নিষ্ফল অনুশোচনা

October 15, 2020 0 By jarlimited

নুরুন্নবী সিদ্দিক

রাত্র প্রায় ১০ টা। গ্রামে সময়টা অবশ্য অনেক রাত। ইমাম সাহেব মসজিদের দরজায় তালা লাগাবার জন্য অনেক আগে থেকেই প্রস্তুত। কিন্তু একজন মুসল্লি এখনো ভেতরে রয়ে গেছেন। আজ কয়েকদিন ধরেই এমনটা হয়ে আসছে। কিছুটা বিরক্ত হলেও কি আর করা। মসজিদে কেউ ইবাদতে মশগুল থাকতে চাইলে তাকেতো আর বাহির করে দেওয়া যায়না।

অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর ইমামের ধের্য্যের বাঁধ ভাঙল। মসজিদে ঢুকে মুসল্লির গায়ে আলতো হাতের ছোঁয়া দিয়ে বলতে লাগলেন- হাজী সাহেব, বাড়িতে যাবেন না?
চোখ খুলে গালবেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু মুছলেন। কি ভেবে আবারো কান্না শুরু করলেন। কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলেন হুজুর আল্লাহ কি আমাকে মাফ করবেন?

– কেন করবেন না! আল্লাহ যে রহীম, রহমান! তিনি গাফুরুর রহীম। বান্দা ভুলের জন্য লজ্জিত হয়ে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ অবশ্যই ক্ষমা করবেন।

– না হুজুর! আমি ক্ষমা পাবোনা! আমি যে মহাপাপী।

– এতোটা হতাশ হবেন না। লা তাকনাতু মির রহমাতিল্লাহ। আল্লাহ বলেছেন- বান্দা, আমার রহমত থেকে নিরাশ হইয়োনা।

হুজুর আমি আল্লাহর এ বানীটা জানি। কিন্তু আল্লাহ যে পরের হক মাফ করবেন না এটাই আমাকে আজ হতাশার সাগরে ভাসাচ্ছে। আমি সারাটি জীবন কি করে এসেছি শুধু আমিই জানি। আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে গেছি যে, সামনে জাহান্নাম ছাড়া কিছুই দেখছিনা।

আমি জীবনের প্রায় ৩৫ টি বছর চাকুরীতে কাটিয়েছি। সন্তান ও পরিবারের সকলকে সাচ্ছন্দ্য এনে দিতে কতোভাবেই না টাকা কামিয়েছি হালাল হারামের তোয়াক্কা না করেই। অফিসের ১০ টাকার খরচকে ১৫ টাকায় রূপান্তর করেছি। মানুষের কাছ থেকে ছলে বলে কৌশলে টাকা আদায় করেছি। দেওয়ার সময় কম দিয়ে ঠকিয়েছি আবার আদায়ের বেলায় বেশি আদায় করে ঠকিয়েছি। আমার নেশাই ছিল ২ কে ৪ আর ৪ কে ৬ বানিয়ে কিভাবে অতিরিক্ত কিছু টাকা কামানো যায়। এভাবে ব্যক্তি আর প্রতিষ্ঠানকে ধোকা দিয়ে হালাল ইনকামের সাথে হারামের মিশ্রণ ঘটিয়ে আমি অর্জন করেছি লক্ষ লক্ষ টাকার সম্পদ।

আমি মুসলমানের সন্তান ছিলাম। নামায ছাড়িনি কখনো। জানেন হুজুর? নামাযে গিয়ে কখনো মনে হয়নি একটু আগে আমি অবৈধ টাকা পকেটে পুরে এসেছি। আবার নামাযের শেষে অন্যের চোখকে ফাঁকি দিয়ে হারাম টাকায় পকেট ভরবো, আমার নামায কি কবুল হবে? কখনো কখনো মনে করতাম আড়ালে সবাই আমাকে ঘুষখোর নামাযী বলে, বাটপার টাইপের লোক ভাবে, তবুও নিজেকে চালাক ভেবে মনকে বুঝাতাম যে, কেউ টের পায় না।

জানেন! লক্ষ টাকা খরচ করে আমি হজ্জ্বও করেছি। ভেবেছি হজ্জ করলে লোক নিষ্পাপ হয়ে যায়। কখনো চিন্তাই করিনি হজ্জের টাকাটা যেভাবে ম্যানেজ করেছি সেটা বৈধ ছিল কিনা। মানুষ আমাকে হাজী সাহেব বলে সম্মান দেয়। অথচ আজ আমি দেখছি আমার হজ্জ দুনিয়াতে মানুষের মুখে মুখেই রয়ে গেছে। এই হজ্জ আমাকে জান্নাত এনে দিতে পারবে না। কারণ হজ্জের টাকা ম্যানেজ করতে অনেকের হক মেরে দিয়েছি।

লোকে আমাকে শিক্ষিত, বিবেকবান বলে সম্মান দেয়। অথচ আজ আমি দেখছি আমিই ছিলাম সবচেয়ে বড় অশিক্ষিত একটা লোক। আমার শিক্ষা আমাকে অন্যের হক মেরে দেওয়া থেকে ফেরাতে পারেনি। আল্লাহ প্রদত্ত বিবেক কখনো নাড়া দিয়ে সত্যটা উপলব্ধি করেনি। বিবেকের বিচারে আমি আজ আসামীর কাঠ গড়ায়।

জানেন হুজুর! আমি যখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়লাম, ছেলেমেয়েদেরকে সব সম্পদ বুঝিয়ে দিলাম। আজ ওরাও আমাকে বোঝা ভাবে। আমি আজ নিঃস্ব।
সারাজীবন দ্বীনি রাস্তায় ব্যয় করাকে জরিমানা মনে করতাম।
আজ প্রচন্ড ইচ্ছে হয় কিছু টাকা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করি কিন্তু পারিনা…..
ভাবি, যাদের টাকা বিভিন্ন কৌশলে আত্মসাৎ করেছিলাম তাদেরকে যদি পাওনাটা বুঝিয়ে দিতে পারতাম…….

নাহ! কিছুই যে আজ সম্ভব না।

আমি আল্লাহর কাছে বারবার ক্ষমা চাই। আর মনে হয় আল্লাহ আমাকে বলে- ওদের কাছে যা! যাদের হক্ব মেরে খেয়েছিলি……

বিশেষ দ্রষ্টব্য:
এমন একটা পরিস্থিতির শিকার হতে পারি আমি আপনি অনেকেই..। আসুন! সময় থাকতে একটু চিন্তা করি। আমার কর্মকান্ড কেউ বুঝবেনা এই চিন্তা না করে আল্লাহ সব দেখেন ভেবে আল্লাহকে যথাযথ ভয় করি। নিজের আয়কে হালাল করি। অন্যের পাওনাটা বুঝিয়ে দেই। অবৈধ টাকা আয়ের নানারকম ফন্দি ফিকির ছেড়ে বৈধ টাকায় আল্লাহর উপর ভরসা রাখি। সিদ্ধান্ত নেই যে, পরকালে কেউ যেন একটাকার জন্যও আমার সামনে দাঁড়াতে না পারে। নয়তো এমন নিষ্ফল অনুশোচনায় কোন কাজে আসবেনা।

Date: October 6, 2020
Time: 9:40 am