বিজ্ঞান চর্চায় মাতৃভাষা

October 15, 2020 0 By jarlimited

ইব্রাহিম নোমান

সহজেয় অনুমেয় একটি বিষয় হচ্ছে একটি দেশের বা জাতির ভাষা যত বেশি সমৃদ্ধ সে দেশ বা জাতি বিজ্ঞান চর্চা, সাহিত্য ও শিল্পকলায় তত বেশি উন্নত। নিজস্ব ভাষায় একটি চিন্তা বা বক্তব্যকে যত সহজে ব্যক্ত ও হৃদয়ঙ্গম করা যায়, বিদেশি ভাষায় তত সহজে তা ব্যক্ত বা হৃদয়ঙ্গম করা যায় না। কোন বিষয়কে যথাযথভাবে অনুধাবন করলে সে বিষয়ে জ্ঞান অর্জিত হয় না। আর যথাযথ অনুধাবন কেবলমাত্র মাতৃভাষাতেই সম্ভব।

বর্তমানে বিজ্ঞান চর্চার বিষয়টি খুব বেশি আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞানের চর্চা কিভাবে হবে, তা নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে ভাষার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আর ভাষা হিসেবে মাতৃভাষা অধিক কার্যকর এবং তা সহজে মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। ১৯৫৩ সাল থেকে ইউনেস্কো এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষা স্তর থেকে মাতৃভাষা প্রয়োগের কথা বলে আসছে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, মাতৃভাষায় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে এতে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা যেমন বাড়ে, তেমনি শিক্ষার্থীদের সফল হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার ফলাফল ইতিবাচক। মাতৃভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান চর্চার সঙ্গে একটি রাষ্টের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পায়। এর কারণ হলো মাতৃভাষার মাধ্যমে যখন কোনো একটি দেশ বিজ্ঞান চর্চা করে, তখন সে দেশের মানুষের উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটে। এই উদ্ভাবনী শক্তি প্রয়োগ করে সে দেশ প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে উৎকর্ষতা অজর্নে সমর্থ হয়। ফলে প্রযুক্তির হাত ধরে বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা গড়ে উঠে, যা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখে। আমরা দেখি যে, ভারতের মতো বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির দেশের কোনো একটি ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে প্রাধান্য দেয়া যায়নি বলে সেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বিজ্ঞান চর্চায় ইংরেজি ভাষার প্রভাব রয়ে গেছে। কিন্তু চীনের ক্ষেত্রে শুধু চীনা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করার ফলে চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ভারতের চেয়ে বেশি। আমরাও আমাদের মাতৃভাষাকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারি।

আমাদের সংশয়, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা বা বিজ্ঞান সাধনা, সম্ভব কিনা। এই সংশয় আমাদেরকে প্রতিনিয়ত পিছু টেনে রাখছে। ইংরেজি, জার্মান, ফরাসি, জাপানি, বা চিনা ভাষায় যদি বিজ্ঞান চর্চা সম্ভব হয়, বাংলা ভাষায় কেন সম্ভব হবে না ?

সমৃদ্ধ ভাষাগুলির মধ্যে বাংলা ভাষা অন্যতম। বাংলা ভাষায় বর্ণ, শব্দ, ধ্বনি ইত্যাদি এতবেশি যে, পৃথিবীর খুব কম ভাষারই তা আছে। পৃথিবীর যেকোনো ভাষাকে বাংলা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব। এত সমৃদ্ধশালী একটা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা যদি সম্ভব না হয়, অন্যান্য কম সমৃদ্ধ ভাষায় তা সম্ভব হলো কি করে? আসল কথা হলো, ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকালে পড়ে আমরা পিষ্ট। পরমুখাপেক্ষিতা এবং পর নির্ভরশীলতা আমাদের অস্থিমজ্জায় এমনভাবে মিশে গেছে যে আমরা আত্মনির্ভর হতে ভুলে গেছি। এ দীনতা আমাদের কাটিয়ে উঠতে হবে। মজ্জাগত একটি পদ্ধতি পরিবর্তনের ফলে সাময়িক কিছু অসুবিধা অবশ্যই হয়। তবে অচিরেই তা কাটিয়ে উঠা যায়। যেমন কাটিয়ে উঠেছি আমরা অফিস-আদালতের কাজ।

বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রেও অনুরূপভাবে বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করা সম্ভব। জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি করতে হলে এ ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ নেই। তবে ভাষার ব্যাপারে গোঁড়ামি এবং সংকীর্ণতা সবক্ষেত্রে পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে ভাষা যত উদার ও অন্য ভাষার শব্দ সম্বলিত সে ভাষা তত সমৃদ্ধ, তত সার্বজনীন ও গ্রহণযোগ্য। ইংরেজি ভাষার কথা যদি ধরি, তবে দেখা যাবে সে ভাষায় ইংরেজি শব্দের সঙ্গে অসংখ্য ফরাসি, জার্মান ও ল্যাটিন ভাষার শব্দ নিবিড় ভাবে মিশে আছে। বাংলা ভাষার শব্দভাÐারেও রয়েছে অনেক বিদেশি শব্দ। সেসব শব্দ বাংলা ভাষাকে করেছে সমৃদ্ধ। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করতে হলে অনেক বিদেশি শব্দ ব্যবহার করতে হবে। বাংলায় বিজ্ঞান চর্চা করতে হবে বলেই যে অক্সিজেনকে অ¤øজান, হাইড্রোজেনকে উদযান বলতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, কার্বন, কার্বনডাই অক্সাইড প্রভৃতি শব্দগুলো বিদেশি হলেও আমাদের দৈনন্দিন জীবনে, কাজে কর্মে, লেখা-পড়ায় একাত্ম হয়ে মিশে গিয়েছে। এগুলোর পরিবর্তে বাংলা অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহার করলে বাংলা ভাষার গতিময়তা ব্যাহত হবে, বাংলা ভাষা সমৃদ্ধশালী হওয়া থেকে বঞ্চিত হবে এবং আমাদের চিন্তাধারা পদে পদে হোঁচট খাবে। বিশেষ করে বিজ্ঞান চর্চা দারুণভাবে বিঘিœত হবে। তাই উপর্যুক্ত শব্দগুলো ব্যবহারে নতুন শব্দ ভাÐারে বাংলা ভাষাই শুধু সমৃদ্ধ হবে না, মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চাও অনেক সহজ হবে।

উন্নত দেশগুলো তাদের নিজস্ব ভাষায় বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল প্রকাশ করে। বাংলাভাষায় আন্তর্জাতিকমানের বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল খুব কম প্রকাশিত হয়ে থাকে। বাংলা ভাষাতে একজন শিক্ষার্থীর গবেষণাপত্র লেখা যত সহজ ও প্রকৃত বিষয়কে তুলে ধরা সম্ভব হবে তা অন্য ভাষায় সম্ভব নয়। গবেষণাকে বিশ^জনীন করতে গেলে গবেষণার প্রকৃতি অনুযায়ী বাংলায় লেখা গবেষণাপত্রগুলোকে প্রথিতযশা বাঙালি বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে ইংরেজি বা অন্যভাষায় অনুবাদ করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায় বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চাকে অনুপ্রাণিত করার জন্য তার ছাত্রদের কাছে রুশ বিজ্ঞানী মেন্দেলেভের কথা বলতেন, যিনি পিরিওডিক টেবিলের আবিষ্কারক। বিজ্ঞানী মেন্দেলেভ তার কাজ রাশিয়ান জার্নালে প্রকাশ করতেন। কারণ তিনি চাইতেন পৃথিবীর অন্য ভাষাভাষী বিজ্ঞানীরা যেন রুশ ভাষা শিখতে বাধ্য হন। বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি ভাবা যেতে পারে।

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, উন্নত রাষ্ট্রগুলোর বিশ^বিদ্যালয়ে বাংলাদেশের যে গবেষকরা রয়েছেন তাদের মতামত হল, ইংরেজিতে গবেষণাপত্র লিখলেও বা গবেষণা করলেও তাদের কল্পনা শক্তি ব্যবহার করে তারা গবেষণার বিষয়টিকে বাংলাভাষার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেন আর এতে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কাজেই সেখানে ইংরেজি ভাষায় প্রয়োগ থাকলেও মাতৃভাষার মাধ্যমে গবেষণা বা সৃষ্টির কল্পনা একজন মানুষকে বেশি প্রভাবিত করে।

প্রথমদিকে বাংলা ভাষায় রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, জগনানন্দ রায়, জগদীশ চন্দ্র বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়সহ অনেকেই বিজ্ঞান চর্চা করেছেন। আমাদের দেশে এ সম্বন্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন কুদরত-ই খুদা, কাজী মোতাহার হোসেন, আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দীন এবং আরো অনেকে। আর রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে ছিলেন বিদেশি জাহাজে যে জ্ঞান আমাদের দেশে এসে পৌঁছেছে, দেশি নৌকা ও ডিঙ্গি মারফত সে সব বাংলার গ্রামে পৌঁছে দিতে। এখন দরকার বাংলাভাষায় বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করে তা প্রাথমিক শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রচলন করা। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত সহযোগিতায় এটি বাস্তব রূপ পেতে পারে।

২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল রোজ সোমবার অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের মিনি অডিটরিয়ামে সাহিত্য বিষয়ক সংগঠন সাস্ট সাহিত্য সংসদ এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনা সভায় বলেন, মাতৃভাষার বিজ্ঞান চর্চা সহজ হয় এবং বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে ও তা সহজে অনুধাবন করতে মাতৃভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অনীহা সৃষ্টির মূল কারণ হচ্ছে তারা বইয়ের লিখিত ভাষা বুঝতে পারে না। প্রতিটি শিশুর কাছে বিদেশি ভাষা অনেকটা দুর্বোধ্য মনে হয়। তাই মাতৃভাষায় বই রচিত হলে তা শিশুদের বুঝতে সহজ হবে।

বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করলে অপরিচিত বিষয়গুলির সাথে খুব সহজে এবং অল্প সময়ে পরিচিত হওয়া যায়। বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে মাতৃভাষাই পারে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ সহায়তা করতে। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা করার ফলে এ দেশের শিক্ষার্থীরা সহজাত উপায়ে প্রতিটি বিষয় ভালোভাবে বুঝতে ও উপলব্ধি করতে পারবে।

বিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু শুধুমাত্র বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার প্রবল সমর্থকই ছিলেন না, সারা জীবন ধরে তিনি বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার ধারাটিকেও পুষ্ট করে গেছেন। এই প্রসঙ্গে তার অমর উক্তি, “যারা বলেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা হয় না, তারা হয় বাংলা জানেন না, নয় বিজ্ঞান বোঝেন না।”

সবশেষে বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের জীবনের সবক্ষেত্রেই মাতৃভাষা বাংলার ব্যাপক ব্যবহারের প্রচেষ্টা চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। কারণ এ যুগে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় পিছিয়ে থাকা কোনো জাতির পক্ষে উন্নতির ধারায় টিকে থাকা সম্ভব না। তাছাড়া, মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান ও অর্জনই হচ্ছে সবচেয়ে সহজ ও ফলদায়ক পদ্ধতি। কেননা জীবন ও শিক্ষার সমন্বয় সাধন করতে পারে একমাত্র মাতৃভাষা। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা তাই অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে।

তথ্যসূত্র ঃ
১. মাতৃভাষার মাধ্যমে বিজ্ঞান চর্চা,
যঃঃঢ়ং://স.ংড়সবযিবৎবরহনষড়ম.হবঃ
০১ লা ফেব্রæয়ারি, ২০১১ দুপুর ১:৪৬
২. বিজ্ঞানচর্চায় বাংলা ভাষা, ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী, অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, গাজীপুর।
স.ফধরহরশংযরশংযধ.পড়স ১২ ফ্রেব্রæয়ারি, ২০১৮
৩. ধৎপযরাব. ননধৎঃধ২৪. হবঃ
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০১৬, ২২:২০:১৭
৪. বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা,
যঃঃঢ়ং://িি.িসুধপধফবসুনফ.পড়স
৫. মাতৃভাষায় বিজ্ঞান, ড. ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, ফেব্রæয়ারি ২০,২০১৮
স.নধহমষধঃৎরনঁহব.পড়স, ১৩:২৩
৬. সত্যেন্দ্রনাথ বসু,
যঃঃঢ়ং://নহ.স.রিশরঢ়বফরধ.ড়ৎম