Freedom

“মুক্তি”

October 14, 2020 0 By jarlimited

মীর সজিব

আজ অনেকদিন পর সাবিদ তার গ্রামের বাড়ি যাচ্ছে। চাকরির সুবাদে এখন খুব কম-ই যাওয়া পরে গ্রামে। সাবিদের গ্রামের নাম সুখলপুর গ্রাম। তবে এ গ্রামকে সবাই ভূতুড়ে গ্রাম বলেই জানে। বাবা-মা আর আত্মীয়স্বজন না থাকলে হয়ত আর যেতই না এমন ভূতুড়ে গ্রামে।
গ্রামের একপ্রান্তে নদীর কাছেই এক জমিদার বাড়ি। জমিদারের কোনো বংশধরই আর বেঁচে নেই। এ বাড়িটিকে ঘিরেই যত ভূতুড়ে রহস্য। প্রশাসন এর অনেক লোক এসে এই রহস্য উন্মোচন করতে চেয়েছিল। কিন্তু রহস্য তো উন্মোচন হলই না; বরং তার উল্টো ঘটনা ঘটলো। প্রশাসন এর দুই সদস্যের আধ খাওয়া লাশ পাওয়া যায় জমিদার বাড়িটির পাশের জারুল গাছটায়। এরপর আর কেউ সাহস করে আসেনি এই বাড়ির রহস্য জানতে।
আগে জমিদার বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে মানুষের যাতায়াত থাকলেও এই ঘটনার পর থেকে কেউ আর সাহস করনি এই বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার। সাবিদ এই জমিদার বাড়ি সম্পর্কে জানতে পারে তার দাদা আব্দুল হালিম এর কাছ থেকে। আব্দুল হালিমের কাছ থেকে সাবিদ জানতে পেরেছিল, কাশিম সিদ্দীকী নামে এক জমিদার থাকত এ বাড়িতে । তার পূর্বপুরুষ নিতান্তই ভালো চরিত্রের ছিলেন। তাদের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়েছিল অনেক গ্রামে।
তবে কাশিম সিদ্দীকির চরিত্র ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। যেমন এক হাতের দুই পিঠ, তেমনই ছিল কাশিম সিদ্দীকী। সে ছিল খুব নিষ্ঠুর আর অত্যাচারী। যারা কর দিতে ব্যর্থ হত তাদের সবাইকে ধরে এনে অন্ধকার কারাগারে বন্দি করে রাখত আর তাদের উপর চালাত বিভিন্ন ধরনের অমানুবিক অত্যাচার। আবার অনেকের বউ মেয়েকে ধরে নিয়ে এসে ধর্ষণ করত। তারপর তাদের খুন করে ঝুলিয়ে দিত বাড়ির পাশের জারুল গাছটায়। আর যেসকল কৃষক আর জেলেদের কারাগারে রাখত তাদের কেউ একসময় মেরে নদীতে ভাসিয়ে দিত। এক কথায় কাশিম সিদ্দীকী মানুষ মেরে যেন অন্যরকম শান্তি পেত।
হঠাৎ একদিন জমিদার কাশিমের বিভৎস্য লাশ পাওয়া যায় তার বিছানায়। লাশটির সারা শরীল এ চাবুকের দাগ স্পষ্ট। গলায় কেউ ধারালো অস্ত্র চালিয়েছে। মনে হচ্ছিল গলাটা শরীর থেকে আলাদা করতে চেয়েছিল। কাশিম সিদ্দীকীর অত্যাচারে যেসকল চেলারা সবসময় তাকে সাহায্য করত, তাদের লাশ পাওয়া যায় পাশের নদীতে ভাসমান অবস্থায়। কারো কারো লাশ দুই বা তিন টুকরো করে ফেলে রেখেছিল নদীতে। পাওয়া যায়নি শুধু জমিদারের স্ত্রী আর ছেলের লাশ। গ্রামের সবাই তাদের মৃত ভাবতে শুরু করে কারণ তাদের কোনো খুঁজ পাওয়া যায়নি।
সাবিদ কখনই পুরো কাহিনী জানতে পারতো না, ভয় পেয়ে চলে যেত দাদার কাছ থেকে। এই ঘটনার পর গ্রামের মানুষ খুশি হলেও তাদের মধ্যে ভয় কাজ করতে শুরু করল। তারা বিশ্বাস করতো ঐ জমিদার যাদের নিষ্ঠুর ভাবে মেরেছিল তাদের রুহ-ই এমন কাজ করেছে। সাবিদ এসব বিশ্বাস করত না কারণ সে জানে মানুষ মারা গেলে রুহ আর পৃথিবীতে থাকে না। কিন্তু জীন?! মুসলিম হিসেবে সে জীন বিশ্বাস করে। সাবিদের এসব বিষয়ে খুব আগ্রহ তাই সে মাঝেমধ্যেই জমিদার বাড়িতে যেতে চাইতো। কিন্তু কখনও যাওয়া হয়ে উঠেনি। কখনও তার মধ্যে ভয় কাজ করত আবার কখনও বাড়ির সবাই বাঁধা দিত।
সাবিদের বয়স যখন দশ বছর তখন ঐ জমিদার বাড়িতে আর একটি দূর্ঘটনা ঘটে। এক ব্যক্তির বিভৎস্য লাশ জারুল গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। লাশটির একটি চোখ ছিলনা। একটি আপেলে প্রথম কামড় দিলে যেমন আকৃতি ধারণ করে, ঠিক তেমনি ঐ লাশের মাথার একপাশ এমন ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল কেউ হয়ত মাথার একপাশ মস্তক সহ কামড় দিয়ে খেয়ে ফেলেছে। আর মুখটা থেঁতলানো, মনে হচ্ছিল কেউ বার বার পাথর বা ইট দিয়ে মুখের এমন হাল করেছে। মৃত লোকটির নাম ছিল সোহান সে এই গ্রামেই থাকে। তবে কয়েকদিন যাবৎ তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পুলিশ কর্মকর্তা লাশটি এসে নিয়ে যায় এবং বলে যায় লোকটি ধর্ষনের আসামি তিনদিন যাবৎ পলাতক ছিল আজ তার লাশ পাওয়া গেল।
এই ঘটনার তিনদিন পর আর একটি লাশ পাওয়া যায়। সে লাশটি ছিল সুজনের। সুজন আর সোহান খুব ভালো বন্ধু ছিল। সুজনের লাশেরও একই অবস্থা ছিল- মুখ থেঁতলানো, চোখ নেই আর মাথার একটু অংশ কামড়ে নেওয়া। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখে গ্রামের সবাই ভয় পায়। সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিল নাহিদ। সে ছিল সুজন আর সোহান এর সঙ্গসাথী।
নাহিদ, আকবর আলীর একমাত্র ছেলে। আকবর আলী এই গ্রামের একজন প্রভাবশালী ব্যাক্তি। বাবার প্রভাব খাটিয়ে নাহিদ সবার সাথে খারাপ আচরণ করতো। কিন্তু সে এভাবে ভয় পাবে ভাবতে পারেনি কেউ। আকবর আলীও কিছুটা ভয় পেয়েছিল তাইতো ছেলেকে অন্য শহরে পাঠিয়ে দেয়। তারপর থেকে নাহিদ আর আসেনি এই গ্রামে। এই দুই লাশের ঘটনার তদন্ত করতে এসেই প্রশাসন এর দুই সদস্যের মৃত্যু হয় তারপর আর কেউ আসেনি তদন্ত করতে। তারপর আরো কয়েকজন এর লাশ পাওয়া যায় ঐ জারুল গাছে।
এসব ঘটনার মাঝে একটি ঘটনা ঘটে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তখন সাবিদের বয়স আনুমানিক পনেরো হবে। রিয়াদ নামের লোক একদিন হঠাৎ ভোর বেলায় ভূত ভূত বলে চিৎকার করতে গ্রামের স্কুলের মাঠে এসে অজ্ঞান হয়ে যায়। গ্রাম ছোট হওয়ায় সকল মানুষ জড়ো হয় সেখানে। ততক্ষণে সকাল এর সূর্য উদয় হতে শুরু করেছে। রিয়াদ এই গ্রামেই থাকে। তার চুরির অভ্যাস ছিল। তবে নিজের গ্রামে না, চুরি করত অন্য গ্রামে। তাই গ্রামের মানুষ অনেক বুঝানোর পর আর কিছু বলত না। সবাই রিয়াদকে ছিচকা চোর হিসেবেই জানে।
জ্ঞান ফিরলে সবাই তাকে জিজ্ঞেস করে কি হয়েছে? কিন্তু সে কিছুই বলতে পারছিল না। বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিল। গ্রামের কেউ একজন এসে পানি পান করানোর পর রিয়াদ কিছুটা স্থির হয়। তখন সে বলতে শুরু করে, কথা গুলো বলার সময় তার সারা শরীর কাঁপছিল।
রিয়াদের কথায়, ‘পাশের গ্রাম থেকে আসার সময় দূর থেকে লক্ষ্য করলাম কেউ একজন হেঁটে জমিদার বাড়ির দিকে যাচ্ছে। সম্ভবত সে পুরুষ! সম্ভবত না, সে পুরুষ ই ছিল।’- জোর দিয়ে বলল রিয়াদ।
‘তারপর আমিও পিছু পিছু যাওয়া শুরু করলাম। কিন্তু বাড়ির কাছে যেতেই দেখি কোথাও কেউ নেই, আমার খুব ভয় করতে থাকে। বাড়িতে ফেরার জন্য যখন পিছনে পা বাড়াব, তখনই জমিদার বাড়ির পাশের জারুল গাছটা বাতাসে নড়তে থাকে।কিন্তু দূরের সব কিছুই স্থির, কোথাও বাতাসের নাম মাত্র নেই!’
‘হঠাৎ জারুল গাছ এর উপর থেকে সাদা কাপড় পড়া একটি অবয়ব বাতাসে ভাসতে ভাসতে নিচে নামে। তাকে দেখেই চিৎকার করে আমি মাটিতে পড়ে যাই। সাদা কাপড় পড়া অবয়বটি একটি মেয়ের যার মুখের একপাশ থেঁতলানো, চোখ এর জায়গায় গর্ত আর পোকামাকড় কচকচ শব্দ করে তার গাল এর মাংস খাচ্ছে। চোখের কোটর থেকে মাকড়সা আর পোকামাকড় বেরিয়ে আসছে। কিন্তু মুখের অপর পাশ অক্ষত। তখন আমার কলিজা শুকিয়ে যায়। আমি প্রানপণে দৌঁড়াতে থাকি, পেছনে ভয়ে আর তাকেইনি।’ রিয়াদের কথাগুলো শুনে গ্রামবাসীর গলা শুকিয়ে যায়। অন্যদিকে কথাগুলো বলে রিয়াদ আরেক দফায় জ্ঞান হারায়।
এই ঘটনার তিনদিন পর তীব্র জ্বরে মারা যায় রিয়াদ। রিয়াদের হৃদয়বিদারক মৃত্যুর ঘটনাটি গ্রামের সবার মনের ভিতর গেঁথে পরে। মৃত্যুর আগে সে অনেক বার একটি কথা বিড়বিড় করে বলত যে, আগেও কোথাও এই অবয়বের মানুষটিকে দেখেছে সে।
সাবিদ এই ঘটনা কে ‘হ্যালোসেলুশন’ ভেবে এড়িয়ে যেতে চেয়েও এড়াতে পারল না। তার মনে যেন সেই অবয়বটি দেখার আগ্রহ আরো বাড়তে থাকে। এই ঘটনার পর চলে যায় সাত বছর। এর মাঝে কয়েকবার চেষ্টা করেছিল সাবিদ ঐ জমিদার বাড়িতে যাওয়ার কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হয়ে উঠেনি। তারপর চাকরি পেয়ে শহরে বসতী গড়ে সে।
সাবিদ গ্রামে এসেছে আজ চারদিন। এখন আর ঐ জারুল গাছে কারো লাশ ঝুলে থাকেনা। আশ্চর্য হলেও গ্রামের সবাই একটি বিষয় খেয়াল করেছে, আজ পর্যন্ত যাদের লাশ ঐ জারুল গাছে পাওয়া গিয়েছিল তারা কোনো না কোনো অপকর্মের সাথে জড়িত ছিল।
সাবিদ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, জমিদার বাড়ি আর জারুল গাছের রহস্য জেনে তবেই ফিরবে শহরে। আজকে রাত্রেই বেরিয়ে পড়ল জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। জমিদার বাড়ির কাছে আসতেই কারোর কন্ঠ শুনতে পেলো সে। এই কন্ঠের সাথে পূর্ব পরিচিত সাবিদ। যে দিকটা থেকে শব্দ ভেসে আসছিল সাবিদ সেদিকে আগাতে লাগলো। সে দিকটায় জারুল গাছটি অবস্থিত।
সাবিদের উপস্থিতির টের পেয়ে একটি ছায়া জারুল গাছের পিছনে লুকিয়ে পড়ল। তখন সাবিদের আরো আগ্রহ হতে লাগলো সাথে ভয়ও পেতে লাগলো। সে ভাবলো কোনো চোর তার উপস্থিতি বুঝতে পেরে গাছের পেছনে লুকিয়েছে।
সাবিদ সাহস করে সামনের দিকে আগাতে থাকলো তখন লক্ষ্য করলো একটি মেয়ে কিছু খাচ্ছে। সে ভালো করে মেয়েটির হাতের দিকে তাকালো। মেয়েটির হাতে একটি জীবন্ত মুরগি, আপন মনে মুরগির মাথা কামড়ে চিবাচ্ছে মেয়েটা। মুরগিটা ডানা ঝাপটাচ্ছে তখনও। সাবিদের হাত পা তখন কাপা শুরু করেছে। মেয়ের অবয়বটি হাত বাড়িয়ে বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে সাবিদকে বলল নে খা! কিন্তু সাবিদকে দেখেই অবয়বটি যেন হাওয়ায় মিলে গেল। ততক্ষণে সাবিদ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।
সাবিদের জ্ঞান ফিরলে সে তার রুমে নিজেকে আবিষ্কার করে। বাবা-মার থেকে জানতে পারে সাবিদের বড় ভাই তাকে বাড়ির উঠোনে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় পেয়ে ঘরে নিয়ে আসে। সাবিদ গতকাল রাতের ঘটনা কাউকে জানায় নি। কারণ বাবা-মা জানতে পারলে দুশ্চিন্তা করবে। আজ তার হাড় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এসেছে। রাতে ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে সাবিদ।
অশরীরী কোনো কিছুরি টের পেয়ে হঠাতিই সাবিদের ঘুম ভেঙে যায়। চোখের সামনে ভেসে উঠলো মুরগি খেকো সেই মেয়ের অবয়বটি। তাকে উদ্দেশ্য করে বলছে, ‘এইবার এর মতো বেঁচে গেলি! পরেরবার আর প্রাণে বাঁচতে পারবি না।’
সাবিদ ঘুম থেকে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে, এতক্ষন সে স্বপ্ন দেখছিল! সাবিদের পুরো শরীর ঘামছে। সাবিদ পানি পান করে আবার শুয়ে পড়ল কিন্তু চোখে ঘুম নেই। সারারাত সজাগ থেকেই রাত কাটালো। সকালে উঠে অনুভব করলো তার শরীরে আর জ্বর নেই। কিন্তু সাবিদের মাথা থেকে গতকাল এর স্বপ্নে বলা কথা গুলো যাচ্ছে না। বারবার সেই মেয়ের কথাগগুলোই চিন্তা করছে সে।
সাবিদ এখন আর গতকাল দেখা স্বপ্নের চিন্তা করতে চাচ্ছে না। তার মাথায় এখন অন্য চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। ‘ঐ মেয়ের অবয়বটি যে তার খুব পরিচিত। তাহলে কি সে নিখোঁজ হয়নি? আর ঐ কন্ঠস্বর যেটি গতকাল রাতে জমিদার বাড়িতে শুনতে পেয়েছিল। যে তার উপস্থিতি টের পেয়ে গাছের পেছনে লুকিয়ে পড়েছিল! তাহলে কি সেও সবকিছু জানে? জানলে আমাদের বলেনি কেন?’ বিভিন্ন চিন্তায় সাবিদের মাথা ঘুরপাক খাচ্ছে। ‘আজ পর্যন্ত যাদের লাশ জারুল গাছে পাওয়া গেছে তাদের কে খুন করেছে? তারা দুইজন মিলে করেনি তো?কিন্তু কেন? তাহলে জমিদারকে কে মেরেছিল?তখন তো তারা ছিল না!’
জমিদার এর মৃত্যুর ঘটনা সাবিদ শুনেছে, কিন্তু এরপর যখন আবার জারুল গাছে লাশ পাওয়া যায় তখন সাবিদ এর বয়স দশ বছর। এর আগে কোনো লাশ পাওয়া গিয়েছিল কিনা সাবিদের মনে হচ্ছে না। আরে হ্যাঁ! সে যখন নিখোঁজ হয় তার কিছুদিন পরেই জারুল গাছে সোহান এর লাশ পাওয়া গিয়েছিল!
‘জানতে হবে, সব জানতে হবে’- বিড়বিড় করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে সাবিদ তার বাবা সেলিম রেজার কাছে যায় ।
‘বাবা! জমিদার এবং তার চ্যালাদের কে বা কারা মেরেছিল, তা কি পরে কেউ জানতে পেড়েছিল ‘- সাবিদ তার বাবাকে জিজ্ঞেস করলো।
‘আজ হঠাৎ এই প্রশ্ন!’- সাবিদকে উদ্দেশ্য করে তার বাবা বলল।
‘না এমনি, জানতে ইচ্ছে করছে আর কি!’- সাবিদের সহজ স্বীকারোক্তি।
রেজা সাহেব বলতে শুরু করলেন, ‘জমিদার মারা যাওয়ার পর কয়েকটি বাচ্চা ছেলে খেলা করতে করতে ঐ জমিদার বাড়িতে ঢুকে যায় তখন তারা একটি চিঠি পায়।’
‘ঐ চিঠিতে কি লিখা ছিল?’- সাবিদ জিজ্ঞেস করলো।
‘জমিদার কাশেম সিদ্দীকীর ছেলে করিম সিদ্দীকী তার বাবার অপকর্মের জন্য তাকে এবং তার কর্মচারীদের মেরে তার মা শাহনাজ বেগমকে নিয়ে চলে যায়। এসবই উল্লেখ ছিল ঐ চিঠিতে। গ্রামের সবাই চিঠির লেখাগুলো বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল কারণ তখন জমিদারের স্ত্রী আর ছেলের লাশ পাওয়া যায়নি।’- রেজা সাহেব বললেন।
রাত অনেক হয়েছে কিন্তু সাবিদের চোখে এক ফোঁটাও ঘুম নেই। কারণ সে জানে তার ধারণা সত্য হলে ঐ কন্ঠস্বর এর লোকটি আজকেও জমিদার বাড়িতে যাবে।
দরজায় হঠাৎ আওয়াজ পেয়ে সাবিদ উঠে বসে। কারোর স্পষ্ট পায়ের আওয়াজ। সাবিদ যা ধারণা করেছে তা একটু একটু করে সত্য হচ্ছে। কেউ বাড়ি থেকে বের হয়েছে!
সাবিদ তার পিছু পিছু হাঁটছে। পিছু নিতে নিতে সাবিদ চলে আসছে জমিদার বাড়ি। যা ভেবছিল তাই হয়েছে এখন যে তাদের সাথে সরাসরি কথা বলতে হবে।
‘শাহিন ভাই তুই এখানে! তার মানে ঐ কন্ঠস্বর তোর ছিল!’
‘সেতু আপা তুমি বেঁচে আছো!তাহলে ঐদিন তুমি নিখোঁজ হওনি?কথাগুলো বলতে বলতে সাবিদ সেতুকে জড়িয়ে ধরতে যায়। কিন্তু সাবিদের হাত দুটি সেতুর অবয়ব এর ভেতর দিয়ে তা আবার সাবিদ এর কাছে ফিরে আসে ‘
‘ও আর বেঁচে নেই সাবিদ!’- পাশ থেকে শাহিন বলল।
সাবিদ বুঝতে পারছে না অবয়বটিকে কি নাম দিবে, রুহ নাকি অতৃপ্ত আত্মা!
সাবিদের বড় ভাই শাহিন। সেতু তাদের মামাতো বোন। নিজের বোন না থাকায় সেতুই আপন বোনের মতো ছিল সাবিদদের। সেতু ছিল সাবিদের খুব কাছের একজন মানুষ। মন খারাপ হলেই সাবিদ সেতু আপার কাছে চলে যেত।
শাহিন আর সেতু দুইজন দুইজনকে পছন্দ করতো। তাইতো দুই পরিবার তাদের বিয়ে দিতে রাজি হয়। কিন্তু সেতু আর শাহিনের বিয়ের আগেরদিন রাতে নিখোঁজ হয় সেতু। অনেক খোঁজাখোঁজির পরও তাকে পাওয়া যায়নি। কিন্তু এতবছর পর তাকে এভাবে পাওয়া যাবে সাবিদ ভাবতে পারেনি।
‘তোমার এমন পরিণতি কি করে হলো সেতু আপা।’- সাবিদ সেতুর অবয়বটিকে জিজ্ঞেস করলো।
‘বিয়ের আগেরদিন রাতের বেলা বাড়িতে আমি একা, আব্বা-আম্মা তোদের বাড়িতে গেছে কি যেন কথা বলতে। তখন রিয়াদ আমায় খবর দেয়, শাহিন ভাই আমার জন্য জমিদার বাড়ির পাশে অপেক্ষা করছে। আমি অবাক হয়েছিলাম।জমিদার বাড়ির কাছে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করলাম, কিন্তু শাহিন ভাই এর খবর নাই। তখন রাগে চলে আসছিলাম তখন পেছন থেকে কেউ হাত ধরলো। পিছনে ফিরে দেখি নাহিদ।’
‘নাহিদ ভাই তুমি এখানে?’- আমি জিজ্ঞেস করলাম।
নাহিদ ভাই হাসতে হাসতে জবাব দিল ‘হুমম, তোরে ত আমিই ডেকে পাঠাইলাম।’
‘কি! আমি অবাক হলাম। চলে আসতে চেয়েছিলাম কিন্তু নাহিদ ভাই আমার মুখে চাপা দিয়া ধরে, যেন আমি চিৎকার দিতে না পারি। নাহিদ জানোয়ারের বাচ্চার মেয়েদের প্রতি নজর ছিল তা জানতাম কিন্তু তার নজর যে আমার উপর পড়েছে তা বুঝতে পারিনি।’
‘নাহিদ আমাকে চুলের মুঠি ধরে জমিদার বাড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে আগের থেকেই সোহান আর সুজন উপস্থিত ছিল। আমার বুঝতে বাকি ছিল না যে আমার সঙ্গে কি হতে চলেছে। অনেক চেষ্টা করলাম নিজেকে ছাড়ানোর কিন্তু তাদের সাথে পেরে উঠলাম না। তারপর হাত জোড় করে বললাম কাল আমার বিয়ে, আমাকে ছেড়ে দেন ভাই।’
‘এই কথা শোনার পর সুজন বুকে লাথি দিয়ে বলল, মাগি এত ভাই ভাই করবি না।’
‘নর পিশাচগুলো অট্টহাসি দিচ্ছে। অনেক কান্নাকাটি করলাম, পায়ে পড়লাম কিন্তু ঐ হারামির বাচ্চারা আমাকে ছাড়লো না। এক জনের পর একজন!’ কথাটা বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সেতু আপার অতৃপ্ত আত্মা।
সাবিদের বুঝতে কিছু বাকি রইলো না কি হয়েছিল ঐ অভিশপ্ত রাতে।
সেতু আবার বলা শুরু করলো, ‘ওরা চলে যাচ্ছিল আমার নিস্থেজ দেহটা রেখে, তখন সুজন বলে উঠে ও যদি সবাইকে বলে দেয়! কথাটা বাকি দুইজন এর কানে বেজে উঠে। নাহিদ তখন কিছু খুঁজতে শুরু করে। এরপর একটা ইট দিয়ে আমার মাথায় বারবার আঘাত করতে থাকে নাহিদ। ততক্ষণে দেহ থেকে প্রাণ বেরিয়ে যায়। তিনজন মিলে আমার দেহটা পুঁতে রাখে জারুল গাছের নিচে।’
কথাগুলো শোনার পর শাহিন আর সাবিদের চোখ দিয়ে অঝোরে পানি ঝড়ছিল।
‘সেতুকে হারানোর পর এ দিকটায় খুব টানত আমায় তাইতো একদিন হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছিলাম এখানে।তখন মনে হলো কে যেনো আমার কাঁধে হাত রেখেছে, পিছন ফিরে দেখি সেতু।
সোহান আর সুজন পাপের শাস্তি পেয়ে গেছে এখন শুধু নাহিদ বাকি। নাহিদের শাস্তির মাধ্যমেই সেতু মুক্তি পাবে।’- সাবিদকে উদ্দেশ্য করে শাহিন কথাগুলো বলল।
‘তাহলে এখনো ওকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে কেন শাহিন ভাই?’- রাগের স্বরে সাবিদ বলল।
শাহিন যেন কিছুটা স্বস্তি পেল।
‘আজ বারো বছর যাবৎ নাহিদ গ্রামে আসছে না। আমি অনেক চেষ্টা করেছি ওকে গ্রামে আনার কিন্তু সফল হয়নি। হয়ত সে বুঝে গেছে সোহান আর সুজনের মৃত্যুর রহস্য।’ শাহিন বলল।
‘সেতু আপা তুমি চিন্তা করো না, তোমাকে মুক্তি দেওয়ার দায়িত্ব এখন আমারও।’- এই কথা বলে সাবিদ শাহিনকে নিয়ে চলে এলো।
অনেকদিন পর নাহিদ গ্রামে আসছে। তার মুখে চিন্তার এবং ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। নাহিদকে কেউ একজন খবর দিয়েছে তার বাবা আলী আকবর মৃত্যু শয্যায় শায়িত। অনেক চেষ্টা করেও বাবার সাথে যোগাযোগ না করতে পেরে সে নিজেই তাড়াহুড়ো করে বাড়িতে এসেছে।
এই বারো বছরে আলী আকবর সাহেব অসুস্থ হলেও গ্রামের ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ খেয়ে সেরে উঠতো। তাই নাহিদের আর আসতে হয়নি। কিন্তু বাবা মৃত্যু শয্যায় তাই আর না এসে পারেনি। মা মারা যাওয়ার পর তার বাবাই তাকে আগলে রেখেছে। নাহিদ গ্রামে এসে অবাক হয় কারণ তার বাবা পুরোপুরি সুস্থ। নাহিদ তার বাবাকে কিছু জানায়নি কারণ তিনি অনেক খুশি আজ তাকে পেয়ে। এতবছর পর ছেলে নিজের বাড়িতে এসেছে।কিন্তু নাহিদ এর ভিতর যেন অজানা ভয় কাজ করছে।
আলী আকবর সাহেব পাগলের মতো ছুটাছুটি করছেন। সন্ধার পর থেকে নাহিদকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি লোক নিয়ে জমিদার বাড়ি এবং গ্রামের আশেপাশে খুব খোঁজাখুঁজি করলেন কিন্তু ছেলেকে না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। উনার চোখে কান্না স্পষ্ট, সে যে তার একমাত্র মা মরা ছেলে। নাহিদের ভবিষ্যৎ এর কথা চিন্তা করে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেননি। আজ এতবছর পর নাহিদ গ্রামে আসছে আর সন্ধ্যা থেকেই তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ছেলের কোনো বিপদ হয়েছে কিনা চিন্তা করে তিনি কান্না করছেন।
সাবিদ আর শাহিন চেয়ারের দিকে তাকিয়ে আছে আর হাসছে। শাহিন এর আবদার রাখতেই নাহিদকে একটা চালা ঘরে রাখা হয়েছে। সেতুর হাতে দেওয়ার আগে শাহিন নিজে নাহিদকে কিছু শাস্তি দিতে চায়। তাইতো নদীর পাশে পরিত্যক্ত একটি চালা ঘরে লোক চোখের আড়াল করে নাহিদকে নিয়ে এসেছে সাবিদ। নাহিদকে চেয়ারের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে। আর তার চিৎকার যেন কারো কানে না পৌঁছায় সে ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
শাহিন আজ হিংস্র হয়ে গেছে নাহিদকে সামনে পেয়ে।তার শাস্তি প্রক্রিয়া যে কিছুক্ষন এর মধ্যে শুরু করবে সে প্রস্তুতি নিচ্ছে শাহিন।
শাহিন নাহিদের সামনে গিয়ে তার হাত ধরে জিজ্ঞেস করে, ‘তুই এই হাত দিয়ে সেতুর গায়ে হাত দিয়েছিলি?’
কথাটা বলেই নাহিদের নখ গুলো একটা একটা করে তুলে নেয় শাহিন! নাহিদ চিৎকার করে কান্না করছে কিন্ত মুখে কাপড় দিয়ে বেঁধে দেওয়ায় কোনো আওয়াজ হচ্ছে না।
শাহিন এখন মনের শান্তিতে হাতুড়ি দিয়ে নাহিদের আঙ্গুল গুলো পিষে দিচ্ছে। নাহিদ ছটফট করছে কিন্তু সে দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই শাহিন বা সাবিদ কারোরই।
শাহিন নাহিদের চোখর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই এই চোখ দিয়ে সেতুর দিকে কু নজর দিয়েছিলি?’ কথাটা যেন পুরোপুরি শেষ না করেই বাম চোখের ঠিক সামনে পেরেক রেখে হাতুড়ি দিয়ে নাহিদের চোখের ভিতর ঢুকিয়ে দেয়। নাহিদের গোঙ্গানির শব্দ কানে আসছে সাবিদ আর শাহিনের। আজ দুই ভাই-ই নাহিদকে পেয়ে হিংস্র হয়ে উঠেছে। নাহিদকে এখন যে কেউ দেখার সাথে সাথে ভূত ভেবে জ্ঞান হারাবে।
সাবিদ শাহিনকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘অনেক হয়েছে, ওকে এখন সেতু আপার কাছে রেখে আসি না হলে আপার মুক্তি হবেনা।’ শাহিন করুণ দৃষ্টিতে সাবিদের দিকে একবার তাকালো তারপর নাহিদকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি হলো।
শাহিন সেতুর দিকে তাকিয়ে আছে। আজকের পর আর কোনোদিন তার প্রিয়তমার দেখা মিলবে না। তা ভেবেই শাহিন এর চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। সাবিদ শাহিনকে নিয়ে চলে এলো কারণ এখন যা হবে তা দেখে সহ্য করার ক্ষমতা তাদের মাঝে নেই।
পরেরদিন সকালে নাহিদ এর লাশ পাওয়া গেল জমিদার বাড়ির জারুল গাছে। তার গায়ে খোদাই করে লিখা ছিল ‘মুক্তি’। সাবিদ লাশটি দেখে মনে মনে হাসছে কারণ প্রকৃতির আদালতে সঠিক বিচার পেল সেতু নামক মেয়েটি।

( সমাপ্ত)

Date: October 3, 2020
Time: 1:22 am