Afruja Sharmin

September 16, 2021 0 By JAR BOOK

কবি ও লেখক পরিচিতি

Afruja Sharmin

চাকুরী

বাড়ী নং-৩১২/১,শহীদ বরকত স্মরণী, চান্দনা,গাজীপুর।

হে মুসাফির

 

মিলি শারমিন


জীবনের অপর পাড়ে দাঁড়িয়ে

পেছন ফিরে 

তাকিয়ে দেখি

কী অপরূপ সুন্দর এক জীবন পেয়েছিলাম…

কী অপরূপ!

মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকি অপলক

অ.পলক


সে ছিল আনন্দ-বেদনার এক মধুর কাব্য

পরতে পরতে রহস্য

অপার সৌন্দর্য তার পরতে পরতে…


ভালোবাসা নামক 

এক অসম্ভব সুন্দর…

স্নেহ মমতায় সিক্ত

এক অপূর্ব দোলাচল…


হ.ঠাৎ

হঠাৎ ঘোর কাটে

আফসোস!

বড়ই আফসোস!

এত চমৎকার একটা জীবন পেয়েছিলাম

কিন্তু পাইনি 

সহজাত বিচার বুদ্ধি প্রয়োগের ক্ষমতা


চোখ দিয়েছিলে

কিন্তু

ছিলাম অন্ধ


কান দিয়েছিলে

কিন্তু

ছিলাম বধির


মন দিয়েছিলে

কিন্তু

রুদ্ধ করে রেখেছিলাম 

সত্যের দরজা-জানালা

রুদ্ধ রেখেছিলাম ন্যায়ের পথ

খুলে দিয়েছিলাম অন্যায় ও অসত্যের পথ…


জীবন সায়াহ্নে…

 

জীবন সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে 

জীবনের কাছে

তুমি কী পেলে 

হে ক্ষণিকের মুসাফির!

 

জীবন সায়াহ্নে জীবনকে

তুমি কী দিলে 

হে মুসাফির!


একটা সবুজ  বাংলাদেশ চাই


খুব ভোরে আদিয়াত এর ঘুম ভাঙ্গলো সুমধুর আজানের শব্দে…


চারিদিকে সু.ন.সা.ন নীরবতা। গতকাল গভীর রাতে আদি ও ওর বন্ধু শুদ্ধ আদির নানাবাড়ী বেড়াতে এসেছে। রাজ্যের ক্লান্তি এসে ভর করেছে শরীরে, উঠতে ইচ্ছে করছিল না  আদির-কিন্তু “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম” এসে যখন কানে বাজলো আদির মনে হলো তা কর্ণকুহর হয়ে অন্তরের গহীনে স্পর্শ করলো…নাহ এরপর আর শুয়ে থাকা যায়না।আদি বরাবরই খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে এবং প্রতিদিনই আজানের শব্দে তার ঘুম ভাঙ্গে আজানের শব্দে,কিন্তু ঢাকা শহরের আজান আর আজ এখানে যে আজান শুনলো তার মাঝে বিস্তর ফারাক।মনে হচ্ছিল যেন পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে আছে, সময় যেন এখানে থমকে গিয়েছে-এমনই নীরব প্রকৃতির মধ্য থেকে আজানের এই সুমধুর সুর যেন আলোকের ঝর্ণাধারার মতো তার অন্তরটা ধুয়ে মুছে সাফ করে দিয়ে গেল।


“আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম”অর্থাৎ ঘুম অপেক্ষা নামাজ উত্তম-এ আয়াত কানে যাওয়ার পরও যে ঘুমিয়ে থাকলো সে আসলে এ দুনিয়াকেই ভালোবাসলো আর যে নিদ্রা ত্যাগ করে নামাজকে ভালোবাসলো সে আল্লাহকেই ভালোবাসলো।আদি ভাবলো যখন মোবাইলে রিংটোন বাজে আমরা বুঝতে পারি কেউ একজন আমাকে ডাকছে আমরা খুব দ্রুতই হাতের কাজ ফেলে সাড়া দিতে চেষ্টা করি অথচ যখন আজানের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানুতায়ালা আমাদের ৫ ওয়াক্তে নামাজের জন্য আহবান করেন আমরা ক’জন সে আহবানে সাড়া দিতে, পুরোপুরি স্রষ্টায় সমর্পিত হতে পারি।

নামাজ ও ক্বোরআন তেলাওয়াত সেরে এককাপ চা হাতে যখন বারান্দায় এসে দাঁড়ালো তখন সবে আলো ফুটতে শুরু করেছে, চারিদিকে আলোআধারির কেমন যেন এক রহস্যময়তা…. রহস্যময় মনে হচ্ছিল প্রকৃতিকে,পাখির কূজন,ভোরের ঠান্ডা হাওয়া, নাম না জানা ফুলের বুনো গন্ধ, সবকিছু-সবকিছু মিলিয়ে আদির কেন জানি হঠাৎ মনে হলো…


এমন একটি ভোর দেখবে বলে..

এমন একটি ভোর দেখার আজন্ম তৃষ্ণা বুঝি ছিল 

বুকের গহীনে..

এত সুন্দর আমার দেশ

এত অপরুপ 

এখানে না এলে তা অজানাই রয়ে যেত 

চিরটাকাল…


সমস্ত ক্লান্তি একনিমিষেই কোথাও যেন উধাও হয়ে গেল। চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়েই আহা মনটা জুড়িয়ে গেল….শহরের নামী-দামী কফিশপের কফি,চা এর সঙ্গেই তুলনাই হয়না এই গুড়ের চা-এর। চমৎকার.. চমৎকার

বারান্দা ছেড়ে উঠোনে পা রাখতেই ছোটমামা এগিয়ে এলেন হাসিমুখে বললেন- কি ব্যাপার শহুরে ব্যাটার ঘুম ভাঙ্গলো এত সকালে। 

ভালো… খুব ভালো

আদির মনে পড়লো যখন নানা বেঁচে ছিলেন খুব সকালে ফজরের নামাজ সেরে বিছানার কাছে এসে বলতেন উঠো নানুভাই-


ভোরের হাওয়া লাখ টাকার দাওয়া

আরো বলতেন 

আহার, নিদ্রা, ভয়-যত করে তত হয়


আদির খুব মন খারাপ হয়ে গেল।মনে হতে লাগলো কি যেন নেই..কে যেন নেই..হঠাৎ এক বিশাল শুন্যতা এসে গ্রাস করলো তাকে।

প্রিয় মানুষগুলো এভাবে হারিয়ে যায় কেন?

জীবন এত ছোট কেন?

কেন ভালবাসার মানুষগুলোর মায়াময় স্পর্শ, মমতামাখা মুখগুলো এত দ্রুত, এতটা তাড়াতাড়ি  হারিয়ে যায় জীবন থেকে।

আরও কিছুটা সুন্দর সময় কী একসঙ্গে কাটানো যেতো না…


মামা বোধহয় ব্যাপারটি আঁচ করতে পারলেন, বললেন 

কিরে আদি মন খারাপ।

চল ঘরে চল তোর মামী তোর প্রিয় দুধ-চিতুই বানিয়েছে, চল খাবি।

আদি ঘরে এসে শুদ্ধকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দুজনে ভরপেট নাস্তা করে বের হল গ্রাম দেখতে। 


আদি ও শুদ্ধ ক্লাস ওয়ান থেকে একইসঙ্গে পড়াশোনা করেছে।স্কুলশেষে একই কলেজ আর এখন  ঢ়াকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। শুদ্ধ  প্রাণীবিদ্যা আর আদিয়াত উদ্ভিদবিজ্ঞানে। প্রায় এক যুগ পরে আদি এসেছে গ্রামে আগে প্রতিবছরই অন্ত:ত একবার হলেও নানাবাড়ী আসা হতো, নানা-নানু মারা যাওয়ার পর আর সেভাবে আসা হয়ে উঠেনা।নাড়ীর টানটাই যে হারিয়ে গিয়েছে।প্রচন্ড আদর করতো নানু তাকে,অবশ্য পৃথিবীর প্রতিটি নানু-নানী,দাদা-দাদীরাই বোধহয় একই রকম,তাদের নাতি-পুতিকে খুব ভালোবাসে।

অনেকদিন থেকেই ছোটমামা বলছিল বাড়ী এসে বেড়িয়ে যাওয়ার জন্য, ছোটমামা সবুজছায়া স্কুলের হেডমাস্টার।

দুবন্ধু গ্রামের আঁকাবাঁকা মেঠো পথ ধরে হাঁটছিল।আদির গ্রামটা বাংলাদেশের সচরাচর গ্রামের চেয়ে একটু অন্যরকম, প্রচুর গাছপালা..বোঝা যায় গ্রামের মানুষ গাছ খুবই ভালবাসে, রাস্তার দু’ধারে নাম জানা এবং অজানা কিছু গাছ এলোমেলোভাবে লাগানো, কৃষ্ণচুড়া,পলাশ,শিমুল,জারুল ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা প্রকৃতি, বসন্তের চমৎকার উথালপাতাল হাওয়া, বাতাসে ফুলের গন্ধ মিলেমিশে কেমন যেন অদ্ভূত মাদকতা..চমৎকার এক ভালোলাগার আবেশ..

আদিয়াত ভরা গলায় আবৃত্তি শুরু করলো

নিখিলের এত শোভা, এত রুপ এত হাসি-গান

ছাড়িয়া মরিতে মোর কভু নাহি চাহে মনপ্রাণ..


আর শুদ্ধ গলা ছেড়ে গেয়ে উঠলো 

আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন

আমি বাংলায় বাঁধি সুর 

আমি এই বাংলার মায়াভরা পথে হেঁটেছি এতটা দূর..

বাংলা আমার তৃষার জল, দৃপ্ত শেষ চুমুক

আমি একবার দেখি বার বার দেখি দে.খি বাং.লার মুখ


এভাবে উদ্দেশ্যবিহীন ভাবে হাঁটতে হাঁটতে তারা খেয়াল করলো রাস্তাটা এখানে দুটো ভাগ হয়ে গিয়েছে যে রাস্তাটি বা দিকে গিয়েছে সেটি আগের রাস্তার মতোই খানিকটা আর যে রাস্তাটি ডান দিকে গিয়েছে সে রাস্তাটি অন্যসব রাস্তার চেয়ে একটু অন্যরকম..যতদূর চোখ পড়ে শুধু সবুজ আর সবুজ,এত ভালো লাগছিল মনে হচ্ছিল যেন সবুজের ভেতর ডুবে আছে বাংলাদেশ আমার..এই রাস্তার দু’পাশেও সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে প্রচুর গাছ তবে পার্থক্য হচ্ছে গাছগুলো এলোমেলোভাবে লাগানো হয়নি মনে হচ্ছে যেন কোন নিপুণ কারিগর অত্যন্ত যত্ন সহকারে সারিবদ্ধভাবে নির্দিষ্ট দূরত্বে গাছগুলো লাগিয়েছে এবং দু’টি কাঠ গাছের মাঝখানে একটি করে ফুল অথবা বিভিন্ন ঔষধি গাছ লাগানো, এত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন যেন পটে আঁকা ছবি। কিছুটা বিস্ময় এবং গভীর আগ্রহ নিয়ে তারা ঐ রাস্তায় প্রবেশ করলো, রাস্তার শুরুতেই একটি সাইনবোর্ড লাগানো

”এই সেই পথ…এবং তোমার একার

অন্যেরা হয়তো তোমার সঙ্গে হাঁটবে কিন্তু কেউই তোমার জন্য হাঁটবে না…


নিঝুমনিঝুম গ্রামে আপনাদের স্বাগতম।

অনেকটা সন্মোহিতের মতো এগিয়ে চললো তারা কয়েক কদম যাওয়ার পর খেয়াল করলো যে, প্রতিটি গাছের সঙ্গে গাছের নাম, বৈজ্ঞানিক নাম, গাছের সংক্ষিপ্ত পরিচয়, গাছের বয়স (কবে রোপণ করা হয়েছিল) ও এর উপকারিতা লিপিবদ্ধ আছে এবং প্রতিটি গাছের নামফলকের সঙ্গেই একটি করে চমৎকার বাণী রয়েছে।বিস্ময় তাদের চরমে পেঁছালো এই অজপাড়াগাঁয়ে মানুষের পরম বন্ধু গাছের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য এত ভিন্নধর্মী ও চমৎকার আয়োজন-এটা তো ঢাকাতেও কল্পনা করা যায়না।

কে এই মহাপুরুষ?

কিছুদূর হাঁটার পর তারা একটি বিশাল বটগাছের নীচে এসে দাঁড়ালো..এত বিশাল যে প্রখর সূর্যালোকেও কেউ যদি এর নীচে এসে দাঁড়ায় এর সুশীতল ছায়ায় হদয় জুড়িয়ে যাবে..এর গায়ে লিপিবদ্ধ বাণীটিও চমৎকার-

”নিজেকে বিনয়ী বানাও তাহলে তুমি পৃথিবীর চেয়েও বড় হতে পারবে”


বটগাছের পরপরই বিশাল নিমবাগান।আসলে নিমগাছের উপকারিতা বলে তো শেষ করা যাবেনা-নিমগাছের গায়ে লিখা আছে

নামঃ নিম

বৈজ্ঞানিক নামঃAzadirachta indica

রোপণকালঃ ২৬ মার্চ,১৯৭১

ব্যবহারঃনিম গাছ প্রচুর অক্সিজেন দেয়। যে কারণে আগে যখন অক্সিজেন মাস্ক ছিলো না, তখন মুমূর্ষু রোগীদেরকে নিম গাছতলায় শুইয়ে রাখা হতো। শুধু অক্সিজেন না, নিম পাতা, নিমের বাকল ওষধি গুণসম্পন্ন। নিম পাতা শাক হিসেবে বা এমনি পাতা চিবিয়ে বা বেটে নিমের বড়ি বানিয়ে খেলে পেটের অনেক রোগবালাই থেকে মুক্ত থাকা যায়। নিমের ডাল দিয়ে অনেকে মেছওয়াক করেন, এতে দাঁত ও মাড়ি জীবাণুমুক্ত থাকে। বসন্ত বা পক্সের রোগীদের শরীরে যে চুলকানি তা কমে নিমপাতা সেদ্ধ পানি দিয়ে গোসল করালে। এমনকি নিমের ডাল দিয়ে বাতাস করলেও বেশ আরাম পাওয়া যায়। আমরা পোকামাকড়ের জন্যে ন্যাপথলিন যখন কাপড়ের ভাঁজে রাখি, তাতে কাপড়ের রং নষ্ট হয়। আর শুকনো নিম পাতা রাখলে পোকাও আসে না, কাপড়ের রংও নষ্ট হয় না। অনেক সময় ড্রামে রাখা চালে কিরা বা অন্য পোকা ধরে। সেক্ষেত্রেও নিম পাতা খুব কার্যকরী একটি জিনিস। কারণ বলা হয় যে, পোকামাকড়ের যম হচ্ছে নিমপাতা। এটি নিঃসন্দেহে আল্লাহর অপার রহমত।

অশ্বথ গাছের বাণী-

জীবনে যত পার কাজ করিয়া লও মরণের পর কবরে গেলে বিশ্রামের জন্য অফুরন্ত সময় পাইবে…


ষষ্ঠিমধু গাছে লিখা আছে-

বইয়ে থাকা বিদ্যা আর পরহস্তে ধন বা অর্থ একইরকম প্রয়োজনকালে তা কোন কাজে লাগেনা


অর্জুন গাছের বাণী-

“কেবল একা বাঁচতে চেয়ো না। সবাইকে নিয়ে বাঁচো, সুন্দর ভাবে বাঁচো।”


ডানপাশে পানের বরজ-তাতে লিথা

গাছ যেমন ওষুধের আকর, আবার সেই গাছই রোগের কারণ। যেমন পান পাচক, পরিপাকের জন্য খুব উপকারী। কিন্তু সেই পানের মধ্যে লুকিয়ে আছে নানা রোগ। পান খেতে হবে শিরা ফেলে। পান পাতায় থাকা সব শিরা-উপশিরা ফেলে দিতে হবে। তাহলে সেই পান খাওয়া হবে শরীরের জন্য উপকারী।

হাতের বামে পেয়ারা বাগান তো ডানে আম বাগান, এরপর আনারস বাগান, থেজুর বাগান, কাঁঠাল বাগান, সফেদা বাগান, আমড়া, জাম্বুরা, লিচু, কিউই, রম্বুটান, বরই, কামরাঙা, নারিকেল, লটকন, কমলা, জামরুল, জাম ,পেঁপে, লেবু এমন কোন গাছ নেই যা এই বাগানে নেই, এর পরপরই রয়েছে আঙুর এর মাচা, থোকা থোকা টসটসে আঙুর মাচায় ঝুলে আছে, রয়েছে স্ট্রবেরী ও ড্রাগন এর বিশাল বাগান। লাল রঙের স্ট্রবেরী ও গোলাপী রঙের ড্রাগন ফলগুলোকে হঠাৎ ফুল বলে ভ্রম হয়।


তারা আরেকটি ব্যাপার খেয়াল করলো প্রায় প্রতিটি গাছের মগডালগুলোতে আড়াআড়িভাবে কলসী বাঁধা আছে, সেই কলসীতে ঘর-সংসার পেতেছে দোয়েল-ঘুঘু-শালিক এরং আরও অনেক নাম না জানা লাল নীল হলুদ সবুজ পাখী। প্রচুর পাখী, মাথার উপরে কিচিরমিচির করেই যাচ্ছে…পাখীর অভয়াশ্রম ও বলা যায়। আর একটি জিনিস খুব ভালো লাগলো-প্রজাপতি কত রং-বেরং এর নানান প্রজাতির প্রজাপতি ঘুরে বেড়াচ্ছে, মনে হচ্ছিল যেন প্রজাপতি পার্কে বেড়াতে এসেছে ওরা।

এক একটা বাণী পড়ছিল আর অন্তরের পর্দা একটু একটু করে সরে যাচ্ছিল। সোনালু গাছের নীচে এসে ওরা থমকে দাঁড়ালো-তাতে লিখা


কে আমি? আমি কে?

কোথায় যাচ্ছি? কেন যাচ্ছি

এখানে কি করছি? কেন করছি?

থামো ! অনবরত ছুটতে ছুটতে নিজেকেই হারিয়ে ফেলোনা


পরকালের সম্পদ কি কিছু অর্জন করেছ?

পরকালের সম্পদ?

এ বাণীটি পড়ার পর সেখান থেকে আর পা নড়াতে পারছিল না, অনেকক্ষণ চুপ করে দাড়িয়ে রইলো


এ যেন জীবনকে জীবনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া 

এ যেন জীবনের আয়নায় জীবনকে দেখা…


হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার একদম শেষপ্রান্তে একটি কুঁড়েঘর দেখতে পেল তারা এবং তার পাশেই একটি বিশাল কাঠালগাছ, গাছটির একাট বিশেষত্ব আছে-গাছের শাখা ৭/৮ ফিট উঁচু হওয়ার পর ৪টি প্রশাখায় বিভক্ত হয়েছে আর ৪টি প্রশাখাকে খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করে একটি ঘর তৈরী করা হয়েছে। এই  গাছঘরে উঠার জন্য চমৎকার একটি সিড়িও রয়েছে।

আদি ও শুদ্ধ বললো বাড়ীতে কেউ আছেন-কোথাও কোন সাড়াশব্দ নেই।কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ওরা সিড়ি দিয়ে উপরে উঠতে যাবে এমন সময় গাছঘর থেকে বেরিয়ে এলেন এক  ভদ্রলোক, সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী পরনে, মাথার চুল থেকে শুরু করে দাড়ি সব ধবধবে সাদা, যেন বিশুদ্ধতার মূর্ত প্রতীক, ভদ্রলোক বেরিয়েই বললেন–“আসসালামু আলাইকুম, ভালো আছ তোমরা”-এত আন্তরিকভাবে কুশল জিজ্ঞাসা করলেন যেন মনে হয় উনি আমাদের কতকাল ধরে চেনেন।ওরা বিহবলভাবে শুধু ঠোট দু’টো নেড়ে বললো আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।


শুদ্ধ : আপনি এখানে থাকেন?

ভদ্রলোক : জ্বী, তোমরা কী এখানে বেড়াতে এসেছে?

শুদ্ধ : জ্বী,আমরা ঢাকায় থাকি, এখানে উঠেছি মামা বাড়ীতে।

শুদ্ধ : আপনি এখানে একা থাকেন?

ভদ্রলোক : জ্বী।

শুদ্ধ : ভয় করেনা এই বিশাল বনে একা থাকতে।

ভদ্রলোক :এসেছি একা যাব একা,ভয় কি মরণে..আর একা কোথায়- আল্লাহ তো সবসময়ই আমাদের সঙ্গে আছেন।


আদি বললো-এসব গাছ আপনি একা লাগিয়েছেন…..

আমি? 

আমার একার কি সাধ্যি এত গাছ লাগানোর। তোমরা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ প্রচুর গাছপালা এ গ্রামে, এ গ্রামের ছেলে-বুড়ো সবাই খুব গাছ ভালোবাসে। খুব ভোরে আসলে দেখতে পেতে একদল স্বেচ্ছাসেবক গাছের পরিচর্যা করছে,পানি দিচ্ছে, মাটি নিড়িয়ে দিচ্ছে, ফল পেড়ে নিয়ে যাচ্ছে,পাখীদের খাবার দিচ্ছে,পাখীর ঘর-সংসারের জন্যে নতুন করে কলসী বসাচ্ছে,প্রতিদিন আরও নতুন নতুন গাছ লাগাচ্ছে, বিকেল পযন্ত অপেক্ষা করো, ওরা আবারও আসবে।


আদিয়াত : আপনি গাছ খুব ভালোবাসেন,তাই না নানু? বলেই খুব লাজুক গলায় বললো-আপনি কিছু মনে করেননিতো আপনাকে নানুভাই বলে খুব ডাকতে ইচ্ছে করছিল।

তোমরা তো আমার নাতির বয়সীই হবে, যত ডাকতে ইচ্ছে করে মন খুলে নানুভাই বলে ডাক।আমারও তোমাদের বয়সী নাতি আছে কিন্তু ওরা গ্রাম পছন্দ করেনা, ঢাকায় থাকে। কখনো বেড়াতেও আসেনা।

তারপর কিছুটা উদাস গলায় বললো-


আমার মা গাছ-ফুল-পশু-পাখী-প্রকৃতি খুব ভালোবাসতেন। ছোটবেলা থেকে মার সঙ্গে থাকতে থাকতে আমিও একটু একটু করে প্রকৃতির প্রেমে পড়ে যাই। মা চলে গিয়েছেন.. প্রকৃতিকে ভালোবাসার জন্য রেখে গিয়েছেন আমাকে…প্রতিদিন ঘুম ধেকে উঠে নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত শেষ করে মাকে দেখতাম দু’তিনটি করে গাছের চারা লাগাতেন, তারপর নাস্তার আয়োজনে যেতেন শুধু তাই নয় মা যেখানেই জায়গা পেয়েছেন গাছ লাগিয়েছেন। তার প্রতিবেশির জায়গায়ও তিনি গাছ লাগিয়েছেন। যদিও সে সব গাছ বড় হয়ে যখন ফল দেয় তা প্রতিবেশিরাই খেয়েছেন। এ নিয়ে তার কোনো চিন্তা বা আক্ষেপ ছিলনা।গাছ লাগানোর মধ্যে তিনি আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন, তাই প্রচুর গাছ লাগিয়েছেন।


মা বলতেন 

বৃক্ষ হচ্ছে প্রবাহমান সদকা। মানুষ মরে গেলে তার সমস্ত আমলনামা বন্ধ হয়ে যায় শুধুমাত্র তিনটি জায়গা থেকে আমলনামায় আমল যুক্ত হয়-তন্মধ্যে একটি হচ্ছে-গাছ। 

তুমি মারা যাওয়ার পরও যতদিন এ গাছ পৃথিবীতে থাকবে,যতদিন অক্সিজেন যোগান দেবে,যতদিন এর ফল পশু-পাখী মানুষ খাবে,যখন কোন ক্লান্ত পথিক বহুদূর হেঁটে এসে এর ছায়ায় বিশ্রাম নিবে-অর্থাৎ এ গাছ হতে মানুষ যা যা উপকার পাবে সবই তোমার আমলনামায় মৃত্যুর আগে ও পরে যোগ হবে।


মা একটি হাদীস প্রায়ই বলতেন-

‘তুমি যদি জান যে আগামীকাল কেয়ামত হবে তোমার কাছে যদি একটি চারাগাছ থাকে তাহলেও তা রোপণ কর।’ 

মা আরও একটি হাদীস বলতেন-

যখন কোনো মানুষ একটি চারা বপন করে বা কোনো ফসল ফলায় এবং কোনো মানুষ বা কোনো পশু বা পাখি তা আহার করে বা তা যদি কেউ চুরিও করে তাহলেও সেই বপনকারী বা ফলনকারী এ সাদাকার সওয়াব পাবে। শুধু তাই নয়, গাছের যেহেতু প্রাণ আছে তাই তুমি তাকে বপন করেছ,নিয়মিত যত্ন করেছ সে-ও তা মনে রাখবে,তোমাকে ভালবাসবে,তোমার জন্যে প্রার্থনা করবে।

আমার মা বলতেন-পরিবারের প্রত্যেক সদস্যদের নামে বছরে অন্তত একটি করে গাছ লাগাবে।

আদিয়াত ও শুদ্ধ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে থাকে..

.

তিনি আরও বলেন, পৃথিবীর দু’মেরুর বরফ গলতে শুরু করেছে যে উষ্ণতার জন্য তার প্রধান কারণ ব্যাপক বৃক্ষনিধন। বৈজ্ঞানিক তথ্য ও উপাত্ত দিয়ে ব্যাপারটিকে অনেক সহজ করে ব্যাখ্যা করেন। এরপর তিনি গাছের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন, এককথায় যদি বলতে চাই তাহলে আমাদের জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনেই গাছ লাগাতে হবে।প্রথমেই আসি জীবন নিয়ে। জীবনের মূল ছন্দ হচ্ছে দম। খাবার ছাড়া বেশ কয়েকদিন থাকা সম্ভব। পানি ছাড়া তার চেয়ে কম দিন থাকা সম্ভব। আর যা ছাড়া কয়েক মিনিট কেন, এক মুহূর্তও থাকা সম্ভব নয় তা হচ্ছে দম। আর দমের মূল উপাদান হচ্ছে অক্সিজেন।


আমরা জানি গাছ আমাদের বেঁচে থাকার জন্যে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ করে, আর আমাদের দেহ থেকে নিঃসৃত কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নেয়। প্রতিবার দমের সাথে আমাদের শরীরে যে পরিমাণ অক্সিজেন প্রবেশ করে তার সংখ্যা ১১-এর পাশে ২১টি শূন্য। এই অক্সিজেন পরমাণুকে শরীরের ইট মনে করলে আমরা বলতে পারি যে, প্রতি দমের সাথে এই সংখ্যক নতুন ইট আমরা শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাগাচ্ছি। গাছকে বলা যেতে পারে অক্সিজেনের ফ্যাক্টরি। ক্যানাডার জাতীয় পরিবেশ এজেন্সির একটি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- গড়পড়তায় একটি বৃক্ষ থেকে বছরে ২৬০ পাউন্ড অক্সিজেন তৈরি হয়। আর দুটি পরিপূর্ণ বৃক্ষ যে অক্সিজেন সরবরাহ করে তা ৪ সদস্যের একটি পরিবারের জন্যে যথেষ্ট। আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, লতাপাতায় পরিপূর্ণ একটি গাছ কোনো একটি মৌসুমে যেটুকু অক্সিজেন উৎপাদন করে তা ১০ জন মানুষের সারা বছরের অক্সিজেনের চাহিদার সমান।

যে অঞ্চলে গাছ বেশি, সে অঞ্চলে বৃষ্টির পরিমাণও বেশি। যে কারণে বলা হয়, গাছ নাই তো মরুভূমি হওয়ার বেশি দেরি নাই। তবে গাছ বৃষ্টি বাড়ায় কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন- ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যার হার কমায়।

আমরা যদি আমাদের নিজেদের ভালবাসি তাহলে নিজেদের প্রয়োজনেই আমাদের সবুজ প্রকৃতিকে সাজাতে হবে। আর সবুজ প্রকৃতি সাজানোর কাজ আমরা করতে পারবো নতুন গাছ লাগানো এবং যেসব গাছ লাগানো আছে সেগুলোকে যত্ন করার মাধ্যমে।


সবুজ প্রকৃতি গড়ার মাধ্যমে আমরা পৃথিবীকে আমাদের ও আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে বসবাসের উপযোগী করে সাজিয়ে দিতে পারি যা আমাদের জন্যেও অফুরন্ত কল্যাণ বয়ে আনবে। 

এরপরই তিনি আমাদের করণীয় কাজ সর্ম্পকে বলেন। শহুরে পরিবেশের যে অবস্থা, বসবাসের জন্য এক টুকরো জমি যেখানে পাওয়া যায় না সেখানে গাছ লাগানোর মতো জায়গা কোথায়। বরং যা গাছ ছিলো তা কেটে সেখানে বাড়ি-ঘর তৈরি করা হচ্ছে। তাই আমরা যারা শহরে বাস করি তারা গাছ লাগানোর জন্যে বাড়ির ছাদ বা ব্যালকনি বা যে বারান্দায় আলো বাতাস আসে তেমন জায়গা বেছে নিতে পারি। আর যাদের গ্রামের বাড়ি আছে তারা সেখানে যখন বেড়াতে যাই তখন গাছ লাগাতে পারি। এছাড়া আমাদের যাদেরই বাড়ির সামনে বা আশেপাশে জায়গা আছে, নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি সুযোগ থাকে সেখানেও গাছ লাগাতে পারি।

সবশেষে তিনি বললেন-


”আমরা অনেক কিছুই রেখে যাই, রেখে যেতে হয়। ঘরবাড়ি,বিত্ত,বৈভব, সন্তান-সন্ততি,আত্নীয় স্বজন। কিন্তু আমার মৃত্যর পর আমার জন্য দোয়া করার কেউ কি আছে …আমার চার ছেলে, বছরে একবারও আমায় দেখতে আসেনা, তেমন খোঁজ-খবরও নেয়না।যে যুগ পড়েছে আমার সন্তান আমার জন্য দোয়া করবে এ সম্ভাবনা ক্ষীণ,এমন একজনকে অন্তত রেখে যাই যে আমার মরনের পরও আমার জন্য দোয়া করবে।”

আদি ও শুদ্ধ অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো, আত্মঅনুশোচনায় মন ভরে উঠেছে..একটা মানুষ যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব ও বার্ধক্যর কাছাকাছি এসেও যদি এখনও দেশকে এত কিছু দেবার স্বপ্ন থাকে,তবে ধিক আমার এ জীবনকে…এই ২২ বছরের জীবনে দেশ আমাকে দিয়েছে দু’হাত ভরে-বিনিময়ে দেশকে কোন কিছুর প্রত্যাশা না করে দিয়েছি এমনটি মনে পড়েনা।আমি উদ্ভিদবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করছি অথচ…এতগুলো বছর জীবন থেকে চলে গিয়েছে শখ করে দু’একটি চারা হয়তো লাগিয়েছি যা পুরো জীবনের তুলনায় খড়কুটো মাত্র।কিসের শিক্ষিত আমি যে শিক্ষা জীবনের কোন কাজেই লাগলো না। 

আফসোস! ভীষণ আফসোস হতে লাগলো


প্রতিজ্ঞা করলো মনে মনে সবুজ বাংলাদেশের কোন বিকল্প নেই। এই দেশ গড়তে হবে আমাদেরকেই, কারো আশায় কারো অপেক্ষায় থাকার সময় আর নেই, কেউ আমার দেশ গড়ে দিবে এতো ভিক্ষার নামান্তর, আমার দেশ আমার মহামূল্যবান সম্পদ।অন্য দেশে বীজ থেকে চারা উৎপাদন করতে কত কসরত করতে হয়, কত টাকা খরচ হয়-অথচ আমার এই বাংলাদেশের চমৎকার প্রাকৃতিক আবহাওয়ায় কোন কোন বীজ সামান্য মাটিতেও  চারা উৎপন্ন করতে পারে।এ যে আল্লাহর কত বড় রহমত, কত বড় নেয়ামত তা বোঝার সাধ্যি আমাদের অনেকেরই হয়তো নেই। আজ থেকে শুধু কথায় নয়, কাজেও প্রমাণ করতে হবে, আমি যা বলব আমি তা করব। 

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে-হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা মুখে যা বলো তা করোনা কেন? মুখে ভালো কথা বলে তা না করাটা আল্লাহর নিকট ঘৃণিত কাজ(সূরা সাফফ:২-৩)“ 

আদি ও শুদ্ধ শপথ করলো-বাংলাদেশের প্রতি ইঞ্চি প্রতি ইঞ্চি  জমিকে কাজে লাগাতে হবে। আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনিন্দ্য-সুন্দর-স্বপ্ন-সবুজ আগামীর বাংলাদেশ…গড়ে দিতে হবে এই আমাকে, এই আমাদেরকেই।


আমার মাতৃভূমি

তোমায় সাজাবো আমি

সবুজে সবুজে…


তোমায় ভালোবাসবো আমি

কথায় নয় কাজে


তোমায় পৌঁছে দেব

আমরা 

হেথায়

সবাই পারেনা 

যেথায় 

পৌঁছুতে


তোমাকে ঢেলে সাজাবো

নব নব রুপে

নব নব বিস্ময়ে


তুমি 

তুমি হবে

বিশ্বের বিস্ময়…


আমার

বাংলাদেশ তুমি

আমার বাংলাদেশ

বড় আদরের

ব.ড় প্রিয়

ভালোবাসার বাংলাদেশ।


আমি তোমায় ভালোবাসি

ভীষণ ভালোবাসি

বড় বেশী 

বড় বেশী ভালোবাসি…