একা এবং একা

October 3, 2020 0 By jarlimited

নুজহাত ইসলাম নৌশিন

আমি খুব ভেবে দেখলাম আমি হুট করে একা হয়ে গেছি। দুঃখিত একা আগে থেকেই ছিলাম কিন্তু চোখে পড়ে নি। এখন যখন চোখে পড়ছে তখন উদাস উদাস দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। আশ্বিনের বিকেলের আকাশ, সোনালি একটা আলো। অন্ধাকার হয়ে যাওয়ার আগে বুঝি বা নিজের রূপ দেখিয়ে আকর্ষণ করার ব্যর্থ চেষ্টা । শহুরে মানুষ এসব সোনালি আলো – টালো পাত্তা দেয় না। আমিও পাত্তা দিতাম না, কিন্তু উদাস ভাব আসার জন্য পাত্তা দিচ্ছি , কারণ একটু পর গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্ত নিব।
ভাইজান, টেহা দেন-
যা তো বাপ , ঘ্যান ঘ্যান করিস না। সিগারেট খাবি?
নাহ্, পেটে খিদা লাগছে। কিছু টেহা দেন।
যা বেটা, আমার নিজের বাপই আমারে টেহা দেয় না। বুঝলি?
আচ্ছা শেষ কবে নিজের বাবাকে বাবা ডেকেছিলাম! মনে পড়ছে না তো। এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ ও কিছু না। এরচে সিগারেট ধরানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সিমেন্টের বেঞ্চ থেকে উঠতে গিয়ে দেখি – ওই উপদ্রব পিছু নিয়েছে। পিছু নিয়ে কি লাভ? ভুল মানুষের পিছু নিয়ে বেগার খাটুনি!
নাম কী তোর?
শাহজাহান।
বাহ্, ভিক্ষুকের নাম শাহজাহান!
তুই কি ভারত ঈশ্বর শাহজাহান? কালস্রোতে ভেসে যায় জীবন যৌবন ধনমান!
কি কন এগুলা! টেহা দিলে দেন, না দিলে নাই –
নাহ্, বেটার তেজ আছে।
আচ্ছা কি যেন ভাবছিলাম! শেষ কবে বাবা ডেকেছিলাম? সিগারেট ধরানোর পর থেকেই এই ভাবনাটা আবার গুঁতাগুঁতি করছে। বাবা, কেনো ডাকে! সত্যি আমি বুঝি না। আমার বাবা নামের যে লোকটা আছে সে কেবল আমার বায়োলজিকাল ফাদার। তাকে মন থেকে আমি কখনো মানতে পারি নি । আর এখন এসব মানা- টানার ব্যাপার আছে না কি! কি জানি কি! এসব গুড বয়দের কাজ মান্য- গণ্য করা। আমার আসে না।
কমার্স পড়বে না? যাও নিজের পয়সা নিজে উপার্জন করে সায়েন্স পড়গে। আমার টাকায় পড়তে হলে কমার্সই পড়তে হবে। কি সুন্দর ভাবেই না স্বপ্নগুলো আমার ধীরে ধীরে গলা টিপ মারা হয়েছে। তখন আমি খুব মান্য – গণ্য করতাম।
ফোন দেয় কে? ওহ্, রুমকি! আধুনিক যুগের বিকল্প অক্সিজেন! যাকে ছাড়া নাকি বাঁচা যায় না। ধ্যাত্তেরি, জাস্ট কার্বনডাই-অক্সাইড মনে হয় আমার। ফোন ধরবো না ধরবো না করেও ধরলাম । শেষ বারের মতো ধরতে ক্ষতি নেই।
ঝাঁঝালো কণ্ঠের আক্রমণ – কই তুই ?
হুঁ
কি হুঁ?
কবিতা তোমায় আজকে দিয়েছি ছুটি, প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা। ফোনটা কেটে ব্লক লিস্টে ফেলে রাখলাম; আমার চার বছরের প্রেমিকা রুমকি। সেও আরেক স্বৈরাচারী রূপ আমার শ্রদ্ধেয় বাবার।
‘ আরে সাদাফ, তোমাকে ঢাবিতে চান্স পাওয়াই লাগবে। নয়তো… ‘
কবিতার লাইনটা মনে হয় ভুল বলে ফেলেছি। প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা মনে হয় আগে হবে। যাই হোক। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসব স্থুল চিন্তা মাথায় আনা ঠিক না। এক স্থুল চিন্তা আরেক স্থুল চিন্তাকে নিয়ে আসবে। চেইন আস্তে আস্তে বড় হবে। চেইন বড় হওয়ায় আগেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রাত আটটা পয়তাল্লিশ। আহামরি কোন সময় না। মরার জন্য কি আলাদা সময় টময় লাগে কি না কে জানে! ব্রিজ থেকে লাফ দিবো? পরের দৃশ্যটা বেশি সুখকর হবে না। আমার সুন্দর চেহারা দেখেই তো রুমকি প্রেমে পড়েছিল, এখনো অনেকে পড়ে। ওই তো ওইদিন পাশের বাসার মেয়ে, ক্লাস নাইন – টেন হবে বোধহয় ; আমাদের ছাদে এসেছিল আচার দিতে। আমার মায়ের সাথে আবার বেশ খাতির জমিয়ে ফেলেছে।
আমাকে ছাদে দেখে মেয়েটার চোখ – মুখ লাল হয়ে গেলো। বয়ঃসন্ধি আবেগ। মনে মনে হাসলাম আমি। আমি জানি এই মেয়ে আচারের ছুতো ধরে আবার আসবে, আবারো। এবং এই আচার রোদে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান থাকবে – যতদিন না মোহ কাটে। হাহ্, আবেগ!
এই মেয়েটার মুখ কেন এখন মনে পড়ছে? গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসব মনে না পড়াই উচিত। কিন্তু সব সময় বুঝি উচিত কাজটাই হয় না। আচ্ছা, মেয়েটার থুতনিতে একটা কাটা দাগ আছে না? মনে হয় ছোটবেলায় খুব দুষ্টু ছিলো! ছোটবেলায় দুষ্টু থাকলে বড় হয়ে শান্ত – মিষ্টি হয়ে যায় , এটা বেশ ভালো । তবে, এখনো যদি দুষ্টুমি করে খারাপ লাগবে না। আরেক বার মেয়েটাকে সামনে পেলে বলে দিবো, ‘ তুমি বরং দুষ্টুই থেকো ।‘ অবাক হবে কি?
ব্রিজে উপর দুর্দান্ত বাতাস। একটু আগেও তো ভয়াবহ মন খারাপ ছিলো, কোন যাদুমন্ত্রে ভালো হলো! আমি হাঁটা ধরলাম সোজা বাসার দিকে – ধানমন্ডি এক বাই…
মৃত্যুর সময় আরো পরে ও সিলেক্ট করা যাবে। সুইসাইড পরবর্তী দৃশ্য গুলো বেশি মনোমতো ও লাগছে না। আর আমার মৃত্যুতে ওই বাচ্চা – বাচ্চা মেয়েটা কষ্টই পাবে।শূন্য ছাদ কি ওর সহ্য হবে? আমি দ্রুত হাঁটছি। তারা ভরা নক্ষত্রের রাতে মরার কোনো মানে হয় না। জীবনের কষ্ট গুলো ডাস্টবিনে পুড়ে মরে যাক। আমাকে যেতে হবে, ঠ্যাং ভাঙা রাস্তার কুকুরটা আমার সঙ্গী এখন ।

==========================
কিশোরগঞ্জ