অদ্ভুত বাড়ি ফেরা

October 14, 2020 0 By jarlimited

সুমাইয়া পারভীন

শরতের পড়ন্ত বিকেল।
শীতল ছায়ায় ছেয়ে গেছে চারপাশ।অনার্স ২য় বর্ষের এক্সাম শেষ করে ৬ মাস পর আজ বাড়ি ফিরছে আবির। ট্রেন চলছে আপন গতিতে। ট্রেনের ঝকঝক শব্দ আবিরের খুবই ভালো লাগে। ট্রেন চলছে তো চলছেই। মাঠ,ঘাট পেরিয়ে ছুটে চলছে। এদিকে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এল। আর কয়েক স্টেশন পড়েই আবিরের গন্তব্যস্থল। আকাশে ঝলমলে চাদ অকৃপণ আলো ছড়াচ্ছে। থোকায় থোকায় রুপালি আলো পৃথিবীর বুকে নেমে আসছে। মাঝেমধ্যে সাদা মেঘ এসে পড়ছে চাঁদের উপর। কি সুন্দর লুকোচুরি খেলছে তারা! আবির বাইরের দৃশ্য দেখছিল আর উপভোগ করছিল। ঘড়িতে তখন রাত ১২টা। ট্রেন এসে দাড়াল বিজয়পুর স্টেশনে। আবির ট্রেন থেকে নেমে অবাক হয়ে গেল। পুরো স্টেশনই ফাঁকা। কোনো লোক সমাগম নেই,যানবাহন নেই। মনে হচ্ছে এই ট্রেনে আমিই একমাত্র যাত্রী ছিলাম। অবশ্য রাত ১২ টা গ্রামে অনেক রাত। তাই হয়তো সবাই নিজ নীড়ে ফিরে গেছে। আর কিছু না ভেবে আবির বাড়ির উদ্দেশ্যে হাটতে আরম্ভ করলো।কোন যানবাহন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে নদীর ধার দিয়ে হাটতে শুরু করল। এদিকে বাড়ি পৌছাতে সময় কম লাগবে তাই।রাস্তার চারপাশে ইউক্যালিপটাস গাছ খাড়া দাঁড়িয়ে রয়েছে। পশ্চিমের বাতাসে পাতাগুলো শা শা শব্দ করছিল। চারিদিকে নিরব,নিস্তব্ধ। ঝি ঝি পোকারা একমনে ডেকে চলছে। মাঝেমধ্যে দু’একটা কুকুরের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। থেকে থেকে ডাহুক পাখি ডেকে উঠছে। পরিবেশ টা কেমব যেন থমথমে হয়ে আসছে।ভয়ে আবিরের গা ছমছম করছে। হঠাৎ আবিরের নজর পড়ল নদীর মাঝটায়।একটা সাদা কাপড়ে মুড়ানো লাশ পাড়ের দিকেই ভেসে আসছিল এবং তা স্রোতের ঠিক বিপরীত দিকে। আবির থমকে যায়।এমন ঘটনা কিভাবে ঘটতে পারে! ভয়ে হাত পা শীতল হয়ে আসে তার। লাশটা ক্রমশই পাড়ের দিকে ছুটে আসতে চাইছে।আবির দিক বিদিক খেয়াল না করে সোজা দৌড়াতে আরম্ভ করল।পিছনে তাকানোর সুযোগ নেই। দৌড়াতে দৌড়াতে আবিরের শরীর ক্লান্ত হয়ে আসে।দৌড়ানোর মত আর শক্তি নাই গায়ে। কিছুক্ষণ পর আবিরের মনে হল -সে একটুও পথ এগোতে পারেনি, যেখানে ছিল সেখানটায় আছে এখনো। কি হচ্ছে এসব!আবির অবাক হয়ে যায়। ভয়ে শরীর ঘামতে শুরু করে। হঠাৎ দৃষ্টি যায় দূর বটবৃক্ষটার দিকে। কেউ একজন হারিকেন হাতে এদিকে আসছে মনে হচ্ছে। আবির তাকে ইশারায় কাছে ডাকল।মনে হয় লোকটি বুঝতে পেরেছে তাই এদিকে আসছে। এবার আবিরের মনে একটু সাহস জমতে শুরু করলো।
লোকটি কাছে এসে জিজ্ঞেস করল;বাবা আবির!এতরাতে তুমি এখানে? কিভাবে?
-অহ কায়েম চাচা? আমি ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরছি চাচা। কিন্তু খুব বিপদে পড়ে গেছি।
আবির কায়েম চাচাকে সব খুলে বলল। তিনি তাকে সাহস দিলেন। আবিরও ভয় ঝেড়ে ফেলে বাড়ির দিকে হাটা ধরল।আবির সামনে কাকা তার পিছনটায় হাটছে ক্ষেতের আইল ধরে। আবির জিজ্ঞেস করল;চাচা,কাকি আর নিরা কেমন আছে?
চাচা বলল;তোমার কাকি ২মাস আগে এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে বাবা।
-আর নিরা?(আবির)
-আর বলো না বাবা, সপ্তাহ খানেক আগে আমার মেয়েটা ধর্ষিত হয় কিছু মানুষ রুপী জানোয়ার দ্বারা।কোনো বিচার পেলাম না বাবা। তারপর এলাকার সবাই তাকে নানাভাবে অপমান, অবহেলা আর অপদস্ত করতে থাকে। অসহায় মেয়েটার চোখে আমি বাচার স্বপ্ন দেখেছিলাম জানো বাবা?কিন্তু সমাজের লোকজন তাকে আর এ সমাজে রাখতে রাজি হল না। বাবা হয়ে আমি এমন দৃশ্য কেমনে সহ্য করি বলো বাবা!কোনো বাবা কি মেয়ের এমন দৃশ্য দেখতে পারে বলো?
কায়েম চাচার কথা শুনে চোখে পানি চলে আসে আবিরের। আবির জিগ্যেস করল;চাচা তারপর কি হল?
চাচা নিরব,কথা বলেন না।আবির পিছন ফিরে দেখে কায়েম চাচা নেই। আবির চোখ বড় করে খুজতে থাকে। কিন্তু কোথাও নেই। চিৎকার করে ডাকল কয়েকবার কিন্তু কোনো সাড়া নেই। আবিরের মনে আবার ভয় দানা বাধতে শুরু করল। ইতিমধ্যে আবির বটবৃক্ষটার নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। গাছের উপর থেকে কেমন একটা শব্দ ভেসে আসছে। বহু পুরানো দরজা খুলতে যেমন চু চু আওয়াজ হয়, শব্দটা খানিকটা সেরকম। আবির মাথা তুলে উপরে তাকায় আর অকল্পনীয় একটা দৃশ্য চোখে পড়ে। গাছের ডালে ২টা লাশ ঝুলছে। একটা কায়েম চাচার আরেকটা নিরার।ভয়ে আবির থরথর করে কাপতে থাকে। সাত পাঁচ না ভেবে সোজা বাড়ির দিকে দৌড় দেয় আবির।
পরেরদিন ভোর বেলায় পুলিশ এসে লাশগুলো মর্গে নিয়ে যান।ময়নাতদন্তের খোঁজ আর কে রাখল না। আবিরের মত আজ সমাজের সবাই চুপ থাকতেই পছন্দ করে হয়তো।
________সমাপ্ত ________

Date: October 3, 2020
Time: 3:23 pm