কলকাতার বাস

পথে _একদিন

October 13, 2020 0 By jarlimited

সরকার মো. রিয়াজুল ইসলাম

বাসের কোলকাতা-২ নম্বর সিটে বসে আছি। কোলকাতা-২, মানে সি-২। টিকেট বিক্রেতা,হেলপার, ড্রাইভাররা সিট গুলোকে এভাবেই নামকরন করে নিয়েছে, নিজেদের সুবিধার্থে। ওদের মুখে শুনে শুনে আমারও বিষয়টা জানা হয়ে গেছে। যে কোন বিচারে এই সিটগুলো সকলের কাছে বেশ লোভনীয়। আমার পাশের সিট অর্থাৎ সি-১ এখনও পর্যন্ত ফাকা।পিছনের দিকের কয়েকটি সিট বাদ দিলে সবগুলোতেই এরই মধ্যে প্যাসেঞ্জার বসে আছে। আন্তজেলা এ সকল বাসে টিকিট কেটে বা না কেটেও উঠা চলে। অদ্ভুত বিষয় এত ভালো সিট হওয়া সত্ত্বেও যারা পরে উঠছেন তারা আমাকে পাশ কাটিয়ে পিছনের দিকে চলে যাচ্ছেন,অথচ স্বাভাবিকভাবে সকলে এমন সিটে বসার জন্য উদগ্রীব থাকে। একজন বেশ সুন্দরী মহিলাকে বাসে উঠতে দেখে ভাবলাম যাত্রাটা মন্দ হবে না,মাথা নিচু করে বসে আছি, যেন দুনিয়ার কোন কিছুতে মন নেই। তিনিও আমাকে মাড়িয়ে পিছনে গিয়ে বসে পড়লেন। বিষয়টা কিছুতেই মাথায়,ঢুকছে না। ভয় হতে লাগলো, আমি এমনিতেই মোটা মানুষ, শেষে না আমারই মত সাইজের এমন কেউ এসে বসে যে অতি ঘনিষ্ঠতায় বসাই দায় হয়ে যায়। একজন অল্পবয়সী মেয়েকে দেখলাম হন্তদন্ত হয়ে কোনদিকে না তাকিয়ে ধপাশ করে আমার পাশের সিটটায়,বসে পড়লো। মেয়েটা বসার স্টাইলেই হোক বা এতক্ষন সবাই এড়িয়ে গেলেও মেয়েটা বসেছে বলেই হোক ঘার ঘুড়িয়ে মুখের দিকে তাকালাম। চোখগুলো লাল হয়ে আছে। হাতের রুমাল দিয়ে নাক মোছায় নাকের আগাটাও লাল।বোঝাই যাচ্ছে কিছুক্ষন আগেই সে কান্নাকাটি করেছে। অপুর্ব সুন্দরী না হলেও প্রথম দৃষ্টিতেই বেশ ভালো লাগলো মেয়েটাকে। এমন একটা মেয়েকে দু:খী দেখতে ভালো লাগে না। নিজ মনে রাজ্যের ভাবনা এসে জড়ো হতে লাগলো। মেয়েটা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদছে। বুড়ো কাউকে কাদতে দেখলে মায়া লাগে,বাচ্চা কাদলে কষ্ট হয় আর যুবতী কাউকে কাদতে দেখলে বুকের মাঝে চাপা ব্যাথা অনুভুত হয়। একবার ভাবলাম জেনে নেই উনি কাদছেন কেন। প্রচন্ড ইচ্ছাটা গলা পর্যন্ত এলেও ওটাকে ওখানে থামিয়ে দেই। বহু আগের একটা কথা মনে পড়ে গেল, আমার এক বন্ধু একজনকে ভুলভাবে প্রশংসা করায় একটু বিব্রতই হতে হয়েছিল। তখন কেবল এস এস সি পরীক্ষা শেষ করেছি, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আমাদের সামনে বেশ সুন্দরী একটা মেয়ে লাল রঙের ড্রেস পরে হেটে যাচ্ছিল। মেয়েটার গায়ের রং কিছুটা চাপা। আমার বন্ধুটি বলে বসে ‘কয়লার গুদামে আগুন লেগেছে’
। মেয়েটা শুনতেই প্রতিবাদের সুরে বলে, ‘মিনসে তোর ইয়ের কী’। বয়স কম থাকায় সেই সময় খুব মজা পেলেও এখন ভেবে চলতে শিখেছি। তাই আগ্রহ হলেও চুপ করে থাকাটাই শ্রেয় মনে করে বসে রইলাম।বাস চলতে শুরু করে। মেয়েটি কাদছে আর মনের তার জন্য দুঃখ বোধ ােকিছুই করতে পারছেন না কেমন একটা অসস্তিকর অনুভুতি।

কিছুক্ষণ পর কন্ট্রাক্টর এসে টিকিট চাইল। মেয়েটা ব্যাগের ভিতরটা কিছুক্ষণ নেড়ে চেড়ে ফ্যাল ফ্যাল করে করে কন্ট্রাক্টারের দিকে চেয়ে থাকলো। মনে হলো লজ্জায় কিছু বলতে পারছে না। আস্তে করে বলল, ভাই তাড়াহুড়োয় টাকা রেখে এসেছি।মনে হলো মেয়েটা প্রচন্ড অপরাধ বোধে ভুগছে। কন্ট্রাক্টর দেখলাম বেশ ভদ্রভাবেই বলছে ‘আপা আপনি সামনের স্টপেজ এ নেমে বাড়ি যান। টাকা না নিয়ে বের হয় নাকি?’ হিরো হবার এই সুযোগটা আমি হাতছাড়া করতে চাইলাম না। বললাম, ‘ আপা আপনি কিছু মনে না করলে আপনার ভাড়াটা আমি দিয়ে দিচ্ছি। মেয়েটার দৃষ্টিই বলে দিল সে আমার প্রতি কৃতজ্ঞ। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে সাহস করে বলে ফেললাম ‘আপনাকে খুব চিন্তিত দেখছি। কি হয়েছে বলবেন?’ ভাড়া দেবার কারনেই হোক আর এমনিই হোক, মেয়েটি কাঁদ কাঁদ হয়ে বলল,’আম্মুর অ্যাকসিডেন্ট হইছে। সামনে স্টপেজের পরের স্টপেজে আমার এক ভাই দাঁড়িয়ে আছে। ওখানে নেমে ওর সাথে হাসপাতালে যাব। টাকা নিয়ে যেতে বলেছিল। আমি তো ভুলে রেখে আসছি’ বলেই মেয়েটা অসহায়ের মত কাঁদতে থাকে।ভাইয়া আমার উপর খুব রেগে যাবে।’ এতক্ষণে মেয়েটির কান্না আর অস্থিরতার কারণ বুঝতে পেরে খুব খারাপ লাগতে লাগলো। এমন পরিস্থিতিতে ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমাকে বলল’ ভাই কন্ট্রাক্টর কে বলেন না, আমাকে এখানে নামিয়ে দিক, বাসায় গিয়ে আমাকে টাকা নিতে হবে।’ এমন পরিস্থিতিতে কি করব বুঝতে পারছিলাম না, হিরো হবার চিন্তা বাদ দিয়ে সত্যিকারের মানুষ হতে চাইলাম,সেটাই বললাম যেটা মানুষ হিসাবে বলা উচিৎ, , ১০০০ টাকার একটা নোট দিয়ে বললাম, আপনি এটা নিয়েই চলে যান। ওখানে গিয়ে অনেক ভাবেই টাকার ব্যবস্থা করতে পারবেন।’ মনে হলো সে কিছুটা সংকোচ বোধ করছে। বললাম, ‘ পরে না হয় ফেরত দিয়ে দেবেন।’ অনিচ্ছা সত্বেও টাকাটা নিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ ভাই, আমি আপনাকে টাকাটা ফেরত দিয়ে দেব। ‘ এরপর তার সাথে আরও দু একটি কথা হয়েছিল। স্টপেজ আসতেই মেয়েটা আমাকে ‘ধন্যবাদ ভাইয়া’ বলে, ছোট একটা হাসি দিয়ে দ্রুত নেমে গেল। আমার মনের ভিতর তখন একজন অসহায়কে সাহায্য করতে পারার অন্যরকম অনুভুতি। কিন্ত যতক্ষণ কথা হয়েছিল আমাকে ভাই বলেই কথা বলেছে। হঠাৎ ভাইয়া বলার হেতু বুঝলাম না। মনে হলো, আচ্ছা সে যে আমাকে টাকা ফেরত দেবে বলল,নম্বর তো চাইলো না,আমি নিজেও তো নম্বর নেই নি। মনটা খারাপ হলেও একজনকে সাহায্য করতে পেরেছি সেটাই তখন বড় মনে হচ্ছিল। মনে হলো এসব ভেবে লাভ নেই,বরং মোবাইলে মন দিয়ে বাকি পথটা পার করি।

চমকে উঠলাম। পকেটে মোবাইলটা নেই। লাফ মেরে উঠে সিটে তাকালাম,না সেখানেও নেই। সিটের নিচে দেখলাম, না নেই। লোকজন আমার অস্থিরতা দেখে বুঝতে পারলো কিছু হারিয়েছি। একজন বুঝতে পেরে বলল আপনার নম্বরটা বলেন, ডায়াল করে জানালেন নম্বর বন্ধ।বুঝতে বাকি থাকে না মোবাইলটা হারায়নি বরং চুরি গেছে।শুধু যে মোবাইলটাই চুরি গেছে তা নয় বরং চুরি করা হয়েছে আমার বিশ্বাস কে,হয়তবা আমার মত আরও শত শত সরল বিশ্বাসি মানুষদের বিশ্বাসকে পুজি করেই এক শ্রেণির মানুষ আজ ফুলে ফেপে উঠছে।

আমার নম্বরটা প্রয়োজন বিধায় সিমটা সেদিনই উঠিয়ে নেই। তিনদিন পর একটা অপরিচিত কল পাই, ওপারের মেয়েটি বলছে,
ভাইয়া ভালো আছেন?
‘ জি ভালো, কে বলছেন?’
‘ চিনতে পারলেন না?’
‘না’
‘ ঐ যে সেদিন বাসে হেল্প করলেন না?’ আমি আপনার টাকাটা ফেরত দিতে চাই’

আমি আকাশ হতে পরি। তাহলে কি আবারও ভুল করছি। আমি তো ভেবেছিলাম মেয়েটাই মোবাইলটা নিছে,এখন তো সে আমার টাকা ফেরত দিতে চাচ্ছে। সব কেমন গুলিয়ে যেতে থাকে।
বললাম, ‘আমার নম্বর কীভাবে পেলেন?’

খিলখিল করে হেসে উঠে বলে,আপনি আসলেই বোকা। তবে ভালো মানুষ।তাই একটা সুযোগ দিচ্ছি,আপনি তো দেখছি অনেক সুন্দর সুন্দর গল্প লেখেন। সব আপনার নোটপ্যাডে লেখা। আমি পড়েছি।তাই মোবাইলটা ফেরত নিতে চাইলে একটা নম্বর দিব, ৫০০০ টাকা বিকাশ করবেন, আসলে চার্জ ৬০০০, ১০০০ আমার কাছে পান, তাই ৫০০০ টাকা দেবেন।আর আপনার ঠিকানা দেন, মোবাইল পেয়ে যাবেন। আর একটা উপদেশ সুন্দরী দেখলেই বিশ্বাস করে ঠকবেন না, আবারও হাসি।’

আমি বললাম, আমি তো কোন সুন্দরীকে বিশ্বাস করিনি, বিশ্বাস করেছিলাম একজন মানুষকে। আপনার উদ্দেশ্য ছিল ঠকানো আমার ছিল সাহায্য করা। আপনার কাছে আমি বোকা,হয়ত সবার কাছেই বোকা,কিন্ত এমন বোকা আমি বার বারই হতে চাইবো।দু:খ একটাই আপনাদের মতো মানুষদের জন্য সত্যিকারের সাহয্য প্রার্থীদের চিনতে পারি না। আপনারা যেমন আছেন আমরাও তেমন আছি। আপনারা যতবার ভাঙবেন আমরা ততবারই গড়তে থাকবো। আপনারা ঠকিয়ে গর্বিত আমরা ঠকে গর্বিত। আমার মোবাইল লাগবে না,ওটা আমি আপনাকে দিয়ে দিলাম।

কয়েকদিন পর একটা পার্সেল পেয়েছিলাম আমার বাড়ির ঠিকানায়। আজও জানিনা প্রেরক আমার ঠিকানা পেয়েছিল কেমন করে।

Date: October 2, 2020
Time: 3:22 am