বৃদ্ধাশ্রম

বৃদ্ধাশ্রম

October 14, 2020 0 By jarlimited

সজিব রায়

অর্নব, এই অর্নব, ঘুম থেকে উঠ বাবা, স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে পরল যে,
চোখ খুলেই শুনতে পাই মা আমায় ডাকছেন, একটু ঘুম জড়ানো কন্ঠেই বললাম আর একটু ঘুমাতে দাওনা মা!!
আমার শোবার ঘরের দরজার ওপাশ থেকে মা একটু দমক এর সুরেই বললেন, বেলা ৯ টা বাজতে চলল, সেই খেয়াল আছে তর???
কি!!! আমার বেডরুমের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, ৯ টা বেজে ২ মিনিট, চটজলদি বিছানা ছেড়ে উঠে পরলাম।
দরজার ওপাশ থেকে আবার মায়ের রাগ্বত স্বর শোনা গেল, কিরে ওঠলি? তর বাবা অপেক্ষা করছে তর জন্য, তকে স্কুলে ছেড়ে দিয়ে বাজার নিয়ে ফিরবে জলদি কর।
চটজলদি স্নান করে স্কুল ড্রেস পড়ে নিলাম, রুম থেকে বেরিয়েই দেখি বাবা ডাইনিং টেবিলে বসে মোবাইলে কার সাথে যেন কথা বলছেন…
দুটো ব্রেড পিস, আর একটি ওমলেট কোনো রকমে খেলাম,মা রান্না ঘর থেকে দুধ গরম করে নিয়ে এল…
হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখি ৯ টা বেজে ৪৫ মিনিট দুধ খাওয়ার একদম সময় নেই কাধে স্কুল ব্যাগ ঝুলিয়ে নিলাম..
মা দুধ হাতে ড্রাইনিং টেবিল থেকে কিছুটা তফাতে দাড়িয়ে সমানে বলে চলছেন…কি যে করিস না তুই, একটু জলদি ঘুম থেকে উঠতে পারতি…
বাবা বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়েই বেরিয়ে পরলেন, আমি বের হলাম স্কুল ব্যাগ কাধে ….সদর দরজা নাগাদ বেরিয়েছি পিছন থেকে মা ডেকে বললেন, দেখে শুনে যাবি,সাবধানে রাস্তা পাড় হবি বুঝলি.
ওদিকে বাবা একটি রিক্সা ডেকে দাড় করিয়েছেন রাস্তায় দ্রুত হেটে রিক্সায় বাবার পাশে বসে পরলাম।
আমার স্কুল আমাদের বাড়ি হতে, ২০ মিনিটের রাস্তা তবে যদি রাস্তায় ট্রাফিক হয় তবে ৩৫ মিনিটের সময় নেয়। রিক্সায় দ্রুতই চলছে বাবার নির্দেশে। কিছুক্ষণ যাওয়ার পর রিক্সা যেইনা সদর রাস্তার মোড়ে এল দেখতে পেলাম ইয়া লম্বা লাইনে দাড়িয়ে আছে সাড়ি সাড়ি গাড়ি।
নিজেই বলে উঠলাম, আজকে ও ট্রাফিক জ্যাম!!!
বাবা বলল, তোকে বারবার বলি একটু সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠতে এটা অফিস টাইম এমন সময় জ্যাম ত হবেই।
বাবা আরেকটা কি যেন বলবেন এমন সময় দেখলাম একটু ছোট্র ছেলে আমাদের রিক্সার সামনে দিয়ে একজন অন্ধ মহিলার হাত ধরে রাস্তা পাড় হচ্ছে। ছোট ছেলেটির মা হবে হয়ত সেই অন্ধ মহিলা দুইজনের মুখের মধ্যে একটা সাদৃশ্য আছে।
বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাবা, বেশ মনোযোগ সহকারে ব্যাপার খানা লক্ষ্য করছে আর সেই ছোট বাচ্চা আর অন্ধ মহিলার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছেন।
বাবার চোখে কেমন যেন শূন্যতা খেলে যাচ্ছে, সেই ছোট ছেলে আর মহিলা রাস্তা পার হয়ে রাস্তার ওপর প্রান্তে থাকা একটা সরু গলির ভেতর ডুকে গেল। বাবা এখন ও সেই দিকেই চেয়ে আছে।
এমন হঠাৎ করেই রিক্সা চলতে শুরু করল, খেয়াল করে দেখলাম রাস্তার জ্যাম অনেকটা কমে গেছে গাড়ি চলছে তাদের গন্তব্য।
বাবা এখন ও গম্ভীর, কি যেন ভাবছে.
রিক্সাটা স্কুলের কাছাকাছি চলে এসেছে প্রায় এমন সময় বাবা রিক্সাওয়ালাকে বলল, রায়পাড়া বৃদ্ধাশ্রমে চল, আমি বিস্মিত হলাম!!
বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম বাবা, বৃদ্ধাশ্রমে কেন যাবে? আমি স্কুলে যাব না??
বাবা কিছুটা আনমনেই উওর দিল, তুই স্কুলে যেতে চাইলে নেমে পর, আমি তর ঠাম্মার( আমার মা) সাথে দেখা করতে যাব, চাইলে তুই আসতে পাড়িস.
স্কুল কামাই করতে আমার বেশ লাগে, তারপর, ঠাম্মার সাথে দেখা হয়না বিগত ৩ বছর যাবৎ। আমার যখন বয়স ৫ বছর তখন থেকেই ঠাম্মা বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন। ঠাম্মার কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম কেননা বাসায় ঠাম্মার কথা তেমন একটা উঠে না। আমার মাঝে মাঝে ঠাম্মা কে খুব দেখতে ইচ্ছে করে, ছোট বেলায় ঠাম্মা আমায় সবসময় উনার কাছে রাখতেন। আমায় অনেক আদর করতেন। তবে, কেন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন? খুব নালিশ করব আজ ঠাম্মাকে!!

দেখতে দেখতে রিক্সাটা একটা বড় গলির মোড় পেরিয়ে একটি পুরনো জীর্ন লম্বা টিনের ঘরে সামনে এসে দাড়াল। বাবা রিক্সার ভাড়া চুকিয়ে আমার হাত ধরে সেই টিনের ঘরের দিকে রওনা হলেন। প্রথমেই রঙ চটা একটা লোহার গেট পেরোলাম সেই লোহার গেটের সামনে মোটা হরফে লেখা একটি সাইনবোর্ড তাতে লেখা, ” বৃদ্ধাশ্রম”. গেট পেরোলেই চোখে পরে ছোট একটি বাগান তারপর সেই ঘর। সেই টিনের ঘরে বাড়িতে দেখলাম সাড়ি সাড়ি পনের কি বিশটি ছোট ঘর আর সেই ঘরে আর বাগানের পাশ ঘেষে দাড়ানো অনেক বৃদ্ধ মহিলা। এখানে এত বৃদ্ধ মহিলা!! তার জন্যই কি এর নাম বৃদ্ধাশ্রম??

বাবা একজন মহিলাকে বললেন, “রেণু বালা দেবির ঘরটা কোনদিকে বলতে পারেন??”

সেই বৃদ্ধা মহিলা কাপা কাপা হাতে সেই সাড়ি সাড়ি ঘরের থেকে সর্বশেষ প্রান্তে দাড়ানো একটি ঘর নির্দেশ করলেন। বাবা হনহন করে সেই ঘরের দিকে ছুটে গেলেন আমি ও পিছু পিছু গেলাম। রুমে ডুকেই চুখে পরল একটি ছোট্র বিছানা তাতে শুয়ে আছে একজন রুগ্ন মহিলা পড়নে একটি ময়লা সাদা কাপড়,,,ঘরটা ও অনেক ছোট ধুলোবালিতে ভরপুর, একটি ছোট বিছানা, একটি চেয়ার এই মাএ। বাবা বিছানার কাছে গিয়ে সেই বৃদ্ধা মহিলার শিউেরের পাশে বসে ডাকল মা,মা,…

বৃদ্ধা মহিলা একটু ভীত ভীত স্বরেই বলল, কে?
বাবা বলল, আমি তোমার ছেলে বিমল…

মহিলা মুখ ঘোরালেন…একি উনি আমার ঠাম্মা…কি রুগ্ন চেহারা, চোখ দুটি কোটরাগত, মুখটি কেমন মলিন, শরীরে যেন একবিন্দু রক্ত নেই।

ঠাম্মা বাবার মাথায় হাত রাখলেন, তুই এসেছিস বাবা।

বাবা ঠাম্মার হাত দুটি আলতো করে ধরে বলল তোমার নাতি ও তোমায় দেখবে বলে এসেছে।

কে অর্নব? বলেই আমার দিকে ফিরে চাইলেন, দাদু ভাই আয় পাশে এসে বস।

আমি কাছে গিয়ে বসলাম..উনি পরম স্নেহে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

বাবা ঠাম্মা কে বলল, তোমার কি অসুখ হয়েছে মা?

ঠাম্মা কিছুটা ম্লান হাসি হেসে উওর দিলেন, ওসব ত লেগেই আছে,
এমন সময় বাবার সেলফোনটা বেজে উঠল, বুক পকেট থেকে ফোনটা হাতে নিতেই দেখলাম মা ফোন করছে… বাবা আমার দিকে চেয়ে বলল, অর্নব তুমি তোমার ঠাম্মার সাথে গল্প কর কেমন…বলেই বাবা ফোন হাতে ঘরের বাইরে চলে গেলে…ঠাম্মা নিষ্পলক বাবার দিকে চেয়ে আছেন…

হঠাৎ কি মনে হতেই ঠাম্মা তার শিউরে নিচে থাকা বালিশ টাতে হাত দিয়ে একটা সেলফোন বের করে আনলেন..সেটা আমার হাতে দিয়ে বললেন….দেখত দাদু ভাই আমার এই ফোনটা নষ্ট হয়ে গেল কিনা???

আমি ফোনটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ নাড়াচড়া করে দেখলাম না সব ঠিকি আছে…

ঠাম্মা অবাক হয়েই বললেন, সব ঠিকি আছে????

আমি বললাম, হ্যা,

বিস্ময় জড়ানো কন্ঠেই ঠাম্মা প্রশ্ন করল, তবে দাদু ভাই, তোমার বাবা এই তিন বছরে কেন আমায় ফোন করল না????
আমি ভাবলাম আমার ফোনটাই বুঝি খারাপ হয়ে গেছে….

আমি ভাব শূন্য হয়ে বনে রইলাম, এই প্রশ্নের কি উওর হতে পারে তা আমার জানা নেই।

বারান্দা থেকে বাবার গলা শোনা যাচ্ছে সেই সাথেয় মায়ের কন্ঠ স্বর ও ভেসে আসছে ফোনের ওপাশ থেকে মা উচ্চ স্বরে চিৎকার করে কথা বলছেন, তোমার কি কান্ডজ্ঞান বলতে কিছু নেই নাকি? ছেলেটাকে স্কুল এ না নিয়ে তোমার মাকে দেখাবে বলে বৃদ্ধাশ্রমে নিয়ে এসেছে, বাজার যে করা হয়নি সে খেয়াল ও নেই তোমার……বাবা কিছু উওর না দিয়েই ফোনটা কেটে দিল…ফোনের ও প্রান্ত মা যেন আর ও কি বলছিলেন সেসব আর শোনা হলনা…

বাবা ঘরে ডুকেই যথা সম্বব হাসার চেষ্টা করেলেন, আমায় নির্বিকার ভাব দেখে কিছুটা অনুমান করলেন হয়ত যে আমরা বাবার ফোনে কথা শুনেছি। ঠাম্মার মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম ঠাম্মা কেমন যেন পাথরের চোখ নিয়ে বাবার পানে চেয়ে আছেন চোখের কোনে অশ্রুবিন্দু জমেছে।

বাবা কি বলবে বুঝে উটতে পারছিল না ঠাম্মাই প্রশ্ন করল, এবার কি আমায় নিয়ে যাবি বাবা??? তোদের কে ছেড়ে এখানে থাকতে বড্ড কষ্ট হয়রে।

বাবা বাকশূন্য হয়ে বসে আছে,,,,উওর টা না বোধক কারন বাবার মুখটা কালো হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ।
ঠাম্মা বাবার হাতটা ঝাকুনি দিয়েই বললেন, কিরে বল কিছু….

বাবা ধাতস্ত হয়ে বললেন, আসলে মা ছোট্র একটা ফ্লেট এ থাকি অর্নব ও বড় হয়ে এসেছে ঘরে মাএ দুটো রুম তোমায় কোথায় নিয়ে রাখি বলত..তার উপর বড় একটা ফ্লেট ভাড়া নেব তেমন আয় উপার্জন ও ত নেই মা।

ঠাম্মার মুখটা ক্রমশ কঠিন হয়ে আসছে দেখলাম, ঠাম্মা যেন এবার টাট্রার চলেই বললেন, জানিস খোকা তুই না খুব সত্যবাদি রে…আর আমি বড্ড মিথ্যাবাদি

বাবা চকিত হয়েই বলল, কেন মা? এমন কেন বলছ??

ছোট বেলা তুই যখন খু্ব দুষ্টুমি করতি আমি বলতাম তকে আর আজ ঘরে নেব না খাবার দেব না….কিন্তুু সন্ধ্যা ঘনাতেই হন্য হয়ে খুজে তকে ঘরে নিয়ে আসতাম। কিন্তু তুই আর বৌ মা যখন আমায় এই বৃদ্ধাশ্রমে রেখে যাস তখন আর আমায় নিয়ে যাবিনা বলেছিলি…দেখ তুই আজ ও তর কথা রেখেছিস হলিনা তুই সত্যবাদি???

কথাগুলো আমার কাছে বড্ড দুর্বোধ্য ঠেকল হয়ত বাবার কাছে ও তেমন।

ঠাম্মার ঘরে কিছুক্ষণ শোনশান নিরবতা খেলে গেল,,, বাবা ঘামছে প্রচুর সেই সাথে আমি ও…একেত টিন শেডের ঘর তার ওপর ঘরটা অনেক ছোট অধিকন্তু ঘরটাতে একটা ফ্যান ও নেই। তবে, ঠাম্মা কিন্তু এতটুকু ঘামেনি দেখে মনে হচ্ছে ওনার গরম সব সয়ে গেছে।

ঠাম্মা মায়া জড়ানো কন্ঠে বললেন, দাদু ভাই যে ঘেমে যাচ্ছিস..বলেই ঠাম্মা তার রুগ্ন হাত দিয়ে আমায় কাছে টেনে নিলেন তারপর তার শাড়ির আচল দিয়ে আমার কপালটা মুছে দিলেন।

বাবা তার পেন্টের পকেট থেকে রুমাল টা বের করে ঘাম মুছে নিলেন তারপর বললেন, এই ঘরে প্রচন্ড গরম একটা ফ্যান ও নেই দেখছি।

ঠাম্মা বললেন, বলি খোকা সময় থাকতে একটি ফ্যান লাগিয়ে নে এই ঘরটাতে,

বাবা বিস্ফারিত চোখে ঠাম্মার দিকে চেয়ে বললেন, কেন???

ঠাম্মাই উওর দিলেন,, অর্নব বড় হচ্ছে অর্নবের ফ্লেটে ও হয়ত জায়গা কম হতে পারে…তখন না তকে এখানেই আসতে হয়..তাই সময় থাকতে ফ্যানটা লাগিয়ে নে।

কথাটা শুনে বাবা স্তম্ভিত হয়ে পরলেন…তারপর আমার হাত ধরে ঠাম্মার উদ্দেশে বললেন, আজ চলি মা বেশ বেলা হয়ে গিয়েছে।

ঠাম্মা নিবার্ক বাবা হ্যাচকা টানে আমায় তুলে নিয়ে ঘর থেকে হনহন করে ছুটে চললেন…ঠাম্মার ধৈর্যের বাধ যেন ভেঙ্গে গেছে….আড়মোড়া হয়ে বিছানায় বসেছেন চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পরছে।

বৃদ্ধাশ্রমের সামনের ছোট বাগান পেরিয়ে সবে মাএ লোহার গেট এর সামনে এসে দাড়িয়েছে পিছন থেকে কান্না জড়ানো কন্ঠে ঠাম্মা বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
” দেখে শুনে যান খোকা”………

Date: October 2, 2020
Time: 1:09 pm