Afsana Jahan Ritu

September 16, 2021 0 By JAR BOOK

কবি ও লেখক পরিচিতি

Afsana Jahan Ritu

Student 

Kishoreganj Sadar

সমাজ কি বাঁচতে দেয়?

আফসানা রিতু

চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার।সকাল হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে নাসিমা।ভয়ে জবুথবু হয়ে বসে আছে।ঠিক তার পায়ের কয়েক সেন্টিমিটার ব্যবধানে রক্তের সমাহার।রক্তের নালা বেয়ে চোখ যেতে যেতে দেখা যাবে একটা নিথর দেহ।নাসিমার হাতের কাছের বিশাল বটিটা আর ঘরের আসবাবপত্রের এলোমেলো হওয়ার ধরন দেখলেই বুঝা যাবে কিছুক্ষণ আগে কি ঘটে গেছে এই ছোট্ট কুটিরে।
চারপাশের নিরবতা কেটে যাচ্ছে,অন্ধকার ফুটে আলো বেড়িয়ে আসছে,পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যাচ্ছে।অল্প কিছুক্ষণ পরেই রহিম মিয়ার বউয়ের গলা শোনা গেল।ছাগলগুলোকে হাঁকাচ্ছে মজলু মিয়া।অন্যদিন এই সময় নাসিমা ঘুম থেকে যায়,রোয়াকে বসে কয়লা দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে সবাইকে দেখে।হাসু মিয়ার মোরগের ডাকের গুনগান করে,ছাগলগুলোর গতরের খোঁজখবর নেয়,ফালানির মার নেশাখোর স্বামীকে নিয়ে দু-চার গালিও পাড়ে।আজ কোনো সারা শব্দ নেই।ফালানির মা ঘরের দরজাটা ধাক্কা দিয়েই এক লাফে ভিতরে ঢুকে গেল।রক্তমাখা লাশের চেয়ে জবুথবু হয়ে বসে থাকা নাসিমার নিষ্প্রাণ চেহারাই যেন তাকে বেশি চমকে দিলো।ফালানির মা’র চিকন গলা প্রশংসা করার মত।এক চিল্লানিতে পুরো এলাকা নাসিমার উঠোনে নিয়ে চলে এলো।পুলিশ আসতেও খুব বেশি সময় নিলো না।দুটো মহিলা পুলিশ নাসিমাকে টেনে বাইরে নিয়ে এলো।

এলাকার মানুষ ভয়ংকরভাবে তার দিকে দৃষ্টিপাত করছে।বিধবা নাসিমার ঘরে পরপুরুষ ঢুকে।ছি ছি ছি!নিঃসন্দেহে দুশ্চরিত্রা!তার উপর খুন!এ যেন গরম ভাতের উপর ঘি!কানাঘুষা করার মোক্ষম সুযোগ।মানুষ তো সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে এক চুলও ছাড় দেয় না।সবাই বলতে লাগল-“”পুলাডারে মাইরা ফালাইলো।কেমনে পারলো মারতে!একটুও কইলজা কাঁইপ্পা উঠল না।অন্যের মায়ের বুক খালি কইরা কি শান্তি পাইলি রে হারামজাদী!!””
পরিচিত মানুষগুলার অপরিচিত রূপ দেখে নাসিমা অবাক হয় না।চোখ মেলে শুধু সবার মুখের ভঙ্গি খেয়াল করে সে।মাঝে মাঝে তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসির রেখা ফুটে উঠে।গতরাতের কথা মনে হলে সে এখন আর শিউরে উঠে না।একটা ভদ্র সমাজের বসবাসরত পশু (অন্যদের চোখে মানুষ) তার শরীরটাকে খুঁটেখুঁটে খেতে এসেছিল।কিন্তু পারে নি।ভাবতে বড় ভালো লাগে নাসিমার।আবার হাসি ফুটে উঠে তার ঠোঁটের কোণে।
নাসিমা শান্ত হয়ে শুনে সবার কথা।ফালানির মা মুখ থেকে এক দলা থুথু ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলতে লাগল-“”মাইরা ফালাইলো গো পুলাডারে মাইরা ফালাইলো।””
গ্রামের মেম্বার মিয়ার গলা শুনা গেল-“”আহারে পুলাডারে মাইরা ফালাইলো।””

মহিলা পুলিশ দুইজন নাসিমার কোমরে,হাতে দড়ি বাঁধল।এই অবস্থায় এলাকার সবার সামনে দিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হবে।চলে যাওয়ার সময় নাসিমা বলল-“”আফনেরা ভুল কইলেন।পুলাডারে মাইরা ফালাইসে না কইয়া যদি কইতেন-মাইয়াডা বাঁইচ্চা গেল তাইলে বেশি ভালা শুনাইতো।আমি শুধু নিজেরে বাঁচাইসি।””
তার কথা কেউ শুনল,কেউ শুনল না।যারা শুনল তাদের মুখের ভঙ্গির পরিবর্তন হলো না।কি কারণে মারল তাতে তাদের কিছু যায় আসে না।মানুষকে মারা গুরুতর পাপ-এটা তারা ভালো করেই জানে।তাদেরকে দুটো আবেগী কথা বলে গলাতে পারবে না নাসিমার মত গণ্ডমূর্খ কোনো নারী।

নাসিমা আবারও সবার মুখের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলো।সেই হাসি সহজে বিলিন হলো না।”