়। সব সময় এত রাগ করলে চলে? 

আমিঃ তুমি বুঝবে না? আমার মাথা গরম হয়ে গেলে মেজাজ ঠিক রাখতে পারি না। আমরা তো দুইজন ভালোবেসেই বিয়ে করেছি। আর আমি তো রান্না শিখে আসে নি। পছন্দ না হলে নিজে রান্না করে খাবে। আমি কিছু শুনতে পারবো না।  

সুনন্দা, সুতপাকে একটু হাল্কা করার জন্য বলে, তোর মনে আছে, সুনীল তোকে একটা গোলাপ ফুল দেয়ার জন্য সারাদিন বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলো? 

আমিঃ মনে আবার থাকবে না? ঐ জন্যই তো ওর প্রেমে পরেছিলাম। সেদিন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিলো। আমাদের বাড়ির সামনে গোলাপ ফুল হাতে নিয়ে সারাদিন বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলো। আমাকে গোলাপ ফুল না দিয়ে ও যাবে না। পরে দুপুর গড়িয়ে যখন সন্ধ্যা হলো, দেখলাম ছেলেটা ভীষণ কাঁপছে। তখন তো আমি তোর কথাতেই গিয়ে গোলাপ ফুলটা নিলাম। এরপর ছয় বছরের প্রেম। আর মা-বাবা তো বিয়েতে রাজি ছিলো না। তারপর কতো ঝক্কি করে বিয়েটা করলাম। কি লাভ হলো বল?  

দিদি, আমার এখন সুনীলের জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে, ওর যদি কিছু হয়ে যায়? 

সুনন্দা হেসে বলে, কিরে পাগলী? তুই বলে বাপের বাড়ি চলে যাবি? তা এখন চিন্তা করছিস কেনো? 

আমিঃ বলেছি তো, কিন্তু আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারবো না। ওর অ্যাকসিডেন্টের কথা শোনার পর থেকে নিজেকে খুব অপরাধী লাগছে। আসলে এক মাস আমরা কেউ কারো সাথে ভালোমতো কথা বলি না। এখন মনটা খুব পুড়ছে, দিদি। ওর সাথে কথা বলা উচিত ছিলো? আমি মনে হয় বেশি বলে ফেলেছি?

 সুনন্দা তখন হো হো করে হেসে ওঠে।

দিদির হাসি দেখে সুতপার খুব রাগ হয়। বলে, আমার এই অবস্থা দেখে তুমি হাসছো? 

সুনন্দাঃ তো কাঁদবো নাকি? 

আমিঃ দিদি, সুনীল এখনো অপারেশন থিয়াটারে? আর তুমি হাসছো? 

সুনন্দাঃ সুনীলের কিছু হয়নি। ও ভালো আছে। 

আমিঃ মানে? 

সুনন্দাঃ মানেটা তাহলে তোকে বলেই ফেলি। তোর সাথে সুনীলের যে সম্পর্কের টানাপোড়ন চলছিলো, সুনীল আমাকে বলেছিলো। আমি, সুনীলকে অনেক বোঝাই। আমি সুনীলকে বলি, শোন, ও তো অনেক আদরের আমাদের সবার। আর ও বড় অভিমানী। ওর সাথে রাগ করো না। তুমি রেগে কোনো কথা বললে ও সেটা মানতে পারে না। সুনীল ওর ভুল বুঝতে পারছে। এটা তোকে অনেকবার বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু তুই তো ওর কোনো কথাই শুনিস না। তাই সুনীল যখন বলে, সুতপা মনে হয় আমাকে আর ভালোবাসে না? আমি তখন ভাবলাম, একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি? এগুলো সবই আমার প্ল্যান ছিলো।  

আমিঃ তাহলে কালকে আমার সাথে ওরকম করলো কেনো, এটা তোমাদের প্ল্যান ছিলো?  

সুনন্দাঃ হ্যাঁ, আমি সুনীলকে বললাম, সুতপা যখন তোমার সাথে কথা বলছে না, তখন ওকে এমন কিছু বলো যাতে কথা বলে। তুই নিজে সুনীলকে কতখানি ভালোবাসিস, এবার তো বুঝতে পারছিস। 

আমি সুনীলকে গিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরি। সুনীল গলার স্বর নিচু করে বলে, এখন ছাড়ো, মানুষজন কি বলবে?

আমিঃ যা বলবে, বলুক। আমি আমার জামাইকে জড়িয়ে ধরে আছি। 

সুনীলঃ আমাকে ছেড়ে আর যাওয়ার কথা বলবে? 

আমিঃ না, এ জনমে না। 

সুনীলঃ যদি বলো, এরপর কিন্তু আমি সত্যি সত্যি হারিয়ে যাবো। চাইলেও আর আমাকে পাবে না। 

আমি ওর মুখ চেপে ধরি। একদম এধরণের কথা বলবে না। আমি তোমার আগে যেতে চাই। আর তোমরা সবাই মিলে আমার সাথে যে নাটকটা করলে? আমার তো এমনিতেই দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো। 

সুনীলঃ আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও। তোমার আর কোন ভুল ধরবো না। এখন থেকে বাসার সব কাজ যতটুকু পারি, আমি করে দিবো। আর আমার সামনের মাসে প্রমোশন হওয়ার কথা আছে। হলেই বাসায় তোমার জন্য একজন সাহায্যকারী রেখে দিবো। আর অভিমান করে থেকো না প্লিজ। তুমি যখন থেকে বলেছো, আমাকে ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যাবে। আমার তো এতো খারাপ লাগছিলো। তুমি আমার সাথে ঠিকমতো কথাও বলো না। তোমাকে ছাড়া আমি নিজেকে কল্পনাই করতে পারি না। সারাদিন অফিস করে বাসায় এসে তোমার সাথে আমি প্রাণ খুলে দুই দণ্ড কথাও বলতে পারছিলাম না। নিজের ভিতরে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। এই আমি কান ধরলাম, আর আমি কিছু বলবো না। 

আমিঃ থাক, আর কান ধরতে হবে না। কথাটা মনে রাখলেই হবে। 

এতক্ষন দূরে দাঁড়িয়ে সুনন্দাদিদি আর রনি সব দেখছিলো। এই সময় ওরাও এগিয়ে এসে বলে, আর আমাদেরকেও যেন আর মিথ্যে বলতে না হয়। রনি বলে, কত কষ্ট করে আমাকে এখানকার একজন নার্স, ওয়ার্ড বয়কে রাজি করাতে হইছে। যে রোগীর অপারেশন হচ্ছিলো, তাদের আত্মীয়দের কত অনুরোধ করে বলেছি, আপনারা একটু ভিতরে বসেন। আমার দাদা অসুস্থ, বৌদি এখানে একটু বসবে। রোগীর লোক কি রাজি হয়? আমি যে কি ভয়ে ছিলাম? সুনন্দাদি বলেছিলো, সব দেখে নিবে। তাই তো একটু সাহস পেয়েছিলাম। নইলে আজকে আমাকে গনপিটুনির হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারতো না? 

আমিঃ বন্ধুর জন্য একটু না হয় মার খেতেন। 

রনিঃ কি!

আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠি।

এরপর বাসায় গিয়ে পরে জানতে পারি, আমি প্রেগন্যান্ট। বাবা হবার খবর শুনে সুনীল খুবই খুশি হয়। এখন আমার অনেক যত্ন নেয় সুনীল। রান্নাটাও রাতে সুনীল ই করে রাখে। এখন আর আমার একা লাগে না। সারাদিন বাচ্চার কথা চিন্তা করি। বাচ্চাদের ছবি দেখি, প্রতিদিন বাচ্চার নতুন নতুন নাম ঠিক করি। সুনীল অফিস থেকে আসার পর রাতের বেলা দুইজন আবার সেই নাম নিয়ে বসি। কে কোন নাম রাখবো? এই নাম নিয়ে দুইজনের মধ্যে ঝগড়া লাগতে লাগতে আবার লাগে না। কারণ সুনীল কথা দিয়েছে, আমাকে আর বকা দিবে না। তাই সুনীল এখন চুপ করেই থাকে, এখন আমি একা ই বলতে থাকি।

এর ভিতরেও সুনীল আমার হাতটা শক্ত করে ধরে থাকে। আমি তো এই হাতের স্পর্শের জন্যই বেঁচে আছি। বললাম, এ হাত তুমি কখনো ছাড়বে না। সারাজীবন যেন এভাবেই আমরা দুইজন দুইজনের হাত টা ধরে থাকি।  

সমাপ্ত

ডাঃ শতাব্দী ঘোষ

পাবনা, বাংলাদেশ

গল্প পড়ে অবশ্যই বলবেন, কেমন লাগলো?? আপনাদের মন্তব্য আমাকে লিখতে অনুপ্রেরণা দেয়।”