Ayesha Siddiki

September 15, 2021 0 By JAR BOOK

কবি ও লেখক পরিচিতি

Ayesha Siddiki

Student

Saidpur, Nilphamari

অবরূদ্ধ (বন্দী) স্বপ্ন 

 

 স্বপ্ন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে নয়, দেখতে হবে চোখ খুলে,

                 সেই স্বপ্ন পূরনে‌র ইচ্ছা,রাখতে হবে সকলকে তার হৃদয় মন্দিরে।

 

আকাশ ভরা তাঁরা । রাতের আঁধারে ছাদে বসে একমনা হয়ে সামিয়া বেগম কি যেন ভাবছেন ।এমন সময় নিচে থেকে  আশু  ডাকছে -মা ,ও মা, শুনছো, খিদে পেয়েছে তো,তাড়াতাড়ি খাবার দাও। মা মা করতে আয়েশা সিঁড়ি বেয়ে ছাদে এলো।ও মা  কিছু বলছো না যে । হাতের স্পর্শে এবার সামিয়া বেগমের হুশ ফিরল। আদরের রাজকন্যাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মিস সামিয়া। আয়শা কিছু বুঝতে না পেরে তার মাকে জিজ্ঞেস করলো ও মা কি হয়েছে তোমার ? অসুস্থ নাকি ? কেউ কিছু বলেছে তোমাকে ? বাবাকে ডাকবো ? এরকম আরো কতোই না প্রশ্ন বিরতিহীন  মাকে জিজ্ঞেস করছে। আসলে মেয়েটা তার মাকে ভীষণ ভালোবাসে । মায়ের  অল্প কিছু হলেই সে অস্থির হয়ে পড়ে। এতক্ষনে মা তার কপালে হাত বুলিয়ে বলছে , আশু তুই ভালোভাবে পড়াশোনা করে‌ জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবি তো ? আয়শা বিরক্তিকর ভাবে বলল কি মা তুমি সবসময় শুধু পড়তেই বলো কেন? আমাকে পড়তে ভালো লাগে না। তখন মিসেস সামিয়া মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলছেন , শিক্ষা ছাড়া যে কেউ কোনোদিন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। একটা মানুষের আসল শিক্ষা তার কথায়, কর্মে ও জীবনের লক্ষ্যে প্রকাশ পায় । পড়াশোনা তোকে সমাজে নিজস্ব একটি পরিচয় গড়তে সাহায্য করবে । তোকে নিয়েই তো আমার সব স্বপ্ন । হত্যা কেবলমাত্র শরীরের হয় না, কারো স্বপ্নকে যখন ছিনিয়ে সমাজ ও পরিবারের নোংরা প্রথার বেড়াজালে বন্দী করা হয় তখন হত্যা হয় সেই স্বপ্নের। আমি আমার স্বপ্নকে নিজ চোখে হত্যা হতে দেখেছি, তবে তোর স্বপ্নের হত্যা  কোনোভাবেই হতে দিব না।শুধু তুই মন দিয়ে পড়াশোনা কর। আচ্ছা মা তোমার স্বপ্ন কি ছিল ? আমার স্বপ্ন ; পড়ালেখা ! হ্যা, পড়ালেখাই ছিল আমার স্বপ্ন । আমি অনেক পড়তে চেয়েছিলাম। জীবনে নিজের একটি পরিচয়  বানাতে চেয়েছিলাম ।নিজ থেকে গিয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম। কি রোদ , কি বৃষ্টি কোনোদিনই স্কুল ফাঁকি দিতাম না।পড়ায়  বেশ মনোযোগী ছিলাম।নিজস্ব বই‌ এর পাশাপাশিও আমি স্যার -ম্যাডামদের থেকে নিয়ে বিভিন্ন বই পড়তাম। একবার আমাদের স্কুল কর্তৃক আয়োজিত একটি ইংরেজি বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিলাম এবং পুরস্কার স্বরূপ হুমায়ুন আহমেদ স্যারের একটি বই পেয়েছিলাম। কতোই না  খুশি হয়েছিলাম সেদিন । এখনো বইটি আমি সযত্নে তুলে রেখেছি আলমারিতে।আচ্ছা মা , তোমার যদি এতোই ভালো লাগতো পড়ালেখা, তাহলে পড়ালেখা ছেড়ে দিলে কেন? আর কেন‌ই বা তুমি নিজস্ব স্বপ্ন পূরণ করতে পারলে না ? আমার বিয়ে রে মা ! তথাকথিত সমাজের কিছু কুসংস্কার। আমাদের সময় মেয়ে পুতুলের ঘর সাজানো ছেড়ে, নিজেদের ঘর গোছানো শিখতে পারলেই তার মাথায় ঘোমটা দেয়ায় পরিবারের সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মেয়ে মানুষ এতো পড়ে কী হবে ? বেশি পড়াশোনা করে‌ জীবনে কি করতে পারবে? শেষমেষ তো তাকে স্বামীকে রান্না করেই খাওয়াতে হবে । এরকম আর কতোই না অপসংস্কৃতিতে বিশ্বাসী ছিল আমাদের সমাজ, আমাদের পরিবার। আমার স্বপ্নও অবরূদ্ধ হয়ে দাড়ালো পরিবার ও সমাজের কাছে । যখন আমার এস.এস.সি  পরীক্ষা তখন তোর বাবারা আমাকে দেখতে আসবে বলে পরীক্ষাও দিতে দেয় নি । আমি মা কে অনেক মিনতি করেছিলাম, আমাকে পরীক্ষা দিতে দাও মা। উত্তরে বলেছিলেন,এখন আর পড়ালেখা করে কি হবে ? বিয়ে হচ্ছে; ওটাই তোর সংসার । শশুর-শাশুড়ির সেবা যত্ন করা, স্বামীকে সুখী করাই তোর এখন দায়িত্ব। আমাদের সম্মান তোর হাতেই , নিজের বাবার  মাথা নোয়াবার কাজ কোনোদিন করিস না মা। মায়ের এসব কথা শুনে আমার সব স্বপ্ন যেন নিমিষেই মেঘ হয়ে আকাশে ঠাঁই নিলো,যাকে আমি দেখতে পারি ,অনুভব করতে পারি তবে কোনোদিন ছুঁতে পারবো না। আমি তবুও চেষ্টা করছি বাবা, বড় ভাই, বড় আপা সবাইকে বলছি যে আমাকে পড়তে দাও। আমার পড়ালেখা বন্ধ করিও না কিন্তু কেউ আমার কোনো কথায় কর্ণপাত করলো না। এবং আমার সব স্বপ্নকে একে একে পরিবার ও সমাজের  কারাগারে বন্দী করা হলো। আর আমাকে অসহায়ের মতো বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হলো।  স্বপ্নের হত্যার পর অবশ্য একবার শরীরকেও রক্তে বিলীন করতে চেয়েছিলাম, তবে বাবা-মায়ের সেই হাসি-খুশি চেহারাটি চোখের সামনে ভেসে উঠতে আর সাহস হয় নি । বিয়ের পর সাহস করে তোর  বাবাকেও বলেছিলাম কিন্তু তোর দাদী বললেন বিয়ের পর পড়া ওসব কি ? এত ঠং করলে নিজের বাসায় গিয়ে করো ,এখানে থাকতে হলে এখানকার হিসেবে চলতে হবে ।আমি আবারো নিজ স্বপ্নকে হত্যা হতে দেখলাম আমার নতুন সংসারের গন্ডিতে। এবার আয়েশা মায়ের চোখের জল মুছে বললো – মা আমি তোমার অবরুদ্ধ স্বপ্নকে নিজের জীবনের লক্ষ্যের মাধ্যমে আকাশে মেঘ নয়,চাঁদের মতো প্রজ্বল্লিত করবো।  তোমার অবরুদ্ধ স্বপ্নও সফলতার ঠাঁই পাবে মা।