নোংরা প্রথার বলি

October 15, 2020 0 By jarlimited

মশিউর রহমান আবির

গণি মিয়ার মোবাইলটা হঠাৎ বেজে ওঠল৷ ডিউটি টাইমে ফোন এলে তিনি একটু বিরক্ত হয়ে যান। কিন্তু এবার বিরক্ত হলেন না। কারণ তাঁর মেয়ে হালিমা ফোন করেছে৷ গণি মিয়া রিসিভ করলেন।
‘হ্যাঁ মা, কেমন আছিস?
‘ভালো আছি আব্বা। তুমি কেমন আছ?’
‘আমি ভালো। তোর জামাই, শশুড়-শাশুড়ি সবাই ভালো আছে তো?’
‘সবাই ভালো আছে। আব্বা একটা কথা ছিল।’
’তো বল! অনুমতি নিয়ে বলবি নাকি?’
হালিমা প্রায় কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল, ‘আমার শশুর বাড়ির লোকজন ইফতারি দিতে বলছে। তোমাকে ইফতারি দিতে হবে৷’
‘তো কাঁদস ক্যান? ইফতারি তো দিব৷ সমাজে এখন এটা তো একটা প্রথা হয়ে গেছে। রমজান এলে, কোরবান এলে এবং বিভিন্ন কিছুকে উপলক্ষ্য করে মেয়ের শশুরবাড়িতে অনেক কিছু দিতে হয়। কয়েকটা দিন সময় দে, আমি ইফতারি নিয়ে আসব। তুই চিন্তা করিস না৷’ বলে ফোন রাখলেন।
গণি মিয়া পেশায় একজন ট্রাফিক পুলিশ। শুধু ট্রাফিক পুলিশ বললে অন্যায় হয়ে যাবে। সৎ ট্রাফিক পুলিশ বলতেই হবে। কারণ অসৎ পথে পা বাড়িয়ে বেতনের কয়েকগুণ টাকা উপার্জন করার সুযোগ থাকলেও গণি মিয়া তা করেন না। যা মাইনে পায় তা দিয়ে কোনোরকমে চলেন। হালিমা তাঁর একমাত্র মেয়ে। কয়েকমাস আগে বিশিষ্ট শিল্পপতি বাবুল তালুকদারের ছোট ছেলে রবিনের সাথে হালিমার বিয়ে হয়েছে। রবিন হালিমার অসম্ভব সৌন্দর্য দেখে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। গণি মিয়াও এমন নামকরা একজন শিল্পপতির ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দিতে ‘না’ করেননি। চোখ বন্ধ করে রাজি হয়ে গেলেন এবং মেয়েটাকে তোলে দিলেন। ভেবেছিলেন মেয়েটা সেখানে সুখে থাকবে। কিন্তু আজকে হালিমার কান্না যেন গণি মিয়ার মনে বেশ কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়ে দিলো। তিনি ভাবছেন, ‘এমন পরিবারে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি সেখানে ইফতারির জন্য মেয়েকে কী এমন বলেছে যার জন্য কান্নাও করছে!’ কিন্তু এসব বেশিক্ষণ ভাবতে পারলেন না। কিছুক্ষণের মধ্যে সেই ভাবনা গাড়ির নানা রকম হরণ আর আলোর সাথে মিশে যায়৷ গণি মিয়া আবার তাঁর ডিউটি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেলেন।

গণি মিয়া ডিউটি শেষ করে বাসায় ফিরে ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিলেন। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ডিউটি করার পর পা অবশ হয়ে আসে। যদিও এটা গণি মিয়ার জন্য কোনো ব্যাপারই না। একটু গরম পানি ঢাললে ঠিক হয়ে যায়। আজকে পায়ে গরম পানিও ঢাললেন না। শুয়ে শুয়ে কী করবেন তা ভাবছেন। ইফতারি দিতে অনেক টাকা খরচ। টাকা যা আছে তা দিয়ে দিতে গেলে কম হয়েছে বলে আবার নানা কথা শোনাবে। ভাবছেন কারও কাছ থেকে ধার নিবেন৷ বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ছোটোবেলার বন্ধু হাকিম হাওলাদারকে ফোন দিলেন।
‘কেমন আছিস গইন্না? অনেকদিন পর হঠাৎ ফোন দিলি!’ রিসিভ করেই বলে উঠল হাকিম হাওলাদার।
‘আছি কোনোরকম। তুই কেমন আছিস?’
‘ভালো।’
‘একটা কথা বলার জন্য তোকে ফোন দিয়েছি।’ ভারি কণ্ঠে বললেন গণি মিয়া।
‘টাকা ধার চাইবি এই তো?’
‘কীভাবে বুঝলি?’
‘বুঝি বুঝি। আমাকে তো সবাই টাকার জন্যই ফোন করে।’
‘আসলে মেয়ের শশুর বাড়িতে ইফতারি দিতে হবে। আমার কাছে এখন অত টাকা নেই। তুই কিছু টাকা ধার দিলে উপকার হয়। আমি সময় করে তোকে পরিশোধ করে দিব।’
‘আরে ইফতারি টিপতারি এগুলা দেওয়ার কী দরকার? কোটিপতির ছেলের সাথে মেয়েকে বিয়ে দিছস। ওদের কি কোনকিছুর অভাব আছে নাকি? অভাব থাকলে না-হয় একটা কথা। না দে এসব ইফতারি টিপতারি।’
‘না রে ভাই। ইফতারি দিতেই হবে৷ না দিলে কত কথা শোনতে হবে! আমাদের তো আর শোনতে হবে না৷ শোনতে হবে আমাদের মেয়েকে। আর সে আড়ালে গিয়ে নিজে নিজে চোখের জল ফে…’
‘ফেলবে’ বলার আগেই কুক কুক করে শব্দ করে লাইন কেটে গেল। গণি মিয়ার মোবাইলের ব্যালেন্স শেষ৷ হাকিম হাওলাদারও সেদিক থেকে আর ফোন দিলো না। কী দরকার তার? বন্ধুর বিপদে টাকা ধার দিতে হবে। সে কেন ফোন দিবে!
গণি মিয়া আর কারও কাছে টাকা ধার চাওয়ার সাহস পেলেন না। কোনো উপায় না পেয়ে নয় মাস কষ্ট করে টাকা জমিয়ে বউকে উপহার দেওয়া নেকলেসটা বেঁচে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন গণি মিয়া। সেই সিদ্ধান্ত নিতেও তার পাঁজরে এসে স্থান করে নিয়েছে কতশত কষ্ট। কিন্তু কিছু করার নেই। মেয়ের মুখের একটু হাসির জন্য বাবারা পারে না এমন কিছু নেই। সকালে উঠে নেকলেসটা বাজারে গিয়ে সোনাদানার দোকানে বিক্রি করে যা পাবে তা দিয়ে মেয়ের শশুর বাড়িতে ইফতারি নিয়ে যাবেন। এসব কতকিছু ভাবতে ভাবতে চোখের কোণায় জল রেখে কোনো এক সময় ঘুমিয়ে পড়েন গণি মিয়া।

‘হালিমার মা, আলমারির চাবিটা দাও তো।’ ঘুম থেকে উঠে স্ত্রী মাবিয়ার কাছে আলমারির চাবি চাইলেন গণি মিয়া।
‘তোমার কাপড় তো আলমারিতে না।’ জবাব দিলো মাবিয়া।
‘না না। নেকলেসটা লাগবে। বেঁচতে হবে।’
নেকলেস বেঁচার কথা শুনে মাবিয়ার বুকটা কেঁপে ওঠল। গণি মিয়া কয়েক সপ্তাহ আগেই নেকলেসটা উপহার দিয়েছিলেন। মাবিয়া নেকলেসটা একবারও পরেনি এখনও। মাবিয়া কেবল চুপ করে রইল।
মাবিয়ার চুপ থাকা দেখে গণি মিয়া বললেন, ‘হালিমার শশুড় বাড়িতে ইফতারি দিতে হবে। নেকলেসটা বেঁচতে হবে। তুত্ তুমি আমাকে চাবি দাও।’
মাবিয়া আঁচলে বাঁধা চাবিটা নিয়ে গণি মিয়ার হাতে দিলেন। গণি মিয়া আলমারি খুলে নেকলেসটা নিয়ে মাবিয়ার কাধে হাত রেখে ‘এই নেকলেস আমাদের মেয়ের চোখে জলের চেয়ে দামি নয়। রাগ করো না। আসি আমি।’ বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
নেকলেসটা বেঁচে বেশ কিছু টাকা হাতে এলো। সেগুলো দিয়ে নানা রকম ইফতারি কিনে মেয়ের শশুর বাড়ির দিকে রওনা দিলেন গণি মিয়া। গাড়ি চলছে৷ গাড়িতে বসে তাঁর বার বার মাবিয়ার কথা পড়ে পড়ছে। ‘বেচারির কত সখ ছিল! একটাবার পড়তেও পারল না। মেয়ের সুখের জন্য বেঁচে দিতে হলো।’ গাড়ির মধ্যে এমন কতশত কথা ভাবতে ভাবতে একটি বাড়ির সামনে এসে গাড়ি থামল৷ অনেক উঁচু বাড়ি। নিচ থেকে উপরে তাকাতে হলে মাথাটা ৪৫ ডিগ্রি বাঁকা করতে হবে। এটাই হালিমার শশুর বাড়ি। গণি মিয়া ইফতারি নিয়ে দরজার সামনে এসে কলিং বেলে চাপ দিলেন। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হলো না। কলিং বেল-এ চাপ দেওয়ার সাথে সাথেই একজন শ্যামবর্ণের নারী দরজা খুলে দিল। সে ঘরের কাজের মেয়ে রহিমা।
‘আপনে কেডা?’ গণি মিয়াকে চিনতে না পেরে জিজ্ঞেস করল রহিমা।
‘আমি হালিমার বাবা’
‘আপনে আপামনির আব্বা? আহেন আহেন৷ ভিত্রে আহেন।’
গণি মিয়া ভেতরে গিয়ে বসলেন।
‘আপামনি, দেহেন ক্যাডা আইছে।’ হালিমাকে ডাকল রহিমা।
হালিমা তখন যান্ত্রিক স্বর্গীয় রুমে বসে জাহান্নামের কষ্ট অনুভব করছিল। রহিমার ডাকে সে ড্রইং রুমে এলো। এসেই সে চমকে গেল আর ‘আব্বা তুমি?’ বলে গণি মিয়াকে জড়িয়ে ধরল। বাবাকে দেখে হালিমা বেশ খুশি হয়েছে। মেয়েকে দেখে বাবার মুখেও হাসি থাকার কথা। কিন্তু গণি মিয়ার মুখে হাসি নেই। সে মেয়ের চেহেরা দেখে বুঝল মেয়েটা এখানে মোটেও ভালো নেই। তবুও কোনোভাবে হাসির অভিনয় করে বললেন, ‘হ। এইমাত্র এলাম।’
‘তুমি না বলে, না জানিয়ে চলে এলে যে?’
‘ক্যান মা? আমি আমার মেয়ের কাছে না জানিয়ে আসতে পারি না?’
‘তা না আব্বা। তুমি আসবে জানলে অনেক কিছুর আয়োজন করতাম। কত খুশি হতে তুমি!’
‘মা রে, বাপের কাছে মেয়েকে দেখতে পারার মত সুখ আর কিছু নেই। আয়োজনে না, আমি তোরে দেখেলেই খুশি থাকি।’
‘আচ্ছা তুমি বস, আমি আব্বাকে ডেকে নিয়ে আসি।’ এই বলে বাবুল তালুকদারকে ডাকতে ভেতরে গেল হালিমা। বাবুল তালুকদার তখন নিজ শয়নকক্ষে বসে সিগারেট টানছিলেন। হালিমা অনুমতি নিয়ে ভেতরে ঢুকে তার বাবা আসার ব্যাপারটা বাবুল তালুকদারকে জানাল। বাবুল তালুকদার অতটা খুশি হলেন না। সিগারেটের শেষ টানটা দিয়ে নিজ রুম থেকে বের হয়ে গণি মিয়ার কাছে এলেন। দুই বেহাই করমর্দন করলেন৷ গণি মিয়া কোলাকুলি করতে চাইলে ‘আরে এসবের কী দরকার’ বলে বাবুল তালুকদার কোলাকুলি করতে অনিহা প্রকাশ করলেন এবং একটা লম্বা সোফায় পা তোলে বসে গেলেন। গণি মিয়াও পাশে গিয়ে বসলেন৷
‘আরে এখানে বসছেন কেন বেহাই?’
‘আপনার সাথে কথা বলব, আড্ডা দিব তাই পাশেই বসলাম’
‘আসলে এই সোফায় আমি ছাড়া কেউ বসে না। শুধু আমিই বসি। অই যে সোফাটাতে বসেন৷ কাছেই তো। কথা বলা যাবে।’
গণি মিয়া সেই সোফা থেকে উঠে সামনে থাকা আরেকটি সোফাটায় গিয়ে বসলেন। বাবুল তালুকদারের আচরণ তাঁর কাছে মোটেও ভালো লাগল না৷
গণি মিয়া হালিমাকে ডেকে বললেন, ‘মা আমি চলে যাব।’
‘ক্যান আব্বা? রোজা রেখে কত দূর থেকে মাত্র এলে। চলে যাবা ক্যান?’
‘যেতে হবে মা। আজকে অফিসে ইফতার হবে। সবাই থাকবে। আমাকেও থাকতে হবে। না থাকলে নানান কথা বলবে। আমি আসি।’ বলে বাবুল তালুকদারকে সালাম দিয়ে বুকভরা কষ্ট নিয়ে গণি মিয়া বেরিয়ে গেলেন। হালিমা আর কিছুই বলল না। বাপের দিকে চেয়ে চেয়ে কেবল অশ্রুপাত করল৷ তার কিছু বলারও নেই।
ক্লান্তিতে গণি মিয়ার শরীর কাঁপছে। চোখে মুখে অন্ধকার দেখছে। মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটা যেন প্রচন্ড বেগে ঘুরছে। তাড়াতাড়ি একটা টিকিট কেটে বাসে উঠে গেলেন। সাথে এক বোতল পানিও নিলেন।
বাস এগোচ্ছে। কিন্তু গণি মিয়ার জন্য সময় এগোচ্ছে না৷ বাসের সিটে হেলান দিয়ে বসে রইলেন৷ বাবুল তালুকদারের আচরণে বেশ কষ্ট পেয়েছেন তিনি। বাবুল তালুকদার ডজনখানেক ফ্যাক্টরির মালিক আর গণি মিয়া একজন ট্রাফিক পুলিশ বলে তার সাথে কোলাকুলি করলেন না। পাশে বসতে দিলেন না। সেসব মনে পড়লে গণি মিয়ার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। গণি মিয়া তখন নিজেকে নিজে প্রশ্ন করেন, ‘সব কোটিপতি-ই কি এমন?’ এসব অনেক কিছুই ভাবতে ভাবতে চারিদিক থেকে আযানের ধ্বনি তাঁর কানে এসে ধাক্কা দেয়। গণি মিয়া বোতলের ঢাকনাটা খুলে “আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ও‘য়ালা-রিজক্বিকা আফতারতু” দোয়াটি পড়ে কয়েক ঢোক পানি গিলে নিলেন৷ পাশের সিট থেকে আঠারো কি ঊনিশ বছরের একটা মেয়ে একটা বন গণি মিয়ার দিকে এগিয়ে দিলো আর বলল, ‘আংকেল, নেন। এটা খান।’ গণি মিয়া বনটা হাতে নিয়ে দুই কামড়ে খেয়ে নিলেন। টিকিটে, কাউন্টারে লেখা থাকে, ‘গাড়িতে অপরিচিত কেউ কিছু দিলে খাবেন না৷’ কিন্তু গণি মিয়া খেয়ে নিলেন। তিনি মনে করেন, ‘যে মানুষকে ইফতার করায় তার কোন খারাপ উদ্দেশ্য থাকতে পারে না।’

কিছুদিন কেটে যায়। এদিকে হালিমার শশুর বাড়ির লোকজন হালিমাকে প্রতিদিন নানান কথা শোনাতে থাকে। ইফতারি যা দিয়েছে তা অনেক কম হয়েছে বলে দাবি করে। এত দিন বাবুল তালুকদার চুপ ছিলেন। আজকে তিনিও মুখ খুললেন। তিনি হালিমাকে ডেকে বললেন, ‘কিরে বউমা, তোমার বাপ ফকিরকে ভিক্ষা দিচ্ছে মতো এইটুকু ইফতারি দিয়ে গেল কেন? এর চেয়ে বেশি আমি রাস্তার ফরির গুলোকে দিই। আর কাপড় কই? এইটুকু ইফতারি নিয়ে নাচতে নাচতে চলে এলো। ঈদের জন্য যে কাপড় দিতে হয় তা জানে না? আমাদের সবার জন্য এবং সব আত্মীয় স্বজনদের জন্য কাপড় পাঠাতে বলবে।’
‘আব্বা তো একজন সাধারণ ট্রাফিক পুলিশ৷ অল্প মাইনে পায়। যতটুকু পেরেছে দিয়েছে। আবার এখন এতজনের জন্য কাপড় কীভাবে দিবে?’
‘কীভাবে দিবে মানে? আমরা দিই না? আমাদের মায়েকেও বিয়ে দিয়েছি তো। তাদের শশুরবাড়িতে কী কী দিয়েছি জানো না?’
‘আপনাদের তো কিছুরই অভাব নাই। এভাবে প্রতিদিন দিলেও সমস্যা হবে না৷ কিন্তু আমার আব্বার তো সেই সামর্থ্য নেই৷ কোনরকম চলে।’
‘সামর্থ্য? এরা কী করে আমি জানি না? কতটাকা ঘুস খায় সবকিছুই জানি তো।’
‘আমার আব্বা এমন না। আব্বা ঘুস খায় না। আমি জানি আমার আব্বা কত কষ্ট করে।’
‘মুখে লাগাম দাও। এত কিছু জানি না। কাপড় দিতে বলবে। ইদের আগেই দিতে বলবে।’
হালিমা আর বাক্যব্যয় করল না। সেখান থেকে চলে গেল। ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে গণি মিয়াকে ফোন দিলো।
‘কিরে মা, কাঁদছিস কেন?’ হালিমার কান্না শোনে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন গণি মিয়া।
‘আমাকে কোথায় বিয়ে দিলে আব্বা? কত বিলাসবহুল বাড়িতে আছি, মাটিতে পা পর্যন্ত রাখতে হয় না। তাও আমার ভেতরে একটুও শান্তি নেই৷ কোথায় বিয়ে দিলে আমাকে?’
গণি মিয়া অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর মেয়ে শান্তিতে নেই৷ শুধু বিলাসবহুল বাড়িতে থাকা, বিলাসবহুল গাড়িতে চড়া, প্রতিদিন পোলাও কোরমা খাওয়াকে শান্তি বলে না, যদি মনের শান্তিটা পাওয়া না যায়। গণি মিয়ার মেয়ে হালিমার অবস্থাও তেমন। মানসিক ভাবে মোটেও শান্তিতে নেই সে। তবুও গণি মিয়া কিছু না জানার ভান করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ক্যান? কী হয়েছে?’
‘আমার শশুর বাড়ির লোকজন ইফতারি নিয়ে মোটেও খুশি না। কিন্তু আমি জানি এবং বুঝি তুমি কত কষ্ট করে ইফতারি দিয়েছ। শুনেছি মা’র নেকলেস পর্যন্ত বেঁচতে হয়েছে। আর সেদিন কেন চলে গেছিলে সেটাও বুঝেছি। এসব কেউ বুঝে না আব্বা। এখানের সবাই এখন কাপড় চাইছে। সব আত্মীয় স্বজনদের জন্য সহ। ইদের আগেই দিতে বলতেছে।’
গণি মিয়া চুপ হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ চুপচাপ থাকার পর ‘আচ্ছা দেখি’ বলে ফোনটা রাখলেন।
গণি মিয়া এখন ভাবছেন সে একজন সাধারণ ট্রাফিক পুলিশ হয়ে এত বেশি উচ্চ পর্যায়ের মানুষের হাতে মেয়েকে তুলে দেওয়াটা যেন তাঁর জীবনে করা ভুল গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভুল। এই অবস্থায় এতগুলো মানুষের জন্য কাপড় দেওয়ার মতো সামর্থ্য তাঁর নেই৷ নেকলেস ছিল শেষ সম্বল। তা বেঁচে ইফতারি দিয়েছে। তবুও বলছে কম হয়েছে। কিছু মানুষকে আজীবন দিতে থাকলেও শুকরিয়া আদায় করে না তারা। গণি মিয়া তাঁর সততা বিসর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেন।
ঘুস নেওয়া সহ যত ধরনের অপকর্ম আছে সবই শুরু করলেন গণি মিয়া। যেভাবেই হোক মেয়ের সুখ নিশ্চিতের জন্য একজন বাবার এই কাজ। কারণ ‘শশুর বাড়িতে মেয়েটি একটু সুখে থাকুকু’ এটা প্রতিটা বাবার মনের বাসনা। সেই সুখ নিশ্চিতের জন্য একজন বাবা সবকিছু করতে পারেন। কিন্তু সততা বিসর্জন দিয়েও এই অল্প দিনে বেশি কিছু করতে পারলেন না গণি মিয়া। অবশেষে মেয়ের জামাইয়ের জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনে সেটা পাঠিয়ে দিলেন৷ আর কিছু করতে পারলেন না। গণি মিয়ার এই না পারাটা হালিমার কপালের ‘দুঃখ’ নামক লেখাটা আরও গাঢ় করে দেয়৷ হালিমাকে নানান কথা শোনাতে থাকে তার শশুর বাড়ির লোকজন। শেষ পর্যন্ত সবাই তার বাপকেও গালগাল দেয়। হালিমা সব সহ্য করলেও তার বাপকে এভাবে গালাগাল দেওয়াটা সহ্য করতে পারল না। কারও কথার কোনো জবাবও দিলো না। কেবল শোনে গেল।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ে৷ নতুন সকালের জন্য সবাই অপেক্ষা করে। নতুন সকাল হয়েছে। সবাই সকালে ঘুম থেকে উঠে৷ কিন্তু হালিমা উঠে না। সে অকালে মরণের পথ বেছে নিয়েছে।

হালিমা ঝুলছে
এমন কত হালিমা ঝুলে
তবুও যায় না সমাজের কিছু মানুষের নোংরা অহংকার,
সমাজটা আজ নোংরা প্রথায় হলো অন্ধকার।