ঘড়ির কাঁটা

October 15, 2020 0 By jarlimited

ফারজানা রহমান মুনমুন

চারদিকে ঠান্ডা বাতাস বইছে। কুয়াশায় সামনে পিছনে কোনো কিছু ঠিকঠাক দেখার সুযোগ নেই। সিএনজি থেকে নেমে রঙ্গনা দাঁড়ায়। ড্রাইভার ,ঘাড় ঘুরিয়ে রঙ্গনার দিকে তাকিয়ে বলছে,
–  আপা ভাড়াটা।
–  কত?  
– জি, বিশ টাকা।
রঙ্গনা ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে, তীব্র শীতে নিঃশ্বাসে মুখ থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রঙ্গনা! এ ঠান্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে বেশি একটা ভালো লাগছে না। মনে মনে বিড়বিড় করে বলছে, ‘উফ!’ গাড়িটা এখনো এলো না। ‘ রঙ্গনা মনে মনে বলতে লাগলো, আরেকটু আগে আসলে কলেজ বাস এ যাওয়া যেত। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট গুলোতে উঠতে একদম ভালো লাগে না। তবুও মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েদের অভ্যাস হয়ে যায়।
‘মিনিট দশে’ক অপেক্ষার পর বাস এসে দাঁড়ায়, রঙ্গনা ধাক্কাধাক্কি করে বাসে উঠে। একটা খালি সিট দেখে বসে পড়ল। রঙ্গনার ফোনে কল আসতে, ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে, কলটা রিসিভ করল।
– হ্যালো !
ফোনের ওপাশ থেকে’ হ্যালো, ম্যাডাম আজকে টিউশনে আসার দরকার নেই। আমরা একটু বাহিরে যাচ্ছি, ফোনটা কেটে দিল। রঙ্গনার খুব রাগ হচ্ছিল মনে মনে, ঘন্টাখানেক আগে বললে কি হত? ঠান্ডার ভিতর আমি বের হতাম না। ফোনটা ব্যাগে রেখে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে, ব্যাগ থেকে একটা বই বের করে পড়তে শুরু করল। হঠাৎ পাশ থেকে কেউ বলছে,”হাই!”
রঙ্গনা হালকা কেঁপে উঠলো। কারণ ও বই পড়া নিয়ে এতটাই মগ্ন ছিল যে কেউ এসে বসেছিলে খেয়ালই করেনি। তারপর রঙ্গনা পাশের জনের দিকে ঘাড় মুড়িয়ে দেখল, হাইট হবে সাড়ে 5 ফুট , চুল গুলো হাল্কা কোঁকড়ানো , উজ্জল শ্যামল গায়ের রং, গোঁফ সেইভ করে ছোট ছোট করে কাটা। ব্লু প্রিন্টের টি-শার্ট পরা , পায়ের উপরে ল্যাপটপের ব্যাগ , “একটা ছেলে”।
ভয়ে ভাব দেখিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিল রঙ্গনা। ছেলেটি আবারও ” হাই ” দিচ্ছে। রঙ্গনা আসতে করে  “হ্যালো।
– ছেলেটি ,আমি নেহাল!
– রঙ্গনা বলল, ওহ্ আচ্ছা, আমি রঙ্গনা !
– নেহাল আবারও রঙ্গনা কে জিজ্ঞাসা করল “তুমি কিসে পড়ো?”
– রঙ্গনা উওরে বলে ‘ডিগ্রি ফাইনাল ইয়ারে।’
নেহাল ল্যাপটপটা অন করে টিপতে শুরু করলো।
রঙ্গনা ভাবছে কথা বলা এখানে শেষ, মুক্তি পেলো, কিন্তু না! নেহাল ল্যাপটপ থেকে মনযোগ সরিয়ে রঙ্গনার দিকে তাকিয়ে বলছে,
–  ” ইস্পাহানি ডিগ্রি কলেজ পড়ছো?”
– রঙ্গনা মাথা ঝাঁকিয়ে “হ্যাঁ” কিভাবে বুঝলেন?
– নেহাল তোমার বইয়ের উপর লেখা।
রঙ্গনা ‘মুচকি হেসে’ হমম। নেহাল আবার রঙ্গনাকে জিজ্ঞেস করে, পড়াশেষ করে কি করার ইচ্ছে?
– রঙ্গনা বলল, ‘গভমেন্ট জব যদি পাই, করব;
– নেহাল গুড, বাই দ্যা ওয়ে তুমি বিরক্ত হচ্ছো না তো আবার? ‘রঙ্গনা উওরে’ না বলল, “কিন্তু সে মনে মনে ভীষণ বিরক্তি প্রকাশ করছে।
– আমি, এখানকার একটা বায়িংহাউজে জব করছি। পরিবারে বাবা-মা আর ছোট বোন। বাবা শিক্ষকতা করছে, আর মা হাউস ওয়াইফ, ছোট বোন ক্লাস নাইনে পড়ছে।
– রঙ্গনা বলছে, ওহ্ আচ্ছা! আপনি তাহলে ঢাকায় থাকেন ?
নেহাল হমম। বাস কন্ট্রাকটার যখন ভাড়া চাইলো ।
নেহাল দু’জনের ভাড়া দিতে যাচ্ছে। রঙ্গনা বলল, আপনি আমার ভাড়া দিবেন না। নেহাল জোর করছে দিতে,রঙ্গনা পছন্দ করছিল না দেখে,নেহাল ভাড়া ফিরিয়ে নিল।

তারপরে দু’জনে চুপচাপ বসেছিল। নেহাল কিছু বলতে সাহস করছিল না। রঙ্গনা আবার কি মনে করে? নেহাল বিড়বিড় করে বলছে, কি দরকার ছিল? আগবাড়িয়ে ভাড়া দিতে যেতে। নেহাল রঙ্গনার দিকে আড়চোখে তাকাতে দেখছে। রঙ্গনা জানালার বাইরে মুখ করে প্রকৃতির সজীবতা উপভোগ করছে। তার চুলগুলো সরে যখন চোখের পাপড়ি’তে দোল খাচ্ছে। সে দৃষ্টি দিয়ে মনে হচ্ছে আমিও প্রকৃতিকে স্পর্শ করতে যাচ্ছি । কি অপূর্ব ! অন্যরকম সুন্দর লাগছে মেয়েটিকে। বাতাসে নড়ছে চুল। টিপ-টিপ করে ওঠল আমার বুকের ভেতর, ছেদ পড়ল। নেহালের চোখে চোখে পড়তেই রঙ্গনা জিজ্ঞেস করল, কিছু বলবেন?
নেহাল দ্রুত যুগল কুঁচকে ওঠে।
– না মানে বলছিস, গলা পরিষ্কার করে । মুখে এক ঝাঁক হাসি বেঁধে হাত দিয়ে চুলগুলো নাড়া দিতে দিতে বলল ,কিছু না।
– খানিকটা মুচকি হাসি দিল রঙ্গনা।
” বিজ্রে এসে গাড়ি থামল,রঙ্গনা নামে, সাথে নেহালও। রঙ্গনা বাস থেকে নেমে নেহালকে বলছে – ‘বাই’ !
নেহাল রঙ্গনা সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
– তুমি যদি কিছু মনে না করো। তোমরা ফোন নাম্বারটা দিবে?”
রঙ্গনা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো । মনে মনে ভাবছে, এখন নাম্বার চাইছে, পরে বাসার ঠিকানা। এখন না দিলে, রাস্তায় সিনক্রিয়েট করলে? তার চেয়ে আম্মুর বন্ধ ফোন নাম্বারটা দিয়ে দেই। আবার যদি আমাকে সামনে রেখে নাম্বারটায় ফোন দেয়, আর বন্ধ পেয়ে খারাপ কিছু বলে? তবে কি হবে? থাক, আমার নাম্বারটা দেই যদি কল করে ব্লক করে দিব।
– নেহাল বলছে, নাম্বারটা?
– রঙ্গনা ‘জি উঠান’ 01392…..!
নেহাল যখন বলছিল নাম্বারটা সেভ করে রাখুন, ফোন করলে রিসিভ করবেন । রঙ্গনা আর দাঁড়ায়নি হাঁটতে শুরু করে, আর পিছনে ফিরে তাকায় । নেহাল পিছু আসছে কিনা? তাকিয়ে দেখে নেই, যাক মনে ভরসা ফেলো। তবুও কেমন ভয়ে মনের ভিতর কাজ করছে।” অবশেষে হাঁটতে হাঁটতে কলেজের গেটে পৌঁছালো।

সপ্তাহখানেক পর আননোন নাম্বার থেকে রঙ্গনার ফোনে কল আসে। ফোন চার্জে লাগানো ছিল, শুনতে পায়নি। পরে রঙ্গনা কল ব্যাক করে।
– হ্যালো! কে বলছেন?
ফোনের ওপাশ থেকে বলছে “আমি নেহাল!” রঙ্গনার মাথায় নেহালের কথা একটুও মনে ছিল না।
– কোন নেহাল?
–  ভুলে গেলেন? আমাদের বাসে দেখা হয়েছে।
– রঙ্গনা বলল, ও আপনি ?
–  নেহাল হমম। তারপরে তারা কথা বলতে বলতে ভালো ফ্রেন্ড থেকে রিলেশনে জড়িয়ে যায়।

‘একদিন নেহাল রঙ্গনা দেখা করে কোন এক কফিশপে।’
নেহাল চামচ দিয়ে কফি নাড়তে নাড়তে রঙ্গনার দিকে তাকায়। রঙ্গনা মিষ্টি হেসে লজ্জা অন্যদিকে ফিরে ।
– নেহাল, উহু ! ‘গলা পরিষ্কার করে হেসে’ ইয়ে মানে অনেকক্ষন ধরে চুপ করে বসে আছি কেউ তো কোনো কথাই বলতেছি না।
– হুম , আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে ?
– নেহাল না শুনা মত, জি !
– আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে?
–  হুম আছে ।
– কইসে ?
– নেহাল চোখে অফুরন্ত ভালবাসা নিয়ে বলছে,
আমার সামনে বসে আছে যে সুন্দরী মেয়েটি!
– রঙ্গনা হেসে, আমি আপনার গার্লফ্রেন্ড ?
– না , সামনে বলতে শুধু আপনি না। এখানে অনেকেই সুন্দর, সুন্দরী মেয়ে আছে। কেন কোনো সন্দেহ আছে?
– রঙ্গনা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে বলছে, আলবাত আছে । এখানে যে আপনার গার্লফ্রেন্ড আছে তার প্রুফ দেখান।
– নেহাল মাথা নিচু করে, এখন প্রুফ দেখাতে হবে?
– রঙ্গনা বলছে, হ্যাঁ নিশ্চয়ই !
নেহাল টেবিল ছেড়ে উঠে একটি সুদর্শন মেয়েকে জিজ্ঞেস করল, তুমি কি আমার গার্লফ্রেন্ড ? মেয়েটি নেহাল এর কথায় অবাক হয়ে, দাঁড়িয়ে যায়।
– নেহাল না, না, তুমি না।  আরেকটি মেয়েকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কি আমার গার্লফ্রেন্ড? আরে না, তুমিও তো না। মাথার চুল চুলকাতে চুলকাতে, তাহলে আমার গার্লফ্রেন্ড কোথায় ?  রঙ্গনা বিরক্ত কন্ঠে মনে মনে বলছে, আমি সামনে বসে আছি আমাকে নজরে পড়ছে না জনাবের ! এখন অন্য কাউকে গার্লফ্রেন্ড বানাতে খুঁজছে ভুয়া একটা !
– নেহাল এসে রঙ্গনা পাশে বসে , আমার গার্লফ্রেন্ড হতে ক্ষতি কি..?
– রঙ্গনা ভাব দেখিয়ে, না আমি কোন, আপনার গার্লফ্রেন্ড হবো? যে এখানে আছে তাকে ডাকেন। 
– নেহাল বলছে , না ডাকতে হবে না। সে তো অনেক আগেই আমার গার্লফ্রেন্ড হয়ে বসে আছে। ‘দুজন মিলে হেসে উঠলো’। এভাবে চলতে থাকে মাসের পর বছর।

নেহালের পরনে মেজেন্ডা রঙের পাঞ্জাবির সাথে সাদা পাজামা। পায়ে একজোড়া স্যান্ডেল সু। ‘ভ্যালেন্টাইন্স-ডে’ তে নেহাল রঙ্গনা সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। রাস্তায় ,সাদা লাল টিউলিপ ফুল নিয়ে ছোট্ট একটি মেয়ে হেঁটে যাচ্ছিল নেহালের সামনে দিয়ে । নেহাল ডাকলো , অ্যাই পিচ্চি এখানে। সে ফুল কিনতে চাইল ।
– মেয়েটি বলল, ভাইজান সাদা লাল মিশিয়ে দেই ?
– নেহাল বলল , ‘হুম, সুন্দর দেখে দাও।’
“রঙ্গনা সাদা রঙের লাল পাড়ের শাড়ি পরে, ম্যাচ করে ব্লাউজ। হাতে লাল চুড়ি, কান একজোড়া ইয়ারিং, কপালে টিপ নেই, চুলগুলো খোঁপা করা, বেলি ফুল দিয়ে মোড়ানো, সঙ্গে গোলাপ। “এই নিয়ে তাদের ভ্যালেন্টাইন্স ডে দু’বার যাচ্ছে।” নেহাল হাঁটু দু’টো মাটিতে রেখে
টিউলিপ ফুল গুলো রঙ্গনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
– জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তুমি আমার ভ্যালেন্টাইন্স ডে হবে? কথা গুলো যদিও নেহালের মুখ থেকে রঙ্গনা অনেক বার শুনেছিল তবুও রঙ্গনার হার্টবিট বেড়ে যায়! দ্রুত ব্লাড পাম্পের কারনে রক্ত সচল থাকে! যার কারনে রঙ্গনার চেহারায় উজ্জ্বলতা আসে!
– এভাবে বসে থাকতে আমার খুবই কষ্ট হচ্ছে, তুমি কি আমার ধৈর্যের পরীক্ষা করছ ? প্লীজ রঙ্গনা! আমাকে আর আমার ফুল গুলো গ্রহণ কর। রঙ্গনা ইনিয়ে বিনিয়ে ফুল গুলো হাতে নিল। নেহাল দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলছে,
– আমাদের দু’জনকে খুব ভালো মানিয়েছে তাই না ?
– রঙ্গনা হেসে বলছে , হমম ।
নেহাল রঙ্গনার হাত ধরে দু’জনে পাশাপাশি হাঁটছে।
আর নেহাল বলছে,
একদিন রাতে বৃদ্ধাশ্রমের উঠোনে বসে দুজনে আকাশের চাঁদ দেখবো। পান খেতে খেতে দুজনে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে করে খুব হাসবো। বিশ্বাস করো, বৃদ্ধ বয়সে মায়া করার জন্য একজন বুড়ির খুব দরকার আমার। একজন সাদা চুলের বুড়ির দিকে তাকিয়ে আমার জীবনের শেষ দিনগুলি কাটিয়ে দিবো। তুমি কি সেই দিনটাতেও আমার পাশে রবে? তুমি কি বেঁচে থাকার প্রার্থনাতে বুড়ি হবে এই বুড়োর সাথে?
চোখের কোণে অশ্রুসিক্ত জল টলমল করছে রঙ্গনা।
নেহালের হাতটা আরো শক্ত করে ধরে বলছে,
– হমম। কথা দিলাম জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমার এক সঙ্গেই থাকব।
দুজনে পাশাপাশি হেঁটে চলে যাচ্ছে। এজন্যই রিলেশনে থাকা মানুষগুলো দিন দিন সুন্দর হয়!!

নেহাল অফিসে বসে কাজের ফাঁকে রঙ্গনাকে টেক্সট পাঠায়। ‘হাই’! রঙ্গনা হাতে ফোনটা নিয়ে খাটের উপর আরাম করে বসে, নেহাল-কে রিপ্লাই করে। 
– হ্যালো, কি করছো?
– অফিসে বসে কাজ করছি, আর তুমি?
– রঙ্গনা বলছে হমম, তোমার কথা ভাবছি।
– নেহাল, কি ভাবছো?
– ভাবছি তোমার বস্ আসবে এখন, এসে দেখবে তুমি কাজ না করে ফোন টিপাটিপি করছো !
– নেহাল হমম, তারপর?
– রঙ্গনা হেসে ওঠে, তারপর তোমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে অফিস থেকে বের করে দিবে।  ‘হাসির ইমোজি পাঠায়। ‘ – নেহাল বিরক্তিকর ইমোজি পাঠায়, আমার বস্ মোটেও এমন করবে না। কারণ তিনি খুব ভালো! এবং তিনি এটাও জানেন কাজের সময় একটু ইনজয় এর প্রয়োজন!
রঙ্গনা লাইক পাঠায়ে।
– আচ্ছা ধরো তোমার চাকরিটা আর নেই, তখন তুমি কি করবে?
– নেহাল ভেবে বলে, আমি তখন আমার হবু শ্বশুরকে গিয়ে বলল আমি আপনার মেয়েকে ভালোবাসি তাকে বিয়ে করতে চাই। তখন শশুর মশাই বলবে তুমি বেকার ছেলে আমি বেকার ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিব না। তখন আমি বলব শশুর মশাই আপনি আমাদের বিয়েটা না দিলে আমি অনশন করব আপনার বিরুদ্ধে বলব আমাদের প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়ের সম্পর্কে বাঁধা সৃষ্টি করছেন। আপনার চাকরী নিয়ে টানাটানি পড়বে। ভয়ে এমনিতেই তোমাকে আমার হাতে তুলে দিবে তখন।
– তুমি আমার বাবাকে থ্রেট দিবে? আমার বাবা কেউকে ভয় পায় না বুঝছো ?
– ভাগ্যিস আমাকে যদি ভয় পেত ! ( দুজনে হেসে উঠল ,হা, হা ,হা ।)

লেকের ধারে রঙ্গনা নেহালের ঘাড়ের উপর মাথা রেখে বসে আছে আর নেহাল বাদাম খেতে খেতে বলছে,
– আমাদের বিয়ের পর আমাদের যখন প্রজন্ম আসবে তুমি আমাকে এভাবে ভালোবাসবে ?
– রঙ্গনা বলল , হুম , ভীষণ ভাবে ।
– নেহাল বলছে, আমি যখন ক্লান্ত শরীরে বাসায় ফিরব, হাতে তাজা বেলী ফুল দিয়ে তোমার জন্য তুমি খোঁপায় পড়বে ?
– রঙ্গনা বলে উঠলো, হ্যাঁ , আর তখন আমার মাথায় থাকা বেলি ফুলের সুবাসে তোমার ক্লান্তি থেমে যাবে।
– নেহাল, আমাদের ছোট্ট একটা সংসার থাকবে যেখানে ভালোবাসার রং কথা বলবে।
– রঙ্গনা বলল , হমম , সেই তখন থেকে ভালোবাসার গল্প শুনিয়ে নিজে একাই বাদাম খাচ্ছেন। আমার দিকে কোন খেয়ালী নেই! 
নেহাল বলছে , খাবে তুমি ?
রঙ্গনা হমম, ‘ হা করে’। নেহাল বাদামের খোসা ছেড়ে, এই নাও , বলে নিজের মুখে ।
– রঙ্গনা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বলছে, দুষ্টু, দাঁড়াও তবে।
নেহাল হাসতে হাসতে বসা থেকে উঠে দৌড়ায়।
রঙ্গনা নেহালের পিছনে দৌড়াচ্ছে আর বলছে, তুমি কি ভেবেছো, আমি তোমায় ধরতে পারবো না ?
নেহাল হাসতে হাসতে আত্মহারা হয়ে দৌড়াচ্ছে ,ধরে দেখাও না।
– রঙ্গনা, দৌড়াতে পায়ে ব্যথা লেগে।  উফ্ !  বসে পড়ে।
– নেহাল থেমে হেসে বলছে, তুমি ভান করে বসে আছো আমি বুঝতে পেরেছি! রঙ্গনা উঠতে চেষ্টা করছে পারছেনা তাই কান্না করে। নেহাল দৌড়ে এসে, সত্যিই চোট লেগেছে ? সরি, সরি আমি বুঝতে পারিনি। রিক্সা ডেকে বলছে, এই মামা যাবে ?  রিক্সাওয়ালা বলল, হ্যাঁ,,,,,,,,,। নেহাল রঙ্গনাকে নিয়ে রিক্সায় উঠে, রঙ্গনাকে তার বাসায় পৌঁছে দেয় ।

____________

রঙ্গনার মা বাসায় চেঁচামেচি করে বলছে, চলাফেরার সময় মানুষ একটু সাবধানে চলে। তুমি কি আকাশের দিকে চেয়ে হাঁট ?
রঙ্গনার বাবা মেয়ের সাইড নিয়ে বলছে,
– পড়ে গেছে ওতো আর ইচ্ছে করে পড়ে যায়নি। ‘রঙ্গনা সাপোর্টার পেয়ে বলল,
– হে বাবা, মা তো বুঝতে চাইছে না।
রঙ্গনার মা চেঁচিয়ে ওঠে বলছে , হে আমি কিছু বুঝিনা তোমার বাপ-মেয়ে সব বোঝো। বলছি মেয়েকে এত লায় নিও না, বলতে রুম থেকে চলে যান।
– বাবা রঙ্গনার মাথায় হাত বুলিয়ে বলছে ,ওষুধ খেয়েছিস মা?
– রঙ্গনা মাথা নেড়ে , হ্যাঁ, আম্মু খাইয়ে দিছে।
বাবা মেয়েকে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে,খুব ব্যথা হচ্ছে বুঝি ? এইতো হালকা। এদিকে নেহাল রঙ্গনার ফোনে কল দিচ্ছে । রঙ্গনার ফোনটা সাইলেন্ট মোডে, কল বেজে যাচ্ছে।
বাবা মেয়েকে বলছে ,শুয়ে পড় মা । রঙ্গনা লক্ষী মেয়ের মতো শুয়ে পড়ে। বাবা রঙ্গনার গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দেয়। নেহাল আবার কল করে , ফোনটা বেজে যাচ্ছে। প্লিজ প্লিজ ফোনটা তোলো , পিকআপ দ্যা ফোন ! নেহাল
টেনশনে বলছে,
– রঙ্গনার আবার অন্য কিছু হয়নি তো? দূর বোকা ! এসব কি ভাবছিস? রঙ্গনার বাবা রঙ্গনার কানের কাছে এসে, আচ্ছা মা আমার কাছে বলতো ব্যাথাটা কিভাবে ফেলি ?
– রঙ্গনা রাগান্বিত হয়ে বলছে , বাবা আমাকে কি এখন পড়ে দেখাতে হবে ?
– বাবা বলল, না ,না তুমি ঘুমাও। গুড নাইট !
– রঙ্গনা কাঁথা মুড়ি বলছে, গুড নাইট বাবা। রঙ্গনার বাবা চলে যান রুম থেকে । রঙ্গনা ফোনটা হাতে নিতে নেহালের অনেকগুলো মিসকল উঠে আছে । রঙ্গনা বলছে, এত কল দিচ্ছে টেরই পেলাম না।
নেহাল আবার কল করে,  রঙ্গনা রিসিভ করে, হ্যালো নেহাল!  নেহালের চিন্তিত গলায় বলছে,
– তুমি ঠিক আছো তো?
রঙ্গনা বলছে, হমম। নেহাল বলল, এতক্ষণ ধরে কল করছি তোমার কোন রেসপন্স নেই। এদিকে আমি ভাবতে ভাবতে টেনশনে পড়ে গেলাম।
– বাবা – মা দুজনেই রুমে ছিল তাছাড়া ফোনটা সাইলেন্ট ছিল খেয়াল করিনি। নেহালের চিন্তা খানিকটা দূর হয়েছে । ব্যথা কমছে ?
– কিছুটা।
– ওষুধ খেয়েছো?
রঙ্গনা হমম। নেহাল বলছে, বাসায় নিশ্চয়ই চেঁচামেচি হয়েছে? রঙ্গনা বলল, হমম, আম্মু একটু চেঁচামেচি করছে! নেহাল বলছে, আচ্ছা, ঘুমিয়ে পরো আবার কেউ দেখলে বকাবকি করবে!
– রঙ্গনা বলছে হুম , কল কথা হবে, গুড নাইট ! 
– নেহাল বলল,  হ্যাঁ , আল্লাহ হাফেজ।

নেহাল রঙ্গনা-কে নিয়ে রিক্সায় করে ঘুরছে, কোথায় যাবে বল? রঙ্গনা ফুসকা খেতে। নেহাল, এই গরমে আইসক্রিম খেলে ভালো হয়। ‘রিক্সার ড্রাইভার-কে’ মামা আইসক্রিম পার্লারের সামনে দাঁড়াবেন। রিক্সার ড্রাইভার মাথা নেড়ে সম্মতি দিল।
– রঙ্গনা মন খারাপ করে বলছে, আইসক্রিম!
–  নেহাল বলল, আচ্ছা যাও ফুসকা ও খেও!
রঙ্গনা নেহালের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিল।নেহাল রঙ্গনার হাত ধরে দু’জনে খুব হাসাহাসি করতে করতে যাচ্ছে রিক্সায় করে । রঙ্গনার বাবা রাস্তায় দিয়ে যাচ্ছে আর রঙ্গনাকে নেহালের সাথে রিক্সায় করে খুব হাসাহাসি করে যেতে দেখে, বিরক্ত হন। রঙ্গনা নেহাল আইসক্রিমের পার্লারের সামনে নামে।
নেহাল আইসক্রিম খেতে খেতে সহজ ভঙ্গিতে বলল,
– আমাকে আগামীকাল ঢাকার বাইরে যেতে হবে । হঠাৎ এর মধ্যে স্যার জানায়, এখন আমাকে যেতে হবে আগে জানলে তোমায় বলতাম।
রঙ্গনার কপালে কয়েক পরত ভাঁজ পড়ল । সে আইসক্রিম খাওয়া বন্ধ করে নেহালের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। নেহাল আবার বলছে;
– আমি, কিছুদিন ব্যস্ত থাকবো। তোমার সাথে যোগাযোগ করতে পারব না। রঙ্গনা কিছুই বলছে না নিচের দিকে তাকিয়ে থাকলো।
– দেখ মন খারাপ করেনা প্লীজ! ওখানে কাজের চাপ কমলেই আমরা আগের মত সময় কাটাব।
রঙ্গনার অশ্রুসিক্ত নয়নে নেহালের দিকে চেয়ে বলল,
– না, গেলে হয় না ?
– নেহাল বলল, আমাকে যেতেই হবে , এ কাজটা করলে আমার আবার প্রমোশন হবে। তারপর আমার বাবা- মাকে তোমাদের বাড়ি পাঠাবো ।
রঙ্গনা নেহালকে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরে বলছে,
– আই রিয়েলি মিস্ ইউ নেহাল”!
নেহাল আলতো হাতে রঙ্গনার গাল ছুঁয়ে বলছে,
– মিসট মিস্ ইউ টু! আমি সময় পেলে তোমাকে কল টেক্সট করব।

রঙ্গনার পরিবার যখন জানতে পারে তার রিলেশনের
কথা । বাসা থেকে অন্যথায় বিয়ের জন্য জোর দেয়।
রঙ্গনা তার বাবা-মাকে পরিষ্কার ভাবে জানায়। নেহাল’কে ছাড়া অন্য কারো সাথে সংসার করা তার পক্ষে সম্ভব না!
রঙ্গনার বাবা তার উওরে মেয়েকে বলল, তুমি যদি ওই ছেলেকে বিয়ে করো, তাহলে আমাদের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক থাকবে না। রঙ্গনার শরীরটা আচমকা কেঁপে উঠলো। সে কিছু বলতে পারলো না বাবাকে তাই
চুপ করে দাঁড়িয়ে, ভিতরে ভিতরে কাঁপছে। এদিকে নেহাল-কে দেওয়া কথা তার মনে পরতে জোর গলায় বলল,
– বাবা এ তুমি কি বলছো?”
রঙ্গনার বাবা রাগান্বিত চোখে বলছে ,আমি যা বলেছি এতোটুকু নড়চড় হবে না, সেটা তুমি ভালো করেই জানো। রঙ্গনার মা বলছে, তোমার কাছে দু’দিনের সম্পর্ক এত দামি? যে তোমার বাবা – মায়ের চেয়ে আপন হয়ে গেল? রঙ্গনা তার মাকে বলছে, নেহাল খুব ভালো ছেলে মা, রিস্পেক্টাবল্ ফ্যামিলি তাদের। নেহাল একটা বায়িং হাউজ চাকরি করে। ‘রঙ্গনার বাবা মেজাজ দেখিয়ে বলছে, মেয়েকে বোঝাও আমাদের ফ্যামিলিতে বড়দের কথায় শেষ কথা’। যাই হোক আমি কিন্তু আমার সিদ্ধান্তে অটল থাকব।  রঙ্গনার মা কাঁদতে কাঁদতে বলছে, আমরা কাকে কি বলছি? পৃথিবীর সবার সঙ্গে লড়াই করা যায়, শুরু মাত্র নিজের সন্তান ছাড়া”। রঙ্গনা দৌড়ে গিয়ে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে, ঘরের ভিতর চিৎকার করে কাঁদছে। “কখনো কখনো মানুষ পরিবারের জেদের কাছে হেরে যায়। আর হেরে গিয়েও জিতে যায়।” 

রঙ্গনা যখন নেহালকে টেক্সট করত নেহাল অফিসের কাজের জন্য সময় হতো না ট্যাক্স গুলো দেখার।
রঙ্গনা এভাবে প্রতিদিন একের পর এক কল আর মেসেজ দিয়ে রাখত। মেসেঞ্জারে তার এক্টিভ দেখতো মেসেঞ্জারে দেখায় পনেরো দিন আগে একবার আসছে নেহাল।  তখন রঙ্গনা বুঝতো নেহাল খুবই ব্যস্ত । এভাবে কেটে যায় এক মাস রঙ্গনা তারপরও নেহাল-কে মেসেজ করে। রঙ্গনা চোখের কোণে জল মুছতে বলে, শুধু একটাই আশায় কবে নেহালের রিপ্লে আসবে। তুমি কি খুব ব্যস্ত? আমাকে একটা মেসেজ করলে কি হয়? আমি তোমার মেসেজের অপেক্ষায় বসে আছি। সেদিনের পর
অপেক্ষার প্রহর গুনে গুনে কয়েকটি রাত নির্ঘুমভাবে কাটিয়ে দিল রঙ্গনা।
___________________________________
পরেরদিন,
রঙ্গনা নেহালের ফোনে যখন কল করে ফোনটা বন্ধ থাকে আর যখনই খোলা ফেলো তখনই ব্যস্ত, তার কলটা ঢোকার সুযোগই ছিল না । চিৎকার করে বলছে,
‘আই রিয়েলি নীড্ ইউ নেহাল ! কাঁদতে কাঁদতে ফেলে আসা স্মৃতি গুলো মনে পরে। রঙ্গনা নেহাল-কে বলছে,
ভালবাসার রং কি ধূসর না কি কালো? নেহাল হেসে বলল ,ধুর বোকা ভালোবাসার আবার রং হয় নাকি? রঙ্গনা বলল , তাহলে সবাই যে এত রঙ্গিন সাজে সাজে এত রঙ্গিন স্বপ্ন দেখে ? নেহাল বলছে, তাহলে ভাবতে হবে !
__রঙ্গনা অনেক বুঝিয়েছে বাবা-মা’কে কিন্তু, আজ তার বাবার জেদের কাছে হেরে গেল বাবার পছন্দের পাত্রকে বিয়ে করতে হবে তাকে। রঙ্গনা অন্ধকার ঘরের কোণে বসে বলছে, চার বছরের একটা সম্পর্ক এক নিমিষে শেষ করে দেয়া মুখের কথা না। আমার ভেতরে কি ঝড় বয়ে যাচ্ছে তা আমি ছাড়া কেউ জানে না। এমনকি নেহালও না । নিশ্চয়ই আমাকে ছলনাময়ী ভাববে। কিন্তু আমি নিরুপায়। কিছু করার নেই আমার। বাবা কখনোই আমাদের সম্পর্ক মেনে নিবেন না। যদিও নেহাল বায়িংহাউজে জব করছে, ভাল পজিশনে আছে। কোনো মেয়ের বাবা’ই তাকে প্রত্যাখ্যান করবে না। একমাত্র আমার বাবা বাদে। এক্ষেত্রে নেহালের একটাই অপরাধ, সে আমাকে ভালবাসত। প্রেমের বিয়েতে বাবা মোটেও বিশ্বাসী নন। তারপরও আমি নেহাল-কে ভালবেসেছিলাম। কারণ, ভালবাসতে বাধ্য হয়েছিলাম। ওর মধ্যে এমন কিছু ব্যাপার আছে, যা আমাকে মারাত্নকভাবে টানে। আমি বুঁদ হয়ে থাকি তার নেশায়। এই দুনিয়াতে যদি বাবা-মা’র পরে আমাকে কেউ বেশি ভালবেসে থাকে, সে হচ্ছে নেহাল। আমাদের ভালবাসায় কোনো খাদ নেই। নেই কোনো অপূর্ণতা। শুধু এই ভালবাসাটুকু কে বুকে আঁকড়ে ধরে বাকিটা জীবন অনায়াসে পার করে দেয়া যাবে।

                        ৪৫ দিন পর
নেহাল যখন ফ্রী হল,ফোনটা অন করে, প্রথমে রঙ্গনাকে কল করে ।রঙ্গনার ফোনটা সুইচ অফ বলছে নিহাল ভাবছে, এতদিন পর নিশ্চয়ই রাগ করে বসে আছে। রাগ করে থাকারই কথা ফোনটা যখন পুরোপুরি স্টার্ট হল টপটপ করে মেসেজ আসতে শুরু করলো। নেহাল একটা মেসেজ অন করল । তুমি কি খুব ব্যস্ত? আমাকে একটা মেসেজ করলে কি হয়? আমি তোমার মেসেজের অপেক্ষায় বসে আছি। তারপর আরেকটা এভাবে অসংখ্য মেসেজ এসে জমাট খেয়েছে। নেহাল মেসেঞ্জারে মেসেজ গুলো যখন পড়তে শুরু করে মুহূর্তেই দু’চোখ দিয়ে জল ঝরতে থাকে। রঙ্গনা বিয়ের ঠিক আগের দিন রাতে, মানে হলুদ সন্ধ্যা লগ্নে দু’হাত ভরে মেহেদী আঁকা । লাল টকটকে শাড়ি পড়ে কনের বেসে, গলায় হালকা অলংকার । হাতে লাল চুড়ি হলুদের সাজে রঙ্গনা।
ককশিট দিয়ে বড়বড় অক্ষরে লেখা রঙ্গনা তোমাকে রাঙ্গাবো হলুদে । হলুদের আসরে বসে একের পর এক এসে হলুদের রঙে রাঙ্গিয়ে দিচ্ছে। তার মনের ভেতর একটা দমকা ঝড় বইছে ,উল্টোপাল্টা ভাবনা।  এক জটলা প্রশ্নই শুধু ঘুর পাক খেতে লাগল বার বার। নেহাল আমাকে মন থেকে ক্ষমা করবে ? আমাকে অপবাদ দিবে নিশ্চয়ই! দিবে না কেন? আমি হলে এক চুলও ছাড়তাম না, অপবাদ দিতে। সে তো আমাকে বিশ্বাস করে ভালোবেসেছিল । আর আমি শুধু নিজের পরিবারের কথা ভেবে সে মানুষটিকে ছাড়তে বাধ্য। তাতে আমার বা কি দোষ । বাধ্য সন্তান হয়ে নিজের সুখকে বিসর্জন দিচ্ছি। দিব বা না কেন , ওরা যে আমাকে পৃথিবীতে এনেছে। চারদিকে আলোর রোশনাই , হইচই জমজমাট আসর। হঠাৎ রঙ্গনার মা মেয়ের পাশে এসে বসে বলছিস,
– তখন থেকে দেখছি কি সব বিড়বিড় করছো । রঙ্গনাকে হলুদ লাগাতে লাগাতে বলছে,একটু হাসি মুখে থাকো, না হলে সবাই ভাববে তোমাকে আমার জোড় করে বিয়ে দিচ্ছি। রঙ্গনা খুব উত্তেজিত হয়ে বলল,
– আমি পারবো না এসব প্লাস্টিক হাসি দিয়ে থাকতে মা। মা বলল,তোমার কথাবার্তা ঠিক কর । আমরা চাইছি না কোন রকম ঝামেলা ছড়াক ।
রঙ্গনা রাগান্বিত অবস্থায় বলব,
– তাহলে তোমার আমাকে ওই অপদার্থ মানুষটির সাথে বিয়ে দিচ্ছো কেন? কেন মা। 
– আহ! চেঁচিয়ে কথা বলছো কেন? দেখছো না আসর ভর্তি মেহমান। আর আসিফ খুব ভালো ছেলে। ক্যামেরাম্যান বলছে , ম্যাডাম একটু হাসি ছোঁয়ান মুখে। রঙ্গনা বিড়বিড় করে বলছ ,
– আমি পারবো না । মা- মেয়ের কাঁদে হাত রেখে বলছে, কি হয়েছে? হাস । রঙ্গনা না পারতে মুখে খানিকটা অনিশ্চয়তার হাসি ফুটালো। ক্যামরাম্যান রঙ্গনার কয়েক টা ফটোশুট করেছেন।

হলুদের অনুষ্ঠান শেষে রঙ্গনা ফোনটা হাতে নিয়ে
নেহালকে একটা মেসেজ করে। খুব দেখতে ইচ্ছে করছে তোমায়, একবার তোমার কন্ঠ শুনতে ইচ্ছে করছে। কাল আমার বিয়ে আমি আর তোমার হলাম কই? দূরে চলে যেতে হচ্ছে! কালকের পর থেকে নিজের নামের সাথে অন্য একটি নাম জড়িয়ে নিতে হবে আমায় । শেষ একবার তোমার কাঁধে মাথা রাখার ইচ্ছে ছিল! আমায় ক্ষমা করো, তোমায় কথা দিয়ে রাখতে পারলাম না। নিজেকে আজ খুব মিথ্যেবাদী মনে হচ্ছে, ঘৃণ্য মানুষ গুলোর মধ্যে আমি একজন। যে কিনা ভালোবাসার কাছে ভালোবাসার সুখের কাছে নিজের সত্যতা প্রকাশ করতে পারছেনা, ভালো থেকো। আমায় ক্ষমা করে দিও ! নেহাল কাঁদতে কাঁদতে, কেন এমন হলো? সে আমাকে ধোঁকা দিল। রঙ্গনার প্রতি খুব রাগ জমেছে নেহালের মনে। একবার দেখা পেলে জিজ্ঞেস করবে কেন এমনটা করল ?  ভালোবাসায় কি শুধু যন্ত্রনা? নাকি অনাবিল সুখ? সে সুযোগ পেলাম কই বুঝার! যে ভালোবাসা নিয়ে কত স্বপ্ন ছিল সে মানুষটি আমারই ছিল। আজ অন্যের সাথে ঘর করছে! যতই অন্যের থাকুক না কেন, সে তো আমাকে ভালোবাসতো আমিও তাকে, কেন ভালোবাসা রং হয়? কেন কালো অন্ধকার করে দেয় জীবনকে। যেটা আমি পাবো না তাহলে কেন সেটা আমার কাছে আসে? কেন আমাকে রঙিন স্বপ্ন দেখায়? কেন ছুঁতে চায় সে অনাবিল সুখ? চিৎকার করে বলছে, যে আমার কখনো হতো না। তাহলে তাকে নিয়ে কেন এত স্বপ্ন আমাকে দেখতে হয় ? ফ্লোরে বসে পড়লো।

রঙ্গনার আসিফের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পর, নেহালের সাথে যোগাযোগ করেনি।  হঠাৎ একদিন রঙ্গনা সিলভার পয়েন্টের সামনে হাতে কয়েকটা শপিংব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে। নেহাল রাস্তার ওপাশে ,দু’জনের চোখাচোখি হয়। মনে হচ্ছে আবার তাদের চোখের মিলন ঘটছে।
রঙ্গনার একটুকুও বদল দেখতে পেল না নেহাল। চোখে খানিকটা ভয় ভিড় করেছে । দেখেই বোঝা যায়। সে কি আমাকে কিছু বলবে! হয়তো এভাবে দেখা হয়ে যাওয়াটা প্রত্যাশা করেনি সে। যাই হোক এখন তো আর নিজেকে লুকাতে পারছে না।
খুব সুন্দর লাগছে, অন্যরকম সুন্দর! যে সুন্দরযৌ প্রথম দেখাতে লেগেছে।

_____________(ইমাজিনেশন)_______________
চলো কোথাও বসি?
রঙ্গনা নেহালের দিকে না তাকিয়ে উত্তর দিলাম,
– না। হাঁটতেই ভাল লাগছে। তোমার মুখ শুকনো লাগছে।
সকালে নাস্তা করে বের হয়েছো?
– ‘মুচকি হেসে’ হুম।
– ওহ্। আজ অফিস নেই? ছুটি নিয়েছো?
– তুমি মনে হয় ভুলে গেছো আজ শনিবার।
– হুম।
আনমনে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নেহালের দিকে চোখ পড়তেই রঙ্গনা খেয়াল করলো, সে তার দিকে অপলক দৃষ্টি-তে চেয়ে আছে। রঙ্গনা একটু ইতস্তত বোধ করে বলল,
– কেমন আছো ?
– রেখেছো যেমন !
– ভালো নেই তবে?
– ছিলাম ‘ইবা কবে ?
– কবে ফিরলে ? 
– নেই সময়ের খেয়াল । বেগুনি শাড়ি পড়েছো যে?
– বেগুনি পছন্দ তার ।
– বাহ্! আজ তোমাকে অন্যরকম সুন্দর লাগছে। বিয়ে করার ইচ্ছে না থাকলে প্রেম করেছো যে?

– তোমাকে ভালবাসি তাই।

– তাহলে কেন আমাকে ছেড়ে দিলে? আমি না তোমার..,
অভিমান হয়েছে বুঝি ?

– অভিমানী চেয়ে দিয়েছি সেই কবে। এতো তোমাকে
বুঝতে হবেও না। যা বলছি মন দিয়ে শুনো, আমার সাথে এখন থেকে আর কোনো যোগাযোগ হবে না। খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো করবে। নিজের যত্ন নিবে। এখন আর কোনো রিলেশনশিপে না গিয়ে পারলে সরাসরি বিয়ে করে ফেলো। ঠিক আছে? আমি আসছি তাহলে।
হাঁটতে শুরু করল,যাওয়ার সময় রঙ্গনা আর পেছন ফিরে তাকাল না। হাঁটতে হাঁটতে রঙ্গনার মন বলছে, নেহাল এখনো আমার পথের দিকে চেয়ে আছে। কষ্ট যে আমারো হচ্ছে। ভেতর টা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আবেগ অনুভূতিগুলো ঠিকঠাকভাবে প্রকাশ করতে পারি না বলে কেউ আমাকে বুঝতে পারে না। একমাত্র নেহাল ছাড়া। আচ্ছা, নেহাল কি আজও আমাকে ঠিকঠাক বুঝতে পারছে? ও কি বুঝতে পারছে আমার কষ্ট টা? ও কি আমার ব্যর্থতাটাও বুঝতে পারছে? ও কি দীর্ঘশ্বাস চেনে? তার উত্তাপ বুঝে?

______________( ইমাজিনেশন ব্যাক ) ____________
নেহাল মনে মনে বলছে, শুরু একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিল। কেন আমাকে ছেড়ে দিলে? ‘ নেহাল রাস্তা পার হয়ে আসতে। রঙ্গনা সামনে একটা রিকশা এসে দাঁড়ায়। রঙ্গনা রিক্সা উঠেপড়ে,পাশে বসা লোকটি রঙ্গনার কাঁদে হাত রাখে।”জিজ্ঞেস করে” ,শপিং কমপ্লিট? রঙ্গনা গাঁড় নেড়ে বলছে, হমম ! রঙ্গনার পাশে বসা যুবক ছেলেটি তার হাজব্যান্ড আসিফ! নেহাল রাস্তা পার হয়ে আসতে রঙ্গনার রিক্সা ছেড়ে দিল। নেহাল দাঁড়িয়ে রইল। রঙ্গনা একটু যেতেই পিছনে ফিরে তাকায় । নেহাল মুচকি হেসে দিয়ে হাত নাড়িয়ে বলছে “বাই, বাই” রঙ্গনা ও হাসি মুখে নেহাল’কে চোখের ইশারায়
বিদায় জানায়। তারপর রঙ্গনা সামনের দিকে ফিরে ।
                    _________  ([ সমাপ্ত ]) __________

Date: October 6, 2020
Time: 12:21 am