দাঁড়কাকের মায়া

October 14, 2020 0 By jarlimited

ইসতিয়াক আহমেদ জিহাদ

সন্ধা তারা টা সুবিশাল আকাশে উঠেছে কি উঠে নাই।সূর্যাস্তের লাল আভা টা সবে মাত্র ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে।প্যাঁ পোঁ শব্দ করে ছুটে চলছে স্বার্থপর শহরের মানুষখেকো  কুৎসিত যানবাহন গুলি।  
রাস্তার দু ধারের ফুটপাত গুলো মুখরিত হয়ে আছে মধ্যবিত্তদের দুশ্চিন্তাগ্রস্থ দুরন্ত পদভারে।হুট হাট করে দু একটা বিদঘুটে দাড় কাক উড়ে যাচ্ছে নীড়ের খোঁজে।


আতিয়া দ্রুত পায়ে হেটে চলছে। একটু দেরি হলেই বাস টা মিস হয়ে যাবে ।তখন আবার কয়েকটা টাকা বেশী ভাড়া দিয়ে রিকশা করে যেতে হবে।
পুট করে শব্দ হয়ে আতিয়ার সেন্ডেলের ফিতে টা ছিড়ে গেল।এই নিয়া ১০ বার ছিড়ল।প্রত্যেকটা ফিতেতেই ইতিমধ্যে তিনবার করে সেলাই পড়ে গেছে।
কিহ আর করা ! আতিয়া জুতা জোড়া খুলে খবারের ব্যাগে রেখে দিল।বাড়িতে গিয়ে তার বাবার কাছ থেকে সেলাই করে নিবে।শুধু শুধু টাকা খরচ করার কি দরকার।এমনতেই অভাবের সংসার।তার একার উর্পাজনের উপর বেচেঁ আছে তার বাবা,রুগ্ন মা,ছোট ছোট দুটা ভাই বোন।
এই সন্ধায় বাস গুলো একেবারে লোকজনে ঠাসা থাকে।আতিয়ার এসব বাসে ঝুলে যেতে একদম ভালো লাগে না।বাসের সব লোক কেমন যেন ড্যাব ড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে ।আর বসার জায়গা না পেয়ে যখন দাড়িয়ে যেতে হয় তখন কত লালায়িত পুরুষ যে তার শরীরে হাত দিয়ে তাদের পৌরুষত্বের জানান দেয় তার হিসাব নেই।প্রথম প্রথম খুব অস্বস্তি লাগত অপমান বোধ তার ভিতর টাকে কুড়ে কুড়ে খেত।কিন্তু এখন ওসব গা সওয়া হয়ে গেছে ।আতিয়া মেনেই নিয়েছে যেন এটাই স্বাভাবিক শিক্ষিতদের এই ভদ্র সমাজে।
আজও বাসে সিট পেল না আতিয়া।পুরো বাস মানুষে গিজ গিজ করছে।অতি কস্টে একটু ঠেলে ঠুলে জায়গা করে দাড়ালো সে।নিত্যকার ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে বেশি সময় লাগল না।শরীরের সব স্পর্শকাতর জায়গা গুলতে চলতে থাকল পশুদের খস খসে হাতের অবাধ বিচরণ।আজ কেন জানি আর সহ্য হল না আতিয়ার।অসস্থিতে পুরো শরীর গুলিয়ে উঠল ।কোন রকমে ড্রাইভার কে বাস থামাতে বলেই নেমে পড়ল বাস থেকে।
পাশের ডাস্টবিনের কাছে যেতেই শরীর গুলিয়ে সব বাইরে বেরিয়ে আসল।
মাথা ধরে ঝিম মেরে ফুটপাতে কিছুক্ষন বসে থাকল আতিয়া।

সে ভেব পেল না কেন সে এই পশুদের বিরোধিতা করছে না?

কিসের আশায় সে নীরবে সব সহ্য করে যাচ্ছে ?

সে ভালো করেই জানে তার অভাবের এই অন্ধকার জীবন কখনই সুখের আলো দেখবে না।তবে কেন সে পশুদের হাতে বারবার নির্যাতিত হবে ?

 কেন মুখ বুজে সব সহ্য করে যাবে?
নাহ এ কিছুতেই হতে পারে না।
পাশের দোকান থেকে ৫ টাকায় একটা শার্প ব্লেড কিনে হাতের মুঠোয় রেখে দিল আতিয়া।

নতুন আরেকটা বাসে উঠল।এবারও বসার জায়গা না পেয়ে দাড়িয়েই থাকলো।

আবারও পশুদের অত্যাচার শুরু হল।কিন্তু এই আতিয়া তো সেই আতিয়া না ।ক্রোধে ধিক ধিক করে চোখ জোড়া জ্বলে উঠল আতিয়ার ।ব্লেডের খোসা ছাড়িয়ে সজোরে চালিয়ে দিল।
পশুটার হাত ফেরে ফিনকি দিয়ে পড়া শুরু হল রক্ত।পশুটার গগনবিদারী চিৎকারে ড্রাইভার ব্রেক কষল।তাল সামলাতে না পেরে হুমরি খেয়ে সামনে পড়ে গেল আতিয়া ।শুধু একটা কথা কানে আসল তার।

পকেটমার ! পকেটমার !

পকেট কাটতে গিয়ে হাতে ক্ষুর মেরেছে।
এরপর অতিয়ার পুরো শরীরের উপর চলতে থাকল অবিরাম কিল ঘুসি লাথ্থি।

অতিয়া অতি কষ্টে চোখ দুটা মেলে নিজেকে আবিষ্কার করল একটা রোড লাইটের নিচে ।তার ওড়নাটা দিয়ে পিছমোড়া করে বেধে রাখা হয়েছে তাকে।চারদিকে গোল হয়ে দাড়িয়ে আছে কিছু উৎসুক মানুষ।
আতিয়া হাটু দূটোকে বুকের কাছে মুড়ে নিয়ে বুকটা আড়াল করে রাখল উৎসুক জনতাদের থেকে।
একটু পরেই একজন এসে তার চুলে ঘ্যাচ ঘ্যাচ করে কাচি চালাতে লাগল ।এক গোছা করে চুল ফুটপাতে পড়তে থাকল আর আতিয়ার বুক টা ফেটে যেতে থাকল তীব্র যন্ত্রনায়।
আতিয়া চিৎকার করে বাধা দিতে চাইল ।কিন্তু একটু শব্দ ও গলা দিয়ে বের হলো না।আর একবার চেস্টা করতেই বেড়িয়ে এল তাজা রক্ত।
অপমান আর যন্ত্রনায় চোখ থেকে ঝরতে থাকল অশ্রু।যে অশ্রুর থামবার কোন নাম নেই।সোডিয়াম লাইটে চিকচিক করে জ্বলতে থাকলো মুক্তার মত।

রেলস্টেশনের পাশের ডাস্টবিন থেকে অধখাওয়া একটা রুটি ঠোটে করে নিয়ে মোমেনা পাগলীর কাছে গিয়ে ফেলল একটা দাড়কাক।গাপুস গুপুস করে পরম শান্তিতে সেই রুটি ছিড়ে খেতে লাগল মোমেনা পাগলি ।

Date: Sat, Oct 3, 2020 at 11:44 AM

ছায়াময়ীর_অট্টহাসি

লেখক:-ইশতিয়াক আহমেদ
,
কুৎসিত ভুতুরে লাইট টা টিম টিম করে জ্বলছে।
হিম শীতল ঠান্ডা
তারই মাঝে বিভৎস গা গোলানো ভ্যাবসা একটা গন্ধে মঁ মঁ করছে হলুদ রঙ্গা অভিশপ্ত চারদেয়ালী ঘরটা।ঘরটার দেয়াল গুলো ক্যানজানি আশ্চার্য রকম পরিষ্কার ।দেয়ালে নেই লিকলিকে চার পেয়ে টিকটিকি কিংবা পিলে চমকানো ছয় পেয়ে তোলাপোকা অথবা বিধঘুটে গা গোলানো মাকড়শা।
অদ্ভুত রকমের নিরাবতায় মোহাবিষ্ট ঘরের প্রতিটা কোণা প্রতিটা টাইলস দেয়ালের অতি সুক্ষ্ণ প্রতিটা ফাটল।
,
রাতুল পিট পিট করে চোখের পাতা জোড়া নাড়া চারা করছে।কিছুক্ষনের মধ্যেই নিকষ অন্ধকারের সাথে মানিয়ে নিল তার নিস্প্রান চোখ জোড়া।
সে জানে এখন ৭.৪৯ বাজে
প্রতিদিন ই সে এই নিরব নীরামিষ সন্ধায় জেগে ওঠে।
এই ট্যাপ খাওয়া ময়লার অস্তরন পরে কালো হয়ে যাওয়া ড্রয়ারটা খুলার সাধ্য নেই তার।
তবে ড্রয়ার টা ভেদ করে সে দেখতে পারে।
এই অলৌকিক বিষয়টা রাতুল সেদিন ই বুঝতে পেড়েছে যেদিন কয়েকজন ডাক্তারের উপস্থিতিতে আক্কাস ও তার সহকারী ২৭ নাম্বার ড্রয়ারটাতে রেখেছিল তার নিথর দেহটাকে।
রাতুল ড্রয়ারটা ভেদ করে স্পষ্ট দেখতে পারছিল তাকে একলা রেখে সবাই চলে যাচ্ছে
তবে পরে অবশ্য তার এ ভুল টা ভেঙ্গেছে
তার ড্রয়ারের মত আরও ২৯ টা ড্রয়ার আছে এখানে প্রত্যেকটিতেই আছে তার মত নিষ্প্রান কেউ না কেউ
,
রাতুল রুমের ভিতর চোখ রাখতেই দেখল আক্কাস জিপার টেনে প্যান্টের বেল টা ঠিক করে ২১ নাম্বার ড্রয়ার টা লাগিয়ে দিল ।মেঝেতে ক্যান জানি এক ধরনের তরল পরে আছে।
গত ছয়দিনে এই দৃশ্যটা তার কাছে পরিচিত হয়ে গেছে।রাতুল জানে এখন ঐ ড্রয়ার থেকেই রিন রিনে অতি তিক্ষ্ণ সুরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেউ একজন কাদঁবে।
হ্যা একদম হলও তাই।।ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না শুরু হল।এতই তিক্ষ্ণ যন্ত্রনাদায়ক যে রাতুলের মৃত মস্তিষ্ক এফোর ওফোর করে দিচ্ছে।রাতুলের ক্যান জানি মনে হচ্ছে এই কান্নার সাথে সে পরিচিত কিন্তু কিভাবে তা ঠিক মনে করতে পারছে না।
উহ যন্ত্রনাটা বেড়েই যাচ্ছে ।নাহ আজ দেখতেই হবে কি আছে ঐ ড্রয়ারে।
রাতুলের হ্যাচকা টানে
ক্যার ক্যার করে ড্রয়ারটা খুলে গেল।ভিতরের মেয়ে মানুষটাকে দেখে সে একদম থ হয়ে গেল। এত সুন্দর ও কেউ হয়?
এই মেয়েই হয়তো বিধাতার সেই হুর !
এতক্ষনে আক্কাচের বিষয়টা ক্লিয়ার হল রাতুল।
কিন্তু মেয়েটা কেদেঁই চলছে
-এই মেয়ে তুমি কাদঁছ কেন?
-জানি না ,
-তাহলে কাঁন্না থামাও!
-হাহাহাহাহাহাহা!
কি ভয়ঙ্কর সুন্দর সেই অট্টহাসি ।হাসির ঝংকারে কাপছে প্রতিটা ড্রয়ার যেন এখনই হুমরি খেয়ে পরবে সবগুলো রাতুলের উপর
-হাসবেনা একদম।হাসি থামাও !
-কেন থামাবো।বেঁচে থাকতেও তো হাসতে পারি নি।আমার মৃত্যু কিভাবে হয়েছে তুমি জানো ?
জানো না ! কয়েকটা পশু পালা করে ছিড়ে ছিড়ে খেয়েছে আমাকে।ওদের লালসা মেটানোর পর ফেলে দিয়েছে চলন্ত বাস থেকে। নাহ তখনও মরিনি ।সমাজের অপবাদ অপমান কটুক্তি নির্যাতন সহ্য করার জন্য বেঁচে গেলাম।কিন্তু পারলাম না একটা ওড়না একটা সিলিং ফ্যান একটা চেয়ারের কাছে পড়াজিত হলাম।
আমার দোষ কি ছিল জানো ? আমার দোষ আমার সুন্দর একটা দেহ ছিল ।যে দেহটা মরে হওয়ার পরও সমান লোভনীয়।
-হ্যা আসলেই দুঃখজনক। আমাদের সমাজ এমনই ।কেউ ই মেয়েদের সম্মান দিতে জানে না।
-চুপ শয়তান।।তোর মত মুখোশধারী শয়াতান গুলোই দিনে নারীবাদী কথা বলে আর প্রতি রাতে নিত্য নতুন তাজা দেহের স্বাদ নেয়।তুই কি ভেবেছিস আমি তোর মৃত্যুর কারন জানি না ?
-জেনেই যখন গেছিস এবার তোর পালা
,
,
মেয়েটির মুখে রাতুলের ঘার থেকে সদ্য খাবলে নেওয়া তাজা মাংস থেকে টুপ টুপ করে রক্ত চূইয়ে পড়ছে
মেয়েটির ধারালো নখের থাবায় এফোর ওফোর হয়েছে রাতুলের পেট
ইতোমধ্যেই মেয়েটি একটা জোড়ে লাথি বসিয়ে দিয়েছে রাতুলের বিশেষ জায়গায়
তীব্র কষ্টে চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে এসেছে
ঘার ও কান বেয়ে গরিয়ে পড়ছে মরা রক্ত
আসন্ন নির্দয় মৃত্যুর যন্ত্রনায় ছিড়ে যাচ্ছে রাতুলের মৃত মস্তিষ্কের প্রতিটা কোষ
কিন্তু মৃত মানুষের মৃত্যু!
এও কি সম্ভব ?
তবে রাতুল জানে এও সম্ভব
কারন বীরপুরুষ মরে একবার কিন্তু কাপুরুষ জানোয়াররা মরে মৃত্যুর পরও হাজারবার
,
,
পরদিন প্রথম আলোর হেডলাইন
“কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আসামী রাতুলের ফাসি হওয়ার সাত দিনেও লাশ দেওয়া হয়নি পরিবারকে”