আমাদের স্বাধীনতা (প্রবন্ধ)

October 14, 2020 0 By jarlimited

মো: নাফিস উল্লা

৩রা মার্চ, ১৯৭১
আজ সকালে বেডরুমে আসতেই দেখি গাছে খুব সুন্দর একটি পাখি এসে বসেছে। বেডরুমের জানালা দিয়ে তা যেন খুব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। তবে পাখিটিকে বেশ অচেনা লাগছে। মনে হয় আগে কখনো পাখিটাকে দেখিনি। গাছে অনেক ফুলও ফুটেছে দেখছি। কিন্তু আজ এসবের কিছুই ভালো লাগছে না। আজকাল চারপাশের পরিস্থিতি মোটেই ভালো যাচ্ছে না। চারপাশে কি হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না! আজ সকালে দেখলাম পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা আমাদের ছাদ থেকে সরানো হয়েছে। তার পরিবর্তে লাল-সবুজ একটি পতাকা লাগানো হয়েছে। যা হোক! এই নতুন পতাকা আগেরটার তুলনায় বেশ সুন্দর। আমার নতুন পতাকাটি খুব ভালো লাগল।
কয়েকদিন ধরেই বাবাকে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছে :
“বুঝলি, দেশ দ্রুত একটি ভয়ংকর যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।”
“কেন বাবা?”
“তুই এসব বুঝবি না। এগুলো রাজনীতির বিষয়। তুই এখনো অনেক ছোট।”
বাবার কথার কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছি, বাবা-মা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নামের একটি মানুষ সম্পর্কে প্রতিনিয়ত কথা বলছেন। তিনি নাকি মুক্তির সংগ্রামের ডাক দিয়েছেন। আমার খুব দেখার ইচ্ছে হলো এই মানুষটাকে।

৭ই মার্চ, ১৯৭১
আজ সকালে দেখলাম বাবা খুব তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিচ্ছেন।
“কোথায় যাচ্ছো বাবা? ”
“রেসকোর্স ময়দান।”
“আমাকেও সাথে নিয়ে চলো বাবা।”
“তুই ও যাবি? আচ্ছা চল্।”
রেসকোর্স ময়দানে গিয়ে দেখলাম মাঠের কানায় কানায় লোকে ভর্তি। আমি আর বাবা মাঠের বাইরে ছোট একটি জায়গায় গিয়ে বসলাম। হঠাৎ করে দেখলাম গায়ে কালো কোট পরা একটি লোক মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছে। সবাই তাকে ঘিরে উল্লাস করছে। এ সময় বাবা বললেন,
“ইনিই শেখ মুজিব। বাংলাদেশের জাতির পিতা।”
কি বলে! বাংলাদেশের জাতির পিতা! অথচ এত সাদামাটা মানুষ! কোন দাম্ভিকতা নেই, কোন দেহরক্ষী নেই, মনে হয় যেন জনগণই তাঁর প্রাণ। এরপর একসময় জনগণের উদ্দেশ্যে তিনি ভাষণ দিতে শুরু করলেন। ভেসে এলো এক বজ্রকণ্ঠ :
“ভাইয়েরা আমার”
তিনি ভাষণ শুরু করার সাথে সাথেই উপস্থিত জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ল। কি ভরাট কণ্ঠ তাঁর! তাঁর আওয়াজ শুনতেই আমার মনে কেমন জানি অন্যরকম একটি অনুভূতি তৈরি হলো। তিনি ভাষণের মাঝে যখনই বিরতি দিচ্ছেন তখনই সবাই নানা রকম শ্লোগান দিচ্ছে। বারবার একটি আওয়াজ জনগণের কাছ থেকে ভেসে আসছে :
জয় বাংলা
আমি তাঁর বেশিরভাগ কথার কোন অর্থই বুঝতে পারলাম না। তবুও আমার ইচ্ছে করল তাদের সাথে শ্লোগান দিতে। আমিও বলে উঠলাম “জয় বাংলা”। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, আমার কাঁধে হাত রাখলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন মঞ্চ ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন তখন উপস্থিত জনতাও তাঁকেও ঘিরে ধরেছিল। তিনিও যেন বারবার তাঁর জনগণের কাছেই যেতে চাচ্ছিলেন। আমি শুধু অবাক দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তর্জনী উঁচিয়ে ভাষণ দেওয়া, জনগণের চোখে স্থির দৃষ্টি, গায়ে কালো কোট, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, মনে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার দৃঢ় প্রত্যয়,যেন সত্যিকারের ইতিহাসের এক মহানায়ক। কেন জানি হঠাৎ করে আমার মন এই মহামানবের প্রতি গভীর শ্রদ্ধায় ভরে উঠল।

২৫শে মার্চ, ১৯৭১
সকালবেলা আমি ও আমার বন্ধু তুহিন ফুটবল খেলছিলাম। তারপর আগামীকালের খেলার প্ল্যান করে বাড়ি ফিরে গেলাম। রাতে একটু দেরি করে ঘুমাতে গিয়েছিলাম ।
মাঝরাতে হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে গেল। বাইরে ট্যার ট্যার আওয়াজ শোনা যেতে লাগল। কিছুক্ষণ পরপর রাইফেলের গুলির আওয়াজ।
বাবা-মা প্রচুর চিন্তিত ছিলেন। সারারাত না ঘুমিয়ে কাটালাম। কিন্তু ভোররাতের দিকে হঠাৎ করে ঘুমে আমার দুচোখ বুজে এলো।

২৬শে মার্চ, ১৯৭১
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই দেখলাম বাবা-মা সবাই রেডিও হাতে নিয়ে খবর শুনছে। বাবার চেহারা যেন অনেকটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে বাবা কোন বিষয় নিয়ে খুবই চিন্তিত।
আমরা সবাই রেডিওর নব বারবার ঘোরাতে লাগলাম। বিবিসি, আকাশবাণী, কোনাটিই সংযোগ দিচ্ছে না। অবশেষে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র হতে শুনতে পেলাম :
“রাতে পাকিস্তানি আর্মি ঘুমন্ত বাঙালি ও পুলিশদের উপর হামলা চালিয়েছে। অনেক মানুষ নিহত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তাকে বন্দী করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।“
সর্বনাশ! তাহলে কাল রাতে আমরা যে ট্যার ট্যার আওয়াজ শুনেছিলাম, তবে কি সেটা ট্যাংকারের আওয়াজ ছিল !
বাবাকে জিজ্ঞাসা করলাম :
“এখন কি হবে বাবা?”
বাবা বললেন :
“স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা ছাড়া আমাদের হাতে এখন আর কোন পথ নেই ।”
বাবার কথা শেষ হতে না হতেই তুহিনের বাড়ি থেকে প্রচন্ড কান্নার আওয়াজ শুনতে পারলাম। ব্যাপারটা বুঝতে আর বাকি রইল না। তুহিনের বাবা পুলিশ বাহিনীতে চাকরি করতেন। কাল রাতে পুলিশ বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের সাথে তুহিনের বাবাও ছিলেন। তুহিনের বাড়ি যেতেই দেখলাম তুহিনের বাবার লাশ মাটিতে পড়ে আছে। দেখলাম তুহিনের বাবার লাশ যেন একঝাঁক গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। সারা বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেছে। এ দৃশ্য দেখে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতি আমার মন ঘৃণায় ভরে উঠল। পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কিছুটা উপলব্ধি করলাম। রাস্তায় বেরোতেই দেখি সারি সারি লাশ উপরে ফেলা হয়েছে। এখন বুঝলাম স্বাধীনতা মানে কি! আমাদের জন্য স্বাধীনতা কতটা প্রয়োজন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম এই রক্ত বৃথা যেতে দিব না। দেশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনবই।
বিকালবেলা। বাবা হঠাৎ করে তার কয়েকজন বন্ধুকে বাড়ি নিয়ে এলেন। তাদের সবার হাতে রাইফেল। আমার মাথায় বাবা হাত বুলিয়ে বললেন –
“রাজু! শোনো! যুদ্ধে যাচ্ছি। ফিরে আসতেও পারি,নাও আসতে পারি। তবে তোমরা হলে এদেশের ভবিষ্যৎ। তোমরাই এ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এ কথা সবসময় মনে রেখ।”
বাবা বিদায় নিলেন। খুব খারাপ লাগছিল। বারবার শুধু বাবার কথা মনে পড়তে লাগল।

৭ই এপ্রিল, ১৯৭১
আমি আর তুহিন ফুটবল খেলছিলাম। তুহিন এখনো তার বাবার মৃত্যুর শোক কাটিয়ে উঠতে পারে নি। হঠাৎ করে শুনলাম আমাদের পাশে দাঁড়ানো কয়েকজন লোক মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে কথা বলছে। আমরাও কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করলাম। হঠাৎ মনে হলো দেশের জন্য সবাই যুদ্ধ করতে যাচ্ছে, তবে আমরা কেন পারব না? আমরাও যাব। বড় ভাইদের এ সম্পর্কে বলতেই তারা প্রথমে মানা করে দিলেন। কিন্তু আমরা হার মানলাম না। আমাদের জোরাজুরিতে নিতে রাজি হলেন। কিন্তু শর্ত ছিল মায়ের অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু মা-তো জানলে আমাদেরকে যেতে দিবেন না। তাই আমরা দুইজনে মিলে পরিকল্পনা করলাম যে, রাতে মা ঘুমিয়ে যাবার পর আমরা দুজনে এই মাঠে দেখা করব। যাওয়ার আগে বারবার শুধু মায়ের কথা মনে পড়তে লাগল। কিন্তু মনকে শক্ত করলাম। মাকে শেষবারের মতো দেখে রওনা হলাম। কে জানে, হয়তো আর ফিরে নাও আসতে পারি। আমরা সেই রাতেই তৈরি হয়ে ভাইয়াদের পিছনে লুকিয়ে রওনা দিলাম বর্ডারের উদ্দেশে। কিন্তু বর্ডারে এত তাড়াতাড়ি পৌঁছানো সহজ ছিল না। প্রথমে এর জন্য আমাদেরকে কুমিল্লা পর্যন্ত যেতে হলো। আমরা সেখানে তিনদিন অবস্থান করলাম। এরপর আমরা সেখান থেকে লুকিয়ে বর্ডার পার করে ত্রিপুরার দিকে রওনা হলাম। সেখানে রাতে আমরা বড় একটি নদী সাঁতরে পার হলাম।আমরা কখনো মেইন রোড ধরে চলাচল করতাম না। আমাদেরকে বেশ কিছু পথ ক্রলিং করে পার হতে হতো। অবশেষে আমরা বেশ কিছুদিন পরে ভারতে পৌঁছালাম। আমাদেরকে সাথে দেখে সেখানকার অন্য মুক্তিযুদ্ধোরাও খুবই অবাক হয়ে গেলেন । ভারতের মেলাঘরে গিয়ে আমরা প্রায় দুমাস ট্রেনিং নিলাম। প্রথমে আমরা ধোঁয়া-মোছার কাজ করতাম। তারপর একদিন সাহস করে অস্ত্র হাতে নিলাম। বড় ভাইদের বললাম আমিও যুদ্ধ করব। আমরা দুজনেই অস্ত্র চালানো শিখতে লাগলাম। প্রায় দুমাস ট্রেনিং নিলাম। এরপর আমাদেরকে হঠাৎ একদিন একটি দলের সাথে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।
২৬ শে জুন, ১৯৭১
প্রায় দুমাস পর আমরা দেশে ফিরে এলাম। আমাদেরকে খুলনা জেলার একটি অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। দেখলাম পাকিস্তানি বাহিনী সব তছনছ করে দিয়েছে। সমস্ত গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে।
আমরা পাশের একটি অঞ্চলে ক্যাম্প গড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সেখান থেকে আমরা আমাদের সকল কার্যক্রম চালিয়ে যেতে লাগলাম। আমাদের দলের সবাই ছিলেন খুবই ভালো। সবাই আমাদেরকে খুবই স্নেহ করতেন। এভাবেই ক্যাম্পে আমাদের দিনগুলো কাটতে লাগল।
হঠাৎ একদিন পাকিস্তানি ক্যাম্প আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। আমরা বললাম, “আমরাও যাবো।”
দলের সবচেয়ে বড় ভাই তাসকিন আহমেদ আমাদের বললেন,
“দেখ, তোরা এখন অনেক ছোট। তোরা যাস না।”
কিন্তু আমরা নাছোড়বান্দা। অবশেষে আমাদের জেদের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদেরকে দলে নেওয়া হলো। ক্রলিং করে আমরা বিপক্ষ দলের নিকটে গেলাম। তুহিন চুপিসারে জিজ্ঞাসা করল, “ফায়ারিং শুরু হবে কখন?” আমি বললাম,“এখনই।” হঠাৎ করে ফায়ারিং শুরু হয়ে গেল। আমরাও খুব সাহসের সাথে যুদ্ধ করলাম। তিন তিনটে পাকিস্তানিকে শেষ করে দিলাম। হঠাৎ করে একদিন সাবুভাই এসে বলল,
“রাজু, দেখতো। তোর সাথে কে যেন দেখা করতে এসেছে।”
গিয়ে দেখি আমার বাবা! কিন্তু তার এক পা ভাঙা। আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম।
“বাবা, তোমার এ অবস্থা কেমন করে হলো? কে করল এসব?”
বাবা বললেন :
“আরে বোকা! আমাদের এই ভাঙা পায়ের উপরেই তো এ দেশ দাঁড়িয়ে আছে।”
বাবার এই একটি মাত্র কথায় আমি যেন অবাক হয়ে গেলাম। নিজের এক পা হারিয়ে বাবার যেন সামান্যতম দুঃখ-কষ্ট নেই। কিছুক্ষণ পর বাবা তার দলের সাথে চলে গেলেন।
হঠাৎ এক সপ্তাহ পর খবর পেলাম গ্রামে রাজাকার বাহিনী আসছে। তারা পাকিস্তানিদের পথ চিনিয়ে নিয়ে আসছে। ভাবলাম এই জানোয়ারগুলোকে শেষ করে দিতে হবে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো- মোহনপুর গ্রামের রোড ধরে তারা এগিয়ে আসবে। সেখানেই তাদেরকে উড়িয়ে দিতে হবে।
কমাণ্ডার আনিসুজ্জামান বললেন,
“তোমরা দুজন বয়সে ছোট বলে তোমাদেরকে নেওয়া হবে না।”
আমি বললাম, “স্যার আমরা পারব। আমরা বয়সে ছোট হলেও দেশের জন্য জীবন বলিদান করতে প্রস্তুত।”
অবশেষে স্যার আমাদের সাথে নিলেন। মোবারক ভাই দূর থেকে ফায়ারিং করছিলেন। হঠাৎ করে একটি গুলি এসে তার বুকে লাগে। সাথে সাথে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আমি দ্রুত তাকে কভার করে সরিয়ে নিয়ে এলাম।
তিনি আমাকে বললেন,
“আমাকে কথা দে, তোরা এই দেশটাকে স্বাধীন করবি। সত্যিকারের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবি।”
আমি বললাম,
“হ্যাঁ। কথা দিলাম। এ অঞ্চল থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর শেষ সৈন্যকে না তাড়ানো পর্যন্ত আমরা এ অঞ্চল ত্যাগ করব না।”
মোবারক ভাইয়ের মুখে তখন একটি কথাই ফুটে উঠল,
“জয় বাংলা।”
এরমধ্যে ভাইয়া তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। আমি দুহাতে তার চোখ ঢেকে দিলাম। মনকে শক্ত করলাম। ভাবলাম, এভাবে ভেঙে পড়লে চলবে না। দেশের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে হলে আমাদেরকে আরো দূর এগিয়ে যেতে হবে।
ডিসেম্বর মাস এসে গেল। চারদিক থেকে শুধু পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ করার খবর আসছে। কিন্তু আমাদের অঞ্চল এখনো শত্রুমুক্ত হয়নি। এবার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হলো। এইবার আমাদেরকে অঞ্চল শত্রুমুক্ত করতেই হবেই।

১৬ই ডিসেম্বর, ১৯৭১
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর আসছে। শোনা যাচ্ছে আজ বিকেলেই নাকি পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে।
আজ আমাদের চূড়ান্ত অপারেশনের দিন। জানি না কেন সকাল থেকে বাবা-মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। আজ তাদেরকে অনেক দেখতে ইচ্ছা করছে। কে জানে, হয়তো আজ আমার শেষ দিন। আর কোনো দিন হয়তো মা-বাবা, তুহিন কারোর সাথেই দেখা হবে না।
অপারেশনে যাওয়ার আগে তুহিনকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদলাম।
অবশেষে অপারেশনে যাওয়ার সময় এসে গেল। আমরা সকলে জাতীয় পতাকাকে সম্মান প্রদর্শন করলাম, আল্লাহর কাছে দোয়া চাইলাম।
সাবুভাই এবার গাছের উপর বসে সেনাদের উপর নজর রাখছিলেন। তার ইশারায় তুমুল ফায়ারিং শুরু হয়ে গেল। তখন প্রায় মধ্যরাত। ফজরের আজান শুরু হয়ে গেছে। দুই পক্ষেই তুমুল যুদ্ধ চলছে। এমন সময় হঠাৎ করে পাকিস্তানি বাহিনীর এক সেনার ছোঁড়া গুলি সাবুভাইয়ের বুকে এসে লাগে। আমি দ্রুত তাকে কভার করে পাশে নিয়ে আসছিলাম। এমন সময় হঠাৎ করে কি একটা যেন আমার বুকে এসে বিঁধল। কিন্তু তা দেখার সময় এখন আমার হাতে নেই। এরই মধ্যে সাবুভাই বিদায় নিলেন। আমারও হঠাৎ খুব কষ্ট হতে লাগলো। এমন সময় বুকে হাত দিতেই দেখি টাটকা রক্ত! এরই মধ্যে পাকিস্তানি বাহিনীর আরেকটি ট্রাক ভর্তি সৈন্য মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে ফেলেছে। সবাই প্রাণপণ লড়াই করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যেকোনো মূল্যে আজ আমাদের এ অঞ্চলের মাটি শত্রুমুক্ত করতে হবে। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এখন পথ একটাই। যেভাবেই হোক পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ট্রাকটিকে গ্রেনেড দিয়ে উড়িয়ে দিতে হবে। এ সময় আমি হাতে গ্রেনেড তুলে নিলাম। এই ট্রাকটিকে আমায় উড়িয়ে দিতেই হবে। তাসকিন ভাই এসে আমাকে বাধা দিতে লাগলেন।
“রাজু, এরকম করিস না। দেখ! তুই এখনো অনেক ছোট। নিজের জীবনকে শেষ করে দিস না। তুই মারা গেলে তোর মা-বাবাকে আমরা কি জবাব দিব?”

“দেখো, তাসকিন ভাই। তোমরা হলে সম্মুখ যোদ্ধা। তোমাদের কিছু হলে এ দেশের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। তাছাড়া আমি বাঁচবোই বা কতক্ষণ? বুক থেকে ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হচ্ছে। তাই মৃত্যুর পূর্বে দেশের জন্য যদি কিছু করে যেতে পারি, তবে অন্তত শেষ শান্তিটুকু তো পাবো।”
তুহিনের কাছ থেকে শেষবারের মতো বিদায় নিয়ে আসলাম। হাতে গ্রেনেড নিয়ে ছুঁড়ে দিলাম পাকিস্তানি বাহিনীর সেনাদের দিকে। মূহুর্তের মধ্যে চারিদিকে নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেল।
আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম। উঠবার আর কোনো শক্তি রইলো না।
হঠাৎ করে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। এসময় খুবই সুন্দর সুন্দর দৃশ্যগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। দেখলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তর্জনী উঁচিয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। যেন সত্যিকারের এক মহানায়ক। বাবা-মা, তুহিন, তুহিনের বাবা, মোবারক ভাই, সাবুভাই সবাই লাল-সবুজ রঙের এক নৌকায় করে দেশে ফিরে আসছে। সবার মুখে সেই অমলিন হাসি। তুহিন ও তার বন্ধুরা সেই নদীতে গোসল করছে। নদীর রঙ, আকাশের রঙ সবই লাল-সবুজ লাগছিল। সবাই যেন আমাকে তাদের কাছে ডাকছে। এখনো মনের মধ্যে কেমন যেন আলাদা একটা আনন্দ হচ্ছে। আচ্ছা, মৃত্যুর সময়ও কি আনন্দ হয়? হয়তোবা না। তবে আমার কেন এত আনন্দ হচ্ছে? চারদিক থেকে শুধু মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি শোনা যাচ্ছে । তবে এই কি সেই স্বাধীনতা, যার জন্য কোটি কোটি মানুষ প্রাণ বিসর্জন দিল। এত মানুষ তাদের সকল কিছু ত্যাগ করল। স্বাধীনতার স্বাদ কি এতই আনন্দের ! এতই মধুর!
মুখ দিয়ে তখন শুধুমাত্র একটি কথাই উচ্চারিত হলো :

“জয় বাংলা”

Date: October 3, 2020
Time: 1:27 pm